ভারী ভারী সিল্ক আর পোশাকি গহনায় জবুথবু মহিলার দল দর্শকের আসনে। হাঁ করে গিলছে উদ্দাম নাচের দৃশ্যটি। মুখে টুশব্দটি নেই। বাড়ি ফিরে গিয়ে স্বামীদের বলবেন,
—পঞ্জাবি ঝিঅগুড়া দেখিল। ছি ছি লাজলজ্জা কিচ্ছি নাহি।
এদিকে ছেলেমেয়েদের পঞ্জাবি বানাবার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। নামকরা ওড়িয়া পরিবার মানেই একটি অনওড়িয়া সাধারণত পঞ্জাবি বউ বা মা। আগের জেনারেশানে যেমন ছিল বাঙালি মা বা বউ। এমনকি পুষ্যি নেবার বেলাতেও বাঙালি। ওড়িশার কীর্তিমান পরিবারে খাঁটি ওড়িয়া রক্ত দুর্লভ। প্রথম প্রথম অমলের অবাক লাগত। কটক ভুবনেশ্বর এমন কিছু বড় শহর নয়। মহানগরীর পাঁচমেশালি পরিবেশ নেই। খবরের কাগজে সর্বদা ওড়িয়া জাতীয়তাবাদের জয়গান-অনওড়িয়া বিরাগ সমস্ত রাজনৈতিক দলের সর্বসম্মত নীতি। এখন তার মজা লাগে। সত্যি কথা বলতে কি এই আপাতবিরোধ আর অদ্ভুত কিছু মনে হয় না, বরং ওড়িয়াদের সঙ্গে সহমর্মিতা বোধ হয়। বাঙালি জাতীয়তা বলে তো কিছু নেই। বাঙালি তো হয় ইন্ডিয়ান নয় ইন্টারন্যাশনাল। যেটুকু বাঙালিয়ানা কলকাতায় আছে তাতে শুধু আঁতলেমি, সাহিত্য থেকে আর্টফিল্ম। অমল সে সবের ধার ধারে না কোনওদিন। আর বাঙালির পলিটিক্স এখন একরঙা, লাল। অমল একুশে পা দিতে না দিতেই দেখেছে তেরঙ্গার দিন অবসান, হা। তাদের পাড়াতে এখনও কংগ্রেস জেতে। কিন্তু বলি জিতে হয়টা কী? সে রমরমা দিন তো আর নেই। বরং ওড়িশায় সেদিক দিয়ে কিছু সম্ভাবনা আছে। এই তো ববি মুখার্জির ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড পুরনো কংগ্রেসি বলে বেঙ্গলে চিংড়ি চাষ করতে পারছিল না। অমলের মারফত এখানে লাইন পেয়ে গেছে। বালেশ্বরে প্রাইম লোকেশান-এ দিব্যি ব্যবসা ফেঁদে বসেছে। সঙ্গে জামাইবাবু ও দুজন ওড়িয়া তাদের একজন আবার ডাকাবুকো আই এ এস-বলাবাহুল্য বেনামে। কংগ্রেসিকে কংগ্রেসি না দেখলে চলে। বাঙালি হয়ে লাভ কী! বেঙ্গলে করে খেতে পারবে?
-এই যে অমলবাবু, কেমন আছেন? পার্টি কেমন জমেছে দেখেছেন? পাশের চেয়ারে এসে বসে তপন মিত্র। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিনানসিয়াল কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়ার রিজিওন্যাল ম্যানেজার।
–দারুণ। ফ্যানটাসটিক। যেমন ড্রিংক্স তেমনই খাবার। ব্লাস্ট ফারনেস চালু হতেই। যদি এই তাহলে প্রোডাক্ট যখন বাজারে যাবে তখন কী রকম পার্টি হবে বুঝুন।
—তখন লবডঙ্কা।
–সে আবার কি। লবডঙ্কা মানে? কেমন একটা অজানা ভয় অমলকে গ্রাস করে।
—সেদিন কি আর আসবে মনে করছেন? আমার তো ইনফরমেশান ব্লাস্ট ফারনেস চালুফালু কিছুই হয়নি। পুরনো টায়ার কিছু পুড়েছে।
অমলের পা দুটো কেমন ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা। এই শীতেও। চারটে প্রিমিয়াম স্কচ, ফাঁইভস্টার ডিনারের সতৃপ্ত আমেজ যেন নিমেষে উধাও।
-যাঃ কী যে বলেন। আপনার মশাই সন্দেহ বাতিক। এত বড় একটা ব্যাপার, সেন্টার স্টেট সব গভর্মেন্ট ইনভড, কার্ড ছেপেছে। আর আপনি কি না বলছেন সব ধাপ্পা।
—একজাক্টলি, সব ধাপ্পা। আপনি তো মশাই খুব সাকুলেট করেন। সবাই বলে ভুবনেশ্বরের ককটেল-ডিনারে দুটো কমন ফিচার, বিসলেরি সোডা আর অমল দাস। টি আই এল-এর জেনারেল ম্যানেজার বি সি খান্নাকে জানেন তো? সেই যার অ্যানুয়েল কমপেনসেশাসন নাকি থ্রি পয়েন্ট ফাঁইভ প্লাস পার্কসবলে কত ঢাকঢোল পেটানো? জানেন গত তিনমাস ধরে সে মাইনে পায় না? এবারে অমলের মাথার মধ্যে টং করে কি একটা বাজল। সত্যি তো গুজবটা তারও কানে এসেছে। আশ্চর্য, কথাটাকে পাত্তা দেয়নি কেন? দিতে চায়নি বলে।
-তাহলে এমন এলাহি খানাপিনা পাবলিসিটি কিসের জন্য?
