—চিন্তা করবেন না। লেখার সময় বাংলাদেশ বেতারের ভাষাই লিখি।
.
স্থান ওবেরয় ভুবনেশ্বর পাঁচতারা হোটেল। জনবসতি থেকে সে সময় একটু দুরে তার অবস্থিতি। চারদিকে ফঁকা, মাঝখানে যেন এক রাজপ্রাসাদ। নামী স্থপতির হাতে নকশা, মেঝেতে গ্রানাইট মার্বেলের ছড়াছড়ি। পানভোজনের কক্ষগুলিতে সোফাকৌচ চেয়ারের আচ্ছাদনে, সিলিং-এ দেওয়ালে দামি কাঠের কারুকাজে সর্বত্র এথনিক ছোঁওয়া। হয় ওড়িশার সুপরিচিত তাঁত বস্ত্রের নকশা নয়তো স্থানীয় বিখ্যাত মন্দিরশৈলী অনুসারী। সবই অবশ্য তৈরি রাজ্যের বাইরে। আজকে এত অতিথি সমাগম যে ভেতরে কুলোয়নি। গেট দিয়ে ঢুকে যে বিরাট লনটি একপাশে পড়ে সেখানেই আয়োজন। আলোর মালায় লেখা চোখে পড়ে ঢুকেই। টি আই এল ওয়েলকামস্ ইউ।
বাগানটিও আধুনিক। অর্থাৎ সেই আদ্যিকালের ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল তাজমহল কলকাতার ঘটি বড়লোকের তৈরি জ্যামিতিক আঁদের নয়। কোথাও গোল বা চারকোণা ক্ষেত্র নেই। নেই চারিদিকে সরলরেখায় নানারকম ফুলগাছ পাতাবাহার মন্দিরঝাউ। লনের আকৃতিই অসমান সামঞ্জস্যহীন। কোথাও চওড়া কোথাও সরু, যেন নদীর স্রোতের মতো বয়ে গেছে। জমি সমতল নয়। মাটি ফেলে জায়গায় জায়গায় ঢেউ খেলানো। এক একটি ঢেউয়ের ওপরে পাম গাছের ঝাড় যার তলায় সাজানো ছোট বড় মাটির কলসি বিভিন্ন আকারের টেরাকোটা পাত্র। লনের দুধারে অসমান ফুলগাছের ঝোঁপ। মুসান্ডা জবা রঙ্গন পাউডারপাফ। এক একটি ঝোপে এক এক রঙের ফুল। অর্থাৎ শুধু জাতি নয় রঙ হিসেব করেও গাছ লাগানো।
–বাপরে এত কেরামতি। কে করে কে এত? ছায়া দেবনাথের চোখেমুখে আন্তরিক বিস্ময়। অমল ভাবে, বেচারা গরিব ঘরের মেয়ে এত ফ্যাশানের বাগান কোথায় বা দেখবে। মায়া হয়। উত্তর দেয়,
–সে সময় বাগান করার বাই হয়েছিল সকলের। তাছাড়া ওড়িয়া মিডল আর আপার ক্লাসের বাগানে রুচি আছে। ওয়ান অফ দেয়ার মেনি প্লাস পয়েন্টস।
-বাগিচা করায় তো মেহনৎ লাগে। ওড়িয়ারা তাহলে খুব পরিশ্রমী?
-আরে না না সেরকম খাঁটিয়ে কিছু নয়। প্রচুর লোক লাগানো হত। তাদের মধ্যে তেলেগু লেবারই বেশি। এক একটি বাগানের পেছনে একটি করে বাহিনী।
–তাহলে খরচ তো এলাহি।
-সে তো বটেই, মালি মুলিয়ার মাইনে, গাছের বীজ চারা সব স্টেটের বাইরে থেকে আনা, সাব ইত্যাদির ব্যবস্থা। সবচেয়ে বড় কথা জল। ভুবনেশ্বরে তো শুকনো লাল মাটি। সেখানে মানুষই জল পায় না। একটি বাগান বাঁচিয়ে রাখা মানে হাতি পোষা। দেখতেই ভাল। তবে আমার খুব ভাল লাগত। আমি লোকের বাড়ি ক্লাব বা হোটেলের বাগানে যাই অতিথি হিসেবে। খরচ বা লোক খাটাবার মাথাব্যথা কিছুই আমার নেই। অল্প সময়ের বাসে শুধু একটাই ভূমিকা সম্ভব-কনজুমারের। আমি শুধু ভোজা।
–তারপর কী হইল?
