কোথায় যেন অমল শুনেছিল বিদেশে বুফে মানে লম্বা টেবিলে সাজানো বহু প্রকার পদ যার থেকে অতিথিরা যার যার পছন্দ মতো কয়েকটা বেছে নেয়। আমাদের দেশে বুফে মানে পাত পেতে খাবার বদলে দাঁড়িয়ে খাওয়া। অর্থাৎ প্রত্যেকের প্রত্যেকটি পদ নেওয়া চাই। ফলে এক একজনের প্লেটে এই উঁচু স্তূপ। ডালের সঙ্গে কিমা মটর, চিকেন বাটার মশলার সঙ্গে রায়তা। সব মিলেমিশে অদ্ভুত ঘাট যার সর্বত্র একটাই স্বাদ, প্রচুর তেলমশলায় অভ্রান্ত উত্তর ভারতীয়ত্ব। সবাই হাপুসহুপুস করে খাচ্ছে। ছেলেবেলায় অমল কলকাতার বাড়িতে দেখেছে গা থেকে প্রথম কাজে এসে নতুন ঝি-চাকর গোগ্রাসে গিলছে। ঠাট্টা শুনত, ব্যাটা ভাত নিয়েছে দেখ বেড়াল ডিঙোতে পারে না। দু বেলা নিয়মিত পেট পুরে খাবার অভ্যাস যাদের নেই তাদের কাঙালিপনায় সকলের সকৌতুক ক্ষমাই থাকত। চাকুরি জীবনে বুফে লাঞ্চ ডিনারের হিড়িকে অমল দেখে মধ্যবিত্ত উচ্চমধ্যবিত্ত সকলেরই সেই কাঙালি মানসিকতা। প্রত্যেকে ফঁসির খাওয়া খাচ্ছে। অমল আবার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাল খেতে জুত পায় না। নিরামিষ-টিরামিষগুলো বাদই দেয়।
—সুইট ডিশ নেবে তো? মিশ্র এখনও অমলের সঙ্গ ছাড়েনি। তার স্ত্রী বলা বাহুল্য নিরামিষের দলে—এখানে তো বেশির ভাগ লোক বিশেষত মেয়েরা অধিকাংশ দিন নিরামিষ খায়। কিন্তু আজ মিশ্র অমলের প্রতি এত সদয় কেন তো বোঝা যাচ্ছে না।
-হ্যাঁ নেব। চলুন দেখি কোথায়।
মিষ্টির টেবিলে তিনরকম আয়োজন। এক ধারে গরম গরম জিলিপি। অন্যদিকে বেয়ারা প্লেটে সাজিয়ে দিচ্ছে ভ্যানিলা আইসক্রিম আর তার ওপরে ঢালা গরম গরম চকোলেট সস। কী নেবে ভাবছে এমন সময় মাঝখানের অন্নদাতাটি সাগ্রহে বলে উঠল,
-লিজিয়ে সাব রসমালাই লিজিয়ে।
রসমালাই। খট করে কানে লাগে। দেখে সারি সারি চিনে মাটির বাটিতে খুদে খুদে রসগোল্লার পায়েস জাতীয় কিছু। রসমালাইয়ের ভারতীয়করণ।
থাক বাবা। আইসক্রিমই নেয়।
-হোটেলটা বঢ়িয়া চালিছি, নুহে? ম্যাজিসিয়ান যেমন দুহাতে তিনখানা বল নিয়ে অনায়াসে লোফালুফিকরে প্রায় তেমনই দক্ষতার সঙ্গে মিশ্র জিলিপি আইসক্রিম ও রসমালাই খাবার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ কেমন বিরক্ত লাগে অমলের। ইচ্ছে হয় মিশ্রর এই খুশিখুশি গদগদ ভাবে পিন ফুটিয়ে দেয়।
–কোথায় আর চলছে। এখন দুদিন এই টি আই এল-এর দৌলতে কিছু খদ্দের জুটেছে। একটা বড় ককটেল ডিনার পার্টির কনট্রাক্ট পেয়েছে। আদার ওয়াইজ অবস্থা খুব খারাপ।
—সতরে! কাঁহিকি? ওড়িশারে তো ট্যুরিজম ভাল চালে।
—টুরিজম ভাল চলে সত্যি, আ মেজর সোর্স অফ স্টেট রেভিন। তবে আসে মেইনলি বেঙ্গলি ট্যুরিস্ট এবং তাদের বেশির ভাগ মিল ক্লাস। ফাঁইভস্টার হোটেলে কজন ওঠে? তাছাড়া বাঙালিরা সাধারণত পুরীতে বেস করে ওড়িশা ঘোরে, ভুবনেশ্বরে থাকে না।
—বঙ্গালি মানে রহু নাহান্তি সত হেই পারে। কিন্তু ফরেনার বহুৎ আসুছন্তি। মু নিজে কেত্তে থর এইঠি ফরেন টুরিস্ট দেখিছি।
—সে সব ফরেনার রাশিয়ান ইষ্টইয়োরোপিয়ান। একটা সময়ে রুবল রুপি এক্সচেঞ্জ রেট ওদের কাছে খুব সুবিধাজনক হওয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ট্যুরিস্ট আসত। আর এই ওবেরয় পেত ব্লক বুকিং। সোভিয়েত ইউনিয়নের কোলান্সের পর থেকে সে সব বন্ধ। হিন্দি রুশি ভাইভাই জমানা খতম। দ্য হ্যানিমুন ইজ ওভার।