-অবাক করলেন মশাই। আপনার মতো ঝানু লোক দেখি দুধের খোকা হয়ে গেলেন। সামনে লোকসভার ইলেকশন, রুলিং পার্টির ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। গভমেন্ট আর গীতা থাপার, দুজনেরই এক উদ্দেশ্য এক স্বার্থ। পাবলিকের চোখে ধুলো দাও। যা নেই তা আছে বলে দেখাও। সকলেই ম্যাজিসিয়ান।
-তাহলে কী হবে? অমলের মুখ ফস্কে বেরিয়ে যায়। হয়তো মুখেচোখে তেমন কিছু ভাবও ফোটে। তপন মিত্র বলে,
–আরে, ঘাবড়াচ্ছেন কেন। আপনার আই পি বি আই গীতা থাপারকে মোটা টাকা লোন দিয়েছে বলে। দূর মশাই। টাকা তো কত কে দিয়েছে। আমরা দিইনি? তাতে কী আমার রাতে ঘুম হচ্ছে না? আমাদের কোনও দায়িত্ব নেই। বুঝলেন না আমরা হচ্ছি পাবলিক সেক্টরের পাবলিক সারভেন্ট। আমাদের মারে কে। পরের টাকা পরমানন্দ যত ভোগে যায় তত আনন্দ। এই তত পাবলিক সেক্টরের ফিলজফি। ভয় পাচ্ছেন কেন। আপনি আমি সব এক দলে, দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ। চলুন আরেকটা ড্রিংক নিয়ে এসে আরাম করে গান টান শোনা যাক। শুনলাম সব ইম্পোর্টেড লিকোয়ের রেখেছে। ভাল কনিয়াকও। আফটার ডিনার যদি কেউ ইচ্ছে করেন। চলুন চলুন যা পাওয়া যায়।
ঠিক। নগদ যা পাও হাত পেতে নাও। এতো অমলেরও জীবন দর্শন। তপন মিত্র নিল একটা কাম্পারি, অমল কনিয়াক। কিন্তু এনজয় করার মতো মনটা আর নেই। কমিনিটে যেন সব বদলে গেছে, আলো ঝলমলে পরীর রাজ্য আস্তে আস্তে কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে। চারিদিকে হিন্দি ইংরিজি কোলাহল, এমনকী মঞ্চ থেকে মাইকে ভেসে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়া ঘুংরু-উ-উ টু টগয়ে-এতার কানে প্রায় অবোধ্য গুঞ্জন। সুসজ্জিত নারীপুরুষের দল ধীরে ধীরে রঙরূপ হারিয়ে হয়ে যাচ্ছে সারি সারি ছায়ামূর্তি। রঙিন চকচকে গ্লসি প্রিন্ট থেকে কালো নেগেটিভ। টি আই এল, একতার আগামী বিচিত্রানুষষ্ঠানের প্রধান স্পনসর। এটি করার জন্য গীতা থাপারকে কম ভুজুং ভাজুং দিতে হয়েছে। মোটা লোন-এর আকর্ষণীয় মোড়কে কালচারের ক্যাপসুল। তপন মিত্তিরের তো আর সে সমস্যা নেই সে তো শুধু একতার ফাংশন দেখতে শুনতে আসে। আর অমল তো থাকে পর্দার পেছনে। মঞ্চে
