এদিকে তখন আমার কর্মজীবনের শুরু। প্রথম চাকরি ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডে। ইংরেজ আমলের অতি পুরনো সংস্থা, কারখানা টিটাগড়ে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে মালিক এইচ আই ভি গুজরগিয়া। অধুনা সরকারের অধিগ্রহণে। সেখানে চাকরি করতে গিয়ে দেখি আমার অধীত বিদ্যা সম্পূর্ণ ফালতু কারণ আমার একমাত্র কাজ হল বুক পেতে দেওয়া। সংস্থার যে কোনও শাখার ইচ্ছেমতো তীর মারার স্থায়ী জীবন্ত নিশানা হচ্ছি আমি। প্রোডাকশন ম্যানেজারের হুকুম শতকরা এত উৎপাদন বাড়াতে হবে মিঃ দাস প্লিজ সি টু ইট। ধেয়ে এলো ল্যাজে-নীল-আলো তীর। কারখানার শ্রমিকদের উত্তর এ মেশিন কবেকার জানেন, ওভারটাইম ছাড়া উৎপাদন বাড়বে না। দপদপ লাল আলো জ্বলছে বাণের ফলায়। অ্যাকাউন্টস্ আর মারকেটিং থেকে একযোগে আক্রমণ কস্ট অফ প্রোডাকশান চড়ে যাবে; প্রোডাক্টের দাম না বাড়ালে চলবে না, গুজরাট মহারাষ্ট্রের কখগ পফব কোম্পানির সঙ্গে তাল রাখা অসম্ভব। মিঃ দাস প্লিজ পারসুয়েড দেম। স্যাট স্যাট সবুজ বেগুনি চমকাচ্ছে তীরের পুচ্ছগুলি। আচ্ছা, ৭০-এর দশকে পশ্চিমবঙ্গে ইংরেজ আমলের অবশিষ্ট শিল্পগুলিতে শ্রমিক-ম্যানেজার-মালিকদের কোঁদল দেখেই কি রামানন্দ সাগরেরা রামরাবণ কুরু-পাণ্ডবদের মহাসময়ে অমন দুর্ধর্ষ তীর ছোঁড়াছুড়ির প্রেরণা পেয়েছিলেন? তখনও হিন্দু মেগা সিরিয়ালের উত্থান ভবিষ্যতের গর্ভে। তবে শীঘ্র আসিতেছে বলতে গেলে পরবর্তী আকর্ষণ। তাই বোধ হয় আমিও একটা যুৎসই বিশাল ঢাল তুলে ধরবার চেষ্টা করি। বিনীত অভিমত—যন্ত্রপাতি আধুনিকীকরণ, ব্যবস্থাপনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, প্রয়োজনবোধে সূর্যাস্তের শিল্প থেকে সূর্যোদয়ের শিল্পে রাস্তা খোঁজা ও সেই অনুযায়ী শ্রমিকদের নতুন অনুশীলন। ব্যস এক্কেবারে চক্রব্যুহে অভিমন্যু। সম্মিলিত আক্রমণ—নতুন যন্ত্র মানে ছাঁটাই, প্রশিক্ষণ আবার কী, শালা বাতেল্লা দিচ্ছে চলবে না চলবে না। সবচেয়ে বড় কথা, একজন জুনিয়ার সদ্যপাশ ইঞ্জিনিয়ার এত আপইটি কোম্পানির পলিসিমেকিং-এ নাম গলায়! রিয়েলি, অ্যাবসোলিউটলি আনথিংকেবল ইন আওয়ার ডেজ।
অতএব, অমল কুমার দাসের মানে মানে বিদায়গ্রহণ। পরে যখন শুনলাম বি ই এল বন্ধ, নিজেকে একটু অপরাধী মনে হয়েছিল। কর্মজীবনে হাতেখড়িই ব্যর্থতায়।