—কেড়ে অদ্ভুত দুনিয়া হেইছি দেখন্তু মিঃ দাস। হজার হজার মাইল দূররে কৌঠি কম্যুনিস্ট সিসটেম ফেইল কলা, আউ আম ওড়িশারে হোটেল চালুনি।
-গ্লোবালাইজেশানের যুগ মিঃ মিশ্র। আমরা সবাই কানেক্টেড। কেউ আইল্যান্ড নই। এমন সবজান্তা ভঙ্গিতে অমল বলে যেন কথাগুলো রোজ খবরের কাগজে মিশ্র-র চেখে পড়ে না। বেটা উড়েকে পেয়েছে একদিন হাতে। আজ চারিদিকে হিন্দি-ইংরিজি দাপটে বঙ্গালির সঙ্গে খাতির জমাতে এসেছে। মনে পড়েছে কারা ঘরের পাশের মানুষ। অমল যেন ঘাস খায়।
ওদিকে মঞ্চে গান শুরু হয়ে গেছে। মোহে আয়ি না জগসে লাজ ম্যায় অ্যায়সা জোর সে নাচি আজ কি ঘুংরু-উ-উ টুট গয়ে-এ, ঘুংরু-উ টুট গয়ে এ-এ ঘুংরু-উ-উ টুট গয়ে। তবলা এস্রাজ বেহালার সঙ্গত। অল্পবয়সি ফর্সাফা ইংরিজিবলা যে দলটি হাসিগল্পে সবচেয়ে সোচ্চার তারা মঞ্চের সামনে খোলা জায়গাটিতে নাচ শুরু করেছে। স্পষ্টত শহরে তারা অতিথি।
এ সব নাচের মজা হচ্ছে যে যা ইচ্ছে করতে পারে। কোনও কিছু তালিম লাগে না। খালি গানের তালেতালে শরীরের বিভিন্ন অংশ দোলানো। অমল নিজেও কত ডান্স করেছে। ড্রিংসের পর দারুণ এক্সারসাইজ। হজম ঘুম সব কিছুর পক্ষে ভাল।
—আপনি নাচতেন না কি? হেসে গড়ায় ছায়া দেবনাথ।
-হাসছ? বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি। সে সব বয়সকালের কথা। জানো তখন আমার শরীরটা অনেক ভারী ছিল। তাই নিয়েই ডান্স করতাম। দম ছিল খুব। কত রোগাপাতলা ছোঁড়াদের হারিয়েছি। তাদের হাঁফ ধরে যেত আমি চালিয়ে যেতাম।
তবে সে রাতে অমল নাচেনি। তার নাচফাচ ওই নিজেদের মধ্যে। অর্থাৎ একতা ক্লাবের একান্ত জমায়েতেই সীমাবন্ধ। সেখানে সে সকলের অমলদা। এখানে সে আই পি বি আই-এর ম্যানেজার, নাচের প্রশ্ন ওঠে না। কোনও একটা অলিখিত নিয়মে এ ধরনের আনুষ্ঠানিক নৈশভোজে সরকারের সঙ্গে যুক্ত কারও প্রচলিত সংযমের গণ্ডী পেরনোর উপায় নেই। তারা শুধু দর্শক। তবে এখন সব দর্শকদের দৃষ্টি একটি মেয়ের দিকে। গায়ে হাত কাটা গেঞ্জি। রঙ গাঢ় গোলাপি যাকে বলে রানি পিংক। তলায় কালো আঁটসাঁট শর্টস। কাঁধ ছাপিয়ে সোজা কালো একটাল চুল, তার ছাঁটকাট যেন অনেকটা বহুকাল আগে দেখা এলিজাবেথ টেলরের ক্লিওপেট্রা মনে করিয়ে দেয়। মাথার তালুতে রাখা গেলাস। তাতে হাল্কা হলুদ পানীয়। হুইস্কি না? গেলাসটা হাতে না ছুঁয়ে মেয়েটি দিব্যি তাল মিলিয়ে চলছে। নাচ না সার্কাস ম্যাজিক। সে রাতে চারিদিকে কেমন ম্যাজিক ম্যাজিক আবহাওয়া। বাগানটা টুনি বাল্বে পরির রাজ্য। চারিদিকে মানুষজন যেন অন্য গ্রহের, যেখানে দারিদ্র্য নেই, নেই পিছিয়ে পড়ার অভিশাপ। এমন কি গীতা থাপারের নেহাত সাদামাঠা বেঁটেখাটো শ্যামবর্ণ মিলিটারি ছাঁট চুল স্বামীটিও তেমন সাধারণ নন। সোনালি জরির কাজ করা জমকালো গলাবন্ধে যেন আজ তার কেমন যাদুকর যাদুকর ভঙ্গি। অপেক্ষাকৃত বয়স্কদের নাচের আসরে ভাগ নিতে নেতৃত্ব দিলেন তিনি। গেঞ্জি হাফপ্যান্ট পরিহিতা যাদুরীর সঙ্গে খানিকক্ষণ সঙ্গত। সামাজিকতা তার কর্তব্য। গীতা থাপারের ওপর যে কোনও প্রচারমুখী নিবন্ধে অবধারিত মিঃ থাপারের সহাস্যমুখ বিজ্ঞাপন-স্ত্রীর কৃতিত্বে গর্বিত, তার উন্নতিতে সর্বপ্রকারে সহযোগী, প্রয়োজনে ঘরগৃহস্থালী শিশুপালনে উল্লেখযোগ্য দায়বহনকারী, সাপোর্টিভ হাসব্যান্ড ইত্যাদি। এক কথায় নতুন ভারতের নতুন পুরুষ। হাই ক্যালি পত্নীর লো ক্যালি পতি। চিরাচরিত পুরুষপ্রধান দুনিয়ার সফল স্বামীর গরবে গরবিনী স্ত্রীর উত্তরআধুনিক নারীবাদী প্রতিরূপ।
