স্টেজের দিক থেকে ঠুকঠাক তবলা বাঁধার আওয়াজ। এস্রাজ বেহালার মৃদু কাঁকে। গান শুরু হল বলে। সোনালি জরির কাজকরা কালো গলাবন্ধ ও কালো চোস্ত সজ্জিত গায়ক। বিউটিশিয়ানের কুশলী হাতে লালচে কালো মেহেদি রাঙা অবিন্যস্ত চুল। শুধু জুলপি দুটো সাদা। গায়ের রঙ গমের শীষ। ফোলাফোলা মুখ। যেন চেনাচেনা লাগছে। হ্যাঁ, এই তো সঞ্জীব উদাস যার একটার পর একটা বউ অ্যাকম্প্যানিস্টের সঙ্গে পালিয়ে গেছে। লোকটা এত নামধাম করেছে অথচ অ্যাকম্প্যানিস্ট কেন যে ঠিকমতো বাছতে পারে না কে জানে। এ সবের মধ্যে অমল খুঁজে কেন্দ্র ও রাজ্যের মন্ত্রীদের সঙ্গে হেঁ হেঁ করে আসে।
–বাব্বা। মন্ত্রীটন্ত্রীদের সঙ্গে আপনার দহরম মহরম সিল নাকি? ছায়ার প্রশ্ন। কৌতূহল কৌতুক কে জানে। অমল উত্তর দেয়,
–আরে, ভুবনেশ্বরে বাসের ওইটাই তো মজা। আমার মতো চুনোপুঁটিও সেখানে ভি আই পি। কলকাতায় থাকলে আমাকে কে পুঁছত। এই সবের জন্যই তো আমি রীতিমতো কাঠখড় পুড়িয়ে ঝাড়া বারোটি বছর ভুবনেশ্বরে রয়ে গেলাম।
–তাই বলতাসিলেন ভুবনেশ্বরে থাকাটা আপনার জীবনে স্বর্ণযুগ।
–এই তো দিব্যি বুঝতে শিখেছ। এখন বাংলাটা একটু–
–আরে রাখেন আপনার বাংলা। আপনাদের ওয়েস্ট ব্যাঙ্গল তো বহুভাষী রাজ্য। আপনাদের কাজকর্ম আপিসকাছারি আদালত কোত্থানে বাংলা চলে বলেন তো? কটা সাইন বোর্ড আছে কলকাতা শহরে বাংলায়? ভাষার কথা রাখেন। ভুবনেশ্বরে আপনার স্বর্ণযুগের কথা বলেন। সেটা বরং একটা নতুন জায়গা। আমি তো কখনও যাই নাই পুরী ভুবনেশ্বর। জায়গাটা ক্যামন?
চমৎকার। নতুন পরিচ্ছন্ন পরিকল্পিত শহর। চওড়া চওড়া রাস্তা। দুদিকে গাছের সারি। ব্যাঙ্গালোর অফ দি ইস্ট। অমলের জীবনে ভুবনেশ্বরের কোনও তুলনা নেই। কলকাতা তার কাছে লাগে! হলই বা জন্মস্থান, কর্মস্থান তো নয়, হ্যাঁ কাগজে কলমে অমল কিছুকাল কলকাতায় কাজ করেছে। সেটা দুঃস্বপ্ন। ভুলে যেতে চায়। কাগজে কলমে তো কত কীই থাকে। সে অনুযায়ী তো অমল কুমার দাসের কর্তব্যকর্মনতুন শিল্পদ্যোগে আর্থিক সাহায্যদান। কিন্তু ওটাতো ভিত্তিভূমি যার ওপর দাঁড়িয়েছিল অমলের জনসংযোগের বিরাট সৌধটি। পাবলিক রিলেশানই তো তার জীবন। ভুবনেশ্বরে সরকারি বেসরকারি বাণিজ্যিক সমস্ত রকম অনুষ্ঠানে অমল কুমার দাসের উপস্থিতি অবধারিত। সে সর্বত্র নিমন্ত্রিত। এই সম্মান সে জন্মভূমি কলকাতায় কখনও পেত। কে গ্রাহ্য করে তাকে সে শহরে যেখানে তার পরিচিতি আমাদের অমল? আরে আমাদের অমলকে মনে আছে? সেই যে ভূপেন স্যারের কাছে ইংরিজি নিয়ে রগড়ানি খেত বাংলা যুক্তাক্ষর উচ্চারণ করতে পারত না, বেটা কলকাত্তাই স-স করত, বাপটা ছিল কংগ্রেসের চাই। ইঞ্জিনিয়ারিং-এ অ্যাডমিশন তো কোটাতে….ইত্যাদি। এই তো হচ্ছে শালা কলকাতা। ভুবনেশ্বরে সে আই পি বি আই-এর ম্যানেজার। একটা চেয়ারে বসে। হাতে তার মোক্ষম অস্ত্র। একটা কলমের খোঁচায় কত ভবিষ্যতের আম্বানি হিন্দুজাকে খতম করে দিতে পারে।
–তার মানে দ্যাশে পাত্তা না পাইয়া আপনি বিদ্যাশে যাইয়া বসলেন। তাই ভুবলেশ্বরের লাইগ্যা আপনার এত প্রাম। বাঁশবনে শিয়াল রাজা।
ছায়া মেয়েটা একেবারে বাঙাল। এতটুকু রাখঢাক সভ্যতা ভব্যতা শেখেনি। যা মুখে আসে তাই ফট করে বলে দেয়। সামলানো দরকার,
–দেখো ছায়া, আমার বয়সটা খেয়াল আছে? এত ফাজলামি করো কেন?
