—এই যে অমলবাবু চুপ কইর্যা বাইরের দিকে তাকাইয়া এত কী ভাবসেন?কতক্ষণ ঘরে ঢুকসি ট্যারও পান নাই, কী এত ভাবছেন? আবার ছায়া দেবনাথ।
অগত্যা অমল উত্তর দেয়
-তেমন কিছু নয়। একটা পার্টির কথা মনে হল।
—পার্টি! বা বেশ কথা। এইটা একটু ভাল কইর্যা বলেন দেখি। আমি তো বাঙ্গাল, কস্মিনকালেও পার্টিফার্টি দেখি নাই। খালি আপনার হিন্দি ফিলিমে দেখি। আপনি তো বহু পার্টি করসেন।
-আরে আমার লাইফটাই তো ছিল একটার পর একটা পার্টি। হয় সোশ্যাল নয় অফিসিয়াল বা সেমিঅফিসিয়েল। কোন সালে বা মাসে আমি কী করছিলাম যদি জিজ্ঞাসা করো তো আমার প্রথমেই মনে হবে কোন্ কোন্ পার্টি অ্যাটেন্ড করেছিলাম।
এই পার্টিটার কথা তো বিশেষ করে মনে আছে অমলের। হ্যাঁ চোখের সামনে ভাসে মস্ত পর্দায় একটা স্টিল লাইফ। শৌখিন ঘরণীর দেওয়ালে যেমন শোভা পায় টেবিলের ওপর এক রাশ ফলের ছবি। স্পষ্ট দেখতে পায় সাদা ঢাকা দেওয়া গোল টেবিলের ওপর রঙবেরঙের একটি ফলের পাহাড়। চূড়ায় রয়েছে ফুলের মতো সাজানো পাকা পেঁপে। লম্বালম্বি সরু সরু করে কাটা তার গাঢ় কমলা রঙের ফালিগুলির পাঁপড়ি। পিঠটা পাতা সবুজ, ওপরে মিশকালো বিচির সারি। দুর থেকে মনে হতে পারে যেন দক্ষিণ এশিয়া বা আফ্রিকার উষ্ণ অঞ্চলের একটি নাম না জানা ফুল। তারই তলায় পুরো এক থাক হালকা হলুদ দিশি কদলী বা মর্তমান কলা। পাহাড়ের কোলে ম্যাটমেটে মেরুন আপেল ছড়ানো। মাঝের থাকে সবুজ দক্ষিণী কমলা। আর এই বিশাল রঙবেরঙের সম্ভারের সামনে দাঁড়িয়ে ছোটখাটো পাতলা শ্যামবর্ণা দু-চারজন লোক। পরনে সাদামাঠা সার্টপ্যান্ট, হাবভাবে দ্বিধা। কারও হাতে কমলা, কারো বা কলা কিংবা আপেল। পেঁপেটা কী ভাবে নেবে বোধ হয় বুঝতে পারছে না। স্পষ্টতই এরা স্থানীয়, ভূমিপুত্র। সব বড় বড় জমায়েতেই এ ধরনের কিছু বেমানান রবাহূত অতিথি থাকে। একটু দূরে লনের বাইরের সীমানায় মেহেদির বেড়ার কাছে সন্তর্পণে ঘোরাঘুরি করছে কটা দিশি কুকুর। উচ্ছিষ্টের আশায়। দিশি তো, আর কী চাই।
ছায়া দেবনাথ বাধা দেয়।
—আচ্ছা এটা একটা কী বর্ণনা করতাসেন বলেন তো? পার্টি হইতাসে, জায়গাটা কোথায় কারা গেস্ট, ক্যামন ভোজনের ব্যবস্থা, কিছুই তো বললেন না। খালি কটা ফলফুলুরি বাজে লোক দিশি কুত্তা। আপনি না সত্যই আশ্চর্য।
সত্যি আশ্চর্য। পৃথিবীর একটি গরিব পিছিয়ে পড়া উপমহাদেশে সবচেয়ে গরিব পিছিয়ে পড়া রাজ্যের মধ্যে একটির রাজধানীতে সেই এলাহি পানভোজনের এই সামান্য অকিঞ্চিত্ত্বর দৃশ্যটি অমলের সবচেয়ে আগে মনে পড়ল। কেন আলিগড়ি কুর্তা পাজামা পরা দীর্ঘদেহী প্রায় গৌরবর্ণ পুরুষ, ডিজাইনার সালোয়ার কামিজ বা এক্সকুসিভবুটিকের শাড়িতে সুসজ্জিত অতি মহার্ঘ রূপটানে অধিক রমনীয় রমণীর দল–যাদের পাঁচজনের একজনকে মনে হয় বুঝি সুস্মিতা সেন আইশারিয়া রাই তারা সব গেল কই? চারিদিকে হিন্দুস্থানি ইংরিজির ফোয়ারা অল্পবয়সিদের কলকল হাসি ঠাট্টা তামাসা।
