পুতুলদের পা বাঁধা সুতো তারই হাতে ধরা। এবারে ছমাস আগে থেকে বুক করা—কুমার ভানু অ্যান্ড পার্টি। কটকইনডোর স্টেডিয়ামে মেগাফাংশনের পরিকল্পনা। ভুবনেশ্বরে অমলের শেষ সর্বভারতীয় অনুষ্ঠান। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে বারো বছর রয়ে গেছে। ব্যাঙ্ক আর কিছুতেই রাখবে না। বদলি করলে ভুবনেশ্বর ছাড়তে হবে। ভুবনেশ্বর ছাড়লে অমল কি আর অমল থাকবে? তার একতা ক্লাব মৈত্রেয়ী
-নমস্কার। ক্যায়সে হ্যায় মিঃ দাস?
অমলের চিন্তার স্রোতে বাধা পড়ে। সামনে বেণীপ্রসাদ কেজরিওয়াল, ওড়িশায় স্থায়ী বাসিন্দা মাড়োয়ারিদের প্রধান, বেশ কবছর উৎকল চেম্বার অফ কমার্সের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। রাজস্থানের সতীখ্যাত ঝুনুঝুনু থেকে কপুরুষ আগে লোটাকম্বল অবলম্বন করে হাওড়ায় আগমন। অতঃপর হাওড়া বাসে বাণিজ্যে সাফল্যলাভ, ব্যবসা প্রসারণ এবং বর্তমানে স্থিতি অধিকতর সবুজ ক্ষেত্র ওড়িশায়। কটকে চৌধুরীবাজারে পৈতৃক বাড়ি। খুবই ভাল চলিত বাংলা ও ওড়িয়া বলেন। আজ হঠাৎ হিন্দি? এই কদিন আগেতো ইন্ডাস্ট্রিজ মিনিস্টারের ঘরে একটা অ্যাগ্রো বেসড জয়েন্ট সেক্টর ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কে ডিসকাশানে অমল গিয়ে দেখে ঘরে বসে কেজরিওয়াল। মন্ত্রী ফরেস্ট ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান আর এম ডি-র পাঠানো নোট পড়ে বলেছেন মাদ্রাজ আর কেরালায় যদি ওড়িশার কেন্দু লিফ অর্থাৎ বিড়ি পাতার এত চাহিদা এবং আমাদের সম্বলপুর এলাকার কেন্দু যখন বেস্ট কোয়ালিটি, ওরা খুব ভাল দাম দিতে রাজি, তাহলে ওখানেই বেশি করে পাঠাতে হয়। স্টেট ভাল প্রফিট করবে। ব্যস অমনি মাথায় বাজ ভেঙে পড়েছে।
—আইজ্ঞা আম ওড়িশারু সবু বাহারে চালি যাউচি। আপন আইজ্ঞা সিএমকু টিকি কহন্তু। চিফ মিনিস্টার ইন্টারভিন নকলে সর্বনাশ হেই যিব। আউটসাইডার মানে আসি সবু বহি কিরি নেই যিবে। আম্ভে ওড়িয়ামানে কিছি পাইবু নি…
.
প্রকৃতির অকৃপণ দান ছড়িয়ে আছে ওড়িশার মাটিতে জঙ্গলে। আর তোমরা কজন কেজরিওয়াল বাজোরিয়া ঝুনঝুনওয়ালা দিব্যি কটা নন্দমহান্তি সাহুর সঙ্গে হাত মিলিয়ে কেন্দু শালসিড তেঁতুলের বিচি কাঠ গ্রাফাইট ক্রোমাইট গ্রানাইট যেখানে যা পাচ্ছ মিনিমাম দামে লুটেপুটে একচেটিয়া বাজারের ফায়দা ওঠাচ্ছ শুধু ওই এক বেদমন্ত্র জপে, আম ওড়িশা আম্ভে ওড়িয়ামানে। বাইরের কাউকে ঢুকতে দেব না। নিজের পাঁঠা নিজে যেমন ইচ্ছে কাটব।
.