–আহা চটেন ক্যান। একটু ঠাট্টা করসিলাম। ছায়ার ছায়াবাজি আর অমল কুমারের ধান্দাবাজি। তারপর কী হইল বলেন।
ঘণ্টাখানেক অনর্গল হিন্দি-ইংরিজি আলাপের পর অমল হঠাৎ শোনে খাঁটি ওড়িয়ায় সম্ভাষণ, পেছন থেকে–
–নমস্কার, মিঃ দাস কেত্তে বেলে আসিলে? মুখ ফিরিয়ে দেখে টাটার স্থানীয় কর্তা টি মিশ্র, সঙ্গে সাধারণ শ্যামলা চেহারার মাঝবয়সি মহিলা, পরনে তিনহাজারি বোমকাই শাড়ি। অমল আবার ওড়িয়াটা তেমন রপ্ত করতে পারেনি। ছেলেবেলা থেকে ভাষা ব্যাপারটাতেই সে কঁচা। কত কষ্টে মাতৃভাষা বাংলাটা ঠিকমতো বলতে শিখেছে। ইংরিজি তো পদে পদে মৈত্রেয়ী শোধরায়। কাজেই বাংলাতেই উত্তর দেয়,
-না, আপনি আর আলাপ করালেন কবে, ঠেস দিয়ে বলে। এতকাল টাটা কোম্পানির গরবে গরবী টি মিশ্র অমল কুমার দাসের মতো মাঝারি মাপের ম্যানেজারকে পাত্তাই দিত না, হলই বা ফিনানসিয়াল ইনস্টিটিউশনের কর্তা। ভুবনেশ্বর ক্লাবের বার-এ বেটার সঙ্গে প্রায়ই দেখা হয়। কখনও নমস্কারটুকুও করে না, সর্বদা এমন ভাব যেন অমল কুমার দাস তার নজরের যোগ্যই নয়। আজ হঠাৎ প্রেম উথলে উঠল কেন?
-ডিনর খাইছন্তি? সমস্তে কহুছন্তি বঢ়িয়া করিছি। বহুৎ গুড়া আইটেম। চালস্তু, যিবা খাইবাবু।
গেল। সত্যি খাওয়াটা দুর্ধর্ষ। মাছমাংস সবজি সব পদের একাধিক ব্যঞ্জন। ভেটকি ফ্রাই, প্রন ওরলি। চিকেন তন্দুর, চিকেন বাটার মসলা, বোনলেস মাটন কষা, কিমা মটর। ভাতকটির জায়গায় নিরামিষ পোলাও, ফ্রায়েড রাইস, কুলচা নান পুরি। নিরামিষের মধ্যে ডাল ফ্রাই, রাজমা। পালক পনির, গোবিআলু এবং সেই অবধারিত নবরতন কারি যা কিশমিশ-টিশমিশে এত মিষ্টি যে অমলের মতো খাস কলকাত্তাই জিভেও অরুচি। স্যালাডের জন্য একটা আলাদা টেবিলে আয়োজন–তখন তো হেলথ ফুড-এর বাই সকলের। সারি সারি কঁচা শাকসবজি রকমারি আকারেকাটা, রঙ মিলিয়ে সাজানো বিভিন্ন স্টাইলে মেশান। কিছু বিলিতি সস মাখা। আবার কোনওটা দিশি রায়তা–সাদা দই-এ শসা টমাটো গাজর পেঁয়াজের কুচি। উপরে ছড়ানো মশলার গুঁড়ো। শুধু স্যালাডেই একজনের পুরো খাওয়া হয়ে যায়।