থাপার পরিবারের পরের জেনারেশন সবান্ধবে হাজির মনে হয়। আসল কথাই তো বলা হয়নি। টি আই এল অর্থাৎ থাপার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড-এর নতুন স্টিল প্ল্যান্টের ব্লাস্ট ফারনেস চালু হওয়া সেলিব্রেট করতে সেদিন উপস্থিত কজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, একজন আবার সস্ত্রীক। সঙ্গে পদমর্যাদা অনুযায়ী পার্শ্বচরের ঝক। বলাবাহুল্য রাজ্য সরকারের বাছাইকরা কজন মন্ত্রীও আছেন। আছেন আমলাতন্ত্রের সবচেয়ে ওপরের সারির পদাধিকারীরা, বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থার স্থানীয় প্রতিনিধি। এক কথায় রাজধানীর এভরি ওয়ান হু ম্যাটার্স।
—কোথাকার রাজধানী? ছায়া দেবনাথের বাধাদান। সব কথা তার অতি স্পষ্ট হওয়া চাই।
—ওড়িশার। ওড়িশা রাজ্যটা আছে তো? না কি উকলকন্ধমালকোশলকলিঙ্গ হয়ে গেছে। আমাদের মুনিঋষিরা কবেই বলে গেছেন আমি এক, বহু হব। অসমকে দেখ না অরুণাচল-মেঘালয় মিজোরাম আরও কত কি, মনেও থাকে না ছাতা-মাথা। ওটার পাবলিক নাম তো দ্য প্রবলেম অফ নর্থইস্ট। আমি পুরনো দিনের মানুষ। ওড়িশার এক লম্বাচওড়া কথা কওয়া লম্বাচওড়া মুখ্যমন্ত্রীর মতো টাইম মেশিনে সর্বদা বছর বিশ তিরিশ আগের সময়ে বাঁধা।
–কী যে সব রেফারেন্স দ্যান বুঝি না। তাছাড়া এত পিছাইয়া থাকেন ক্যান্? আজকের দিনটা কী ক্ষতি করল?
—আজকের দিনটার তো কোনও মানে নেই।
–কেন বলুন তো? হঠাৎ ছায়ার বাংলাটা ঠিক হয়ে যায়।
—আজকে তো আমি কেউ নই। ৩০২নং ঘরের পেশেন্ট।
—তখন কেউ ছিলেন?
—ছিলাম না? তখন চাকরি ছিল। কর্মই তো পুরুষের জীবন। ইন্ডিয়ার বেশ কয়েক জায়গায় আমি চাকরি করেছি। তবে সবচেয়ে বেশিদিন ছিলাম ভুবনেশ্বরে। সে সময়টা ছিল আমার জীবনের স্বর্ণযুগ।
আর তার আগে পরে কি তাম্রযুগ রৌপ্য যুগ? আপনি না পুরুষ মানুষ। এত সোনারূপায় মন ক্যান? এই দ্যাখেন আমরা তো কবে থাইক্যা প্লাস্টিক দস্তা টেরাকোটা এই সবেরই গয়না পরি। সোনারূপার কারবার কবে উইঠ্যা গেসে গিয়া।
–আরে স্বর্ণযুগ একটা কথার কথা। কতটা ভাল সময় বোঝানোর জন্য। সোনা খুব দামি তো।
—আচ্ছা কী কইতাছিলেন কন দেখি।
–উঃ ছায়া, তুমি থেকে থেকে বাঙাল হয়ে যাও কী করে বল তো। মাঝে মাঝে তো দিব্যি ঠিক মতো কথা বলল।