আচ্ছা আমাদের ভারতীয় জাতীয়তাবাদও কি অনেকটা ওই ধাঁচের নয়? পশ্চিমের বহু সাধনায় অর্জিত বিজ্ঞান ও কারিগরি বিদ্যা প্রয়োগ করে এদেশে সাহেবরা গড়ে তুলেছিল কলকারখানা ব্যবসাবাণিজ্য এবং সেগুলি চলবার মতো আইনশৃঙ্খলাশাসিত বিরাট সাম্রাজ্য। সেই রেডিমেড আলিবাবার ধনভাণ্ডারের ওপর স্বত্ব সাব্যস্ত করাই কি ছিল আসল উদ্দেশ্য? আমাদের দেশ থেকে পঁচা মাল নিয়ে সাহেবদের কলকারখানায় উৎপাদন রমরমা। ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লব আমাদের দৌলতে। আর সেই আমরা বিলেতে তৈরি জিনিস কিনতে বাধ্য হই। বেশি দামে। অর্থাৎ আমাদের ধনসম্পদ সব বাইরে চলে যাচ্ছে। হরিচরণ দাস বিএবিএল কংগ্রেসকর্মী দেশপ্রেমিক কত ক্ষোভে ঘরে বাইরে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের শোষণের চক্রান্ত ব্যাখ্যা করতেন। আমার ছেলেবেলাতেও ছিল তার রেশ। তখনও তিনি কলকাতা কর্পোরেশনে স্থানীয় প্রতিনিধি।
স্বাধীনতার দুদশক যেতে না যেতেই পূজ্যপাদ পিতৃদেব কেমন নিস্তেজ হয়ে পড়লেন। টমসন জনসন ম্যাকলয়েড ম্যাকেঞ্জিদের শিল্পবাণিজ্য স্বাধীন হতে লাগল বিড়লা গোয়েঙ্কা খৈতান সিংহানিয়াদের হাতে। নতুন মালিকরা গরিব দেশের সন্তান, অতএব তাদের নীতি খরচ কম মুনাফা বেশি। সাম্রাজ্যবাদী ধনতন্ত্রী পশ্চিম থেকে দরিদ্র প্রাক্তন উপনিবেশকে আত্মরক্ষা করতে হয় দরজা জানালা বন্ধ করে। শুরু হল মিশ্র অর্থনীতির ঘোমটার আড়ালে একচেটিয়া মুনাফাবাজির স্বর্ণযুগ। তৃতীয় বিশ্বের মাটিতে সংসদীয় গণতন্ত্রের বীজে ফলল নতুন ফসল—অর্থও প্রতিপত্তির মেলবন্ধন। কজন লোকপ্রতিনিধি কোন শিল্পপতির লবিতে থাকবে তার হিসেব অনুযায়ী নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন। চিত্তরঞ্জন দাশের অনুগামী হরিচরণ দাস নয়া জমানায় হালে পানি পান না। কতদিন লাগল বুঝতে যে তাঁদের মতো দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদীর আর প্রয়োজন নেই? ইংরিজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তো শিখণ্ডীমাত্র। পেছনে আসল শক্তি আসল সংগ্রাম বাংগুর বাজাজ বাজোরিয়ার, যাঁরা সামতান্ত্রিক বণিক থেকে ধনতান্ত্রিক পুঁজিপতিতে রূপান্তরিত হতে চলেছেন। বার্ধক্যের প্রান্তে হরিচরণ কি হৃদয়ঙ্গম করলেন গুজরাতি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ভুক্ত আইনজীবি মোহনদাস করমচাঁদ গাঁধী ইন্ডিয়ান নামে একটি অলীক জাতির পিতা কারণ এই উপমহাদেশের আর্থসামাজিক পরিবর্তনের পটভূমিতে তিনি বুর্জোয়া পুঁজিপতি আঁতাতের মূর্ত বাস্তব রূপায়ণ। তার ছাগলদুধ উপবাস কৃচ্ছসাধন অহিংসা-সত্যাগ্রহ রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের বিভিন্ন সোপান।
হরিচরণ কেমন হঠাৎ বুড়িয়ে গেলেন। বাইরের জগতের প্রতি আকর্ষণ চলে গেল। যে স্ত্রী-ছেলে-মেয়ে-সংসার নিয়ে বহুবছর মাথা ঘামাননি, দাদাদের তত্ত্বাবধানে ছেড়ে দিয়ে দিব্যি দেশসেবা করে বেড়িয়ে ছিলেন এখন দিনরাত শুধু তাদের দিকেই মন। এবং ঠিক তখন কনিষ্ঠ পুত্রের শিক্ষাসমাপ্তে গৃহে প্রত্যাবর্তন। এতকাল অর্থাৎ আমার বাল্যকৈশোরে ও প্রথম যৌবনে তিনি ছিলেন একটা আবছা ব্যক্তিত্ব। পরীক্ষার ফল বেরুলে, অসুখ বিসুখে আমার প্রতি তার নজর পড়ত। বলতে গেলে আমার জগতে তার অস্তিত্ব ছিল একেবারে প্রান্তে। এখন হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল তিনি আমার অভিভাবক। লেগে গেল উঠতে বসতে বিরোধ। প্রসঙ্গ মৈত্রেয়ী।