–আবার তারপর। আচ্ছা বেশ। প্রত্যেকটি ফুলের ঝোপে টুনি বাবে ফুল ফুটে আছে। আবার যেখানে প্রকৃতি ফুল ফুটিয়েছে সেখানে বাল্বের আলো তার সঙ্গে রঙ মিলিয়ে জ্বলছে। লনে মেকসিকান গ্রাসের ঘন সবুজ মখমল। ইচ্ছে করে জুতো খুলে খালি পা ডুবিয়ে দিই। এত নরম ঘাস। লনের শেষ প্রান্তে নানা রঙের পাথরের চাই দিয়ে নকল পাহাড়। তার ফাঁকফোকরে লাগানো হয়েছে রকমারি কাটাগাছ ক্যাকটাস। কোথাও গোল গোল বল ধরে আছে, আবার কোথাও বা লম্বা শিড়িঙ্গে, এক আধটায় ঘন আগুন রঙের ফুল। রক গার্ডেনের নীচে লনের চেয়ে সামান্য উঁচু মঞ্চ। সেখানে দিশিমতে গানবাজনার আয়োজন। অর্থাৎ গাইয়ে বাজিয়েরা তলায় বসবে। যদিও গান আরম্ভ হয়নি কিন্তু মঞ্চের সামনে অর্ধচন্দ্রাকারে সাজানো মোল্ডেড চেয়ারে বসে বেশ কিছু দর্শক-বেশির ভাগ মধ্যবয়সী, অপেক্ষাকৃত কম সুসজ্জিতা এবং তেমন হিন্দি ইংরিজি না জানা মহিলার দল। হাতে বা পাশে নামানো পানীয়ের গেলাস। কমলা কি টমাটোর রস, অথবা সিট্রা সেভেন আপ পেপসি।
গলা ভেজানোর উদ্দেশ্যে অমল ইতিউতি চায়। লনের ডান দিকে সাদা চাদরে ঢাকা পর পর দুটি লম্বা টেবিলে পানীয়ের সম্ভার। টেবিলের পেছনে ব্যস্ত কর্মীর সারি। একটিতে টাটকা ফলের রস ও এরিয়েটেড ড্রিংকস্—সেখানে ভিড় প্রধানত মহিলা ও টিনএজারদের। অন্যটিতে অমলের অভীষ্ট। টেবিলের সামনে পরপর কয়েক সারি পুরুষের দল। কারো কারো সঙ্গিনীরা একটু দূরে দাঁড়িয়ে কথাবার্তা বলার ভান করে অপেক্ষা করছে কখন সফল সঙ্গীটি দুহাতে দুটি গেলাস নিয়ে ভিড় থেকে বেরিয়ে আসবে। গলা উঁচু করে অমল দেখে সব প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড স্কচ-ওল্ড স্মাগলার, সিগ্রামের ছড়াছড়ি। রাম ভদকা বিয়ার পর্যন্ত ইম্পোর্টেড। অমল তার পছন্দ মতো একটি লার্জ স্কচ, বরফ সোডা সহ নিয়ে বেরুল। যথারীতি হ্যালো হাউ আর ইউ, নমস্কার, ক্যায়সে হ্যায় জী, দিল্লিমে বহুৎ ঠাণ্ডা ইত্যাদি অর্থহীন অথচ অত্যাবশ্যক আলাপে নিজেকে ব্যস্ত করে ফেলে। এর জন্যই তো পার্টি জমায়েত। একেই বলে সোস্যালাইজিং—অপরিচিত বা সামান্য পরিচিত মানুষজনের সঙ্গে আলোআঁধারিতে ওপর-ওপর হাল্কাহাল্কা আদান প্রদান যা সে রাত শেষ হওয়ার আগে সকলে ভুলে যাবে। এর চেয়ে বোধহয় বেশ্যার সঙ্গে তার বাবুর সম্পর্ক বেশি গভীরে যায়। চারিদিকে ফিটফাট উর্দিপরা ছোঁকরা বেয়ারার দল। সবার মুখে হিন্দি। একটার পর একটা ট্রে মুখের সামনে তোলা। জী লিজিয়ে, কেয়া হ্যায়? জী তন্দুরী পনীর, জী চিকেন টিক্কা, জী মাটন শিক কাবার, কিমা বল, ভেজিটেবিল পাকোরা চিজ অ্যান্ড পাইন অ্যাপ্ল…। বাপরে, শেষই হয় না। প্রত্যেকটা ট্রে থেকে একটা করে চাখলেও পেট ভরে যাবে।