আমার দ্বিতীয় চাকরি হাওড়া আয়রন ওয়ার্কসে। এটাও সেই প্রাচীন ব্রিটিশ আমলের। এখন মালিক সি এফ গন্নোরিয়া। না, এই পর্বে আমার খেদ-অপরাধবোধ কিছুই হয়নি কারণ আমি কাজকর্ম ভাল করে বুঝে নিতে না নিতে শুরু হল তিপ্পান্ন দফা দাবিতে শ্রমিক ধর্মঘট। নেতৃত্বে পেশাদার ইউনিয়ন লিডার শিবপদ বাঁড়ুয্যে। প্রতিদিন কারখানার গেটে ঠিক বেলা এগারোটায় যার জ্বালাময়ী ভাষণ শোনা যেত, বড় সাহেব ম্যানেজিং ডিরেক্টর বারীন মিটার, যাঁর ডাক নাম ব্যারি—ঘেরাও। মারপিট। ১৪৪ ধারা জারি, পুলিশ পাহারা, লক আউট। দ্রুতগতি রুদ্ধশ্বাস নাটকটিতে আমার ভূমিকা প্রায় দর্শক পথচারীর কারণ মালিকের দালাল বুর্জোয়া শ্রেণীশত্রু আমি টার্ফে করব এমন দুঃসাহস ছিল না। যে বঙ্গের ভাণ্ডারে শুধুই বিবিধ নিপীড়ন, তার থেকে মধ্যবিত্ত উচ্চশিক্ষিতের নিস্তার প্রবাসে। চলে গেলাম হায়দ্রাবাদ সাদার্ন অ্যাসবেস্টস প্রাইভেট লিমিটেড-এ। তারপর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পোমোশন ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ায়। ভুপালে কিছুদিন অতঃপর ভুবনেশ্বরে স্থিতি। বাঙালি লেখক বুদ্ধিজীবী নেতারা সর্বদা যে একটা অর্থহীন বাক্যবন্ধ কপচান—বাংলা তথা ভারত—সেটা বোধহয় আমাদের মতো শিকড়হীন ভেসে বেড়ানো ভাল চাকুরেদের জন্য। আচ্ছা ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড, হাওড়া আয়রন ওয়ার্কসের হাজার হাজার বেকার শ্রমিকদের কী হল? তাদের জন্যও কি বাংলা তথা ভারতের দ্বার উন্মুক্ত? গুলি মারো। চাচা আপন প্রাণ বাঁচা।
হায়দ্রাবাদে থাকতে শুনি ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ারিং-এর প্রাক্তন মালিক এইচআইভি গুজরগিয়া বেজোয়াডাতে নতুন করে কারখানা খুলেছেন। ভুপালে থাকার সময় জানতে পারলাম হাওড়া আয়রন ওয়ার্কসের সি এফ গন্নোরিয়া এম পি, মহারাষ্ট্র সীমান্তে বড় করে লগ্নি করেছেন নতুন শিল্পোদ্যোগে। পশ্চিমবঙ্গ এখন শুধু বিপণন কেন্দ্র। পুঁজি তুলে নিয়ে গিয়ে সবাই আজ তৈরি মাল বেচে এখানে। এ ধরনের অবস্থাকে কারা যেন ঔপনিবেশিক শোষণ ধনক্ষয় বলে গলাবাজি করত? আমার পূজ্যপাদ পিতৃদেব কংগ্রেসনেতা হরিচরণ দাস না?
ইডিয়ট! দি গ্রেট বোং। ভান করে যেন ইন্ডিয়ায় সবার সেরা। সবচেয়ে চালাক। সবজান্তা। আসলে একটা গণ্ডমুখ, জিরো—শূন্য।
.
—কী ভাবতাসেন? হঠাৎ চুপ মাইরা গ্যালেন ক্যান? ছায়া দেবনাথ খোঁচায়।
—না। এই এলোমেলো আগে পরে পাঁচরকম কথা মনে আসে আর কি। তুমি চাও পরপর শুধু ঘটনা আর তাই দিয়ে একটা নিটোল নাটক যেখানে আদি মধ্য অন্ত প্রত্যেক ভাগ পরিষ্কার। জীবনটা কি সেবকম? কখনও এগোই কখনও পেছোই। স্মৃতি তো একটা সরলরেখা নয়।
—স্মৃতি তা হইলে ক্যামন? যেন ভারি সহজ প্রশ্ন।
—ইসিজি করা দেখেছো? রেখাটা চলেছে উঁচু নিচু এদিক ওদিক। তবে হ্যাঁ এগোচ্ছে।
—তা সেই রকমই চলেন। আমি কি মানা করতাসি না কি।
–কী যেন বলছিলাম, হ্যাঁ। ভুবনেশ্বরের সেই পার্টি। কেজরিওয়ালের কথা। পরশুদিন ওই কেজরিওয়াল—যে গভর্নর হাউসের পাশে বিরাট প্রাসাদ করেছে বলে অমল নাম দিয়েছিল ছোট লাট, যার বাগানের ডালিয়া চন্দ্রমল্লিকা ফি বছর ফ্লাওয়ার শো এ ফার্স্ট প্রাইজ পায়—সেই কেজরিওয়াল লাঞ্চে ডেকেছিল কিছু অফিসারদের। বলাবাহুল্য অমলও নিমন্ত্রিত। খুবই ভাল খাওয়া নতুন স্টাইলের নিরামিষ, হাল্কা সুস্বাদু। প্রাচীন উত্তর ভারতীয় প্রণালীতে তেল ঘি মশলার শ্রাদ্ধ নয়। শেষে কলকাতা থেকে আনানো দই মিষ্টি—এ রাজ্যে ভোজনবিলাসে স্টেটাস সিম্বল। চিফ সেক্রেটারি থেকে শুরু করে অনেক উচ্চপদস্থ অফিসার সস্ত্রীক উপস্থিত। কেজরিওয়ালের স্ত্রী কিন্তু বেরুলেন না। তিনি পর্দানশিন। এখনও। তিনি বাস করেন সেই সময়ে যখন তার শাসশসুরের দাদাজি দাদিমা সুদূর ঝুনুঝুনু থেকে এসেছিলেন বাঙ্গাল মুলুকে। ওড়িয়া এক বর্ণও বলেন না। ছেলেমেয়ে নাতিনাতনির ওড়িয়া অক্ষরপরিচয় নিয়ে মাথা ঘামান না। কোনও ওড়িয়া পরিবারের সঙ্গে তার যাতায়াত লোক-লৌকিকতা নেই। তবে হ্যাঁ, কেজরিওয়ালের ছেলের বউ কনভেন্টে পড়া, সেই হোস্টেল। লায়ন্স ক্লাবে এঁরা অ্যাকটিভ মেম্বার। মাঝেমধ্যে মফস্বলে আই ক্যাম্প, বিনামূল্যে গরিব বৃদ্ধবৃদ্ধার ছানি কাটা ঝড়-জল বন্যায় মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে টোকেন অ্যামাউন্ট দান কখনও বা লেডিজ ক্লাব স্থাপন, যার কাজ দেওয়ালি জন্মাষ্টমী হোলিতে দুঃস্থদের গাঁটরিবাঁধা খুঁতো নতুন জামাকাপড় ও লাড্ড বিতরণ। এবং সেই ক্লাবে যাবার অছিলায় প্রায়ই বৈকালিক পদচারণা। মেদহ্রাস ও সমাজসেবা। ওড়িয়াতে যাকে বলে টেকাকরে জোড়া এ আম্ব এক ঢিলে দুটি আম পাড়া। এই তো হচ্ছে আম ওড়িশা আর আম্ভে ওড়িয়ামানে। কত তোমাদের মতো মাড়োয়ারিদের ওড়িয়া ন্যাশনালিজম তা আর এই অমল কুমার দাসের জানতে বাকি নেই। তোমরা হচ্ছ বহুরূপী জাত। যখন যেখানে থাকো সেখানকার মানুষ বনে যাও। সবটাই কামোফ্লেজ। পরিবেশের রঙে রঙ মিলিয়ে ঘাপটি মেরে বসা। শিকার ধরার জন্য। এই তো ওবেরয়-এ সেন্ট্রাল মিনিস্টার আর তাদের চেলাদের পেছন পেছন ঘুরছ। রাতারাতি সব ইন্ডিয়ান, মুখে হিন্দির খই ফুটছে। বলি সতী হল কবে না…।
