রাতের নার্সের ওপর রাগ করে দুদিন সকলের সঙ্গে কথা বন্ধ করেছিল। নির্দেশ অনুযায়ী ওষুধের মাত্রা সাতদিন বাড়ানো চলল। এখন আবার স্বাভাবিক অর্থাৎনূ্যনতম মাত্রায় চালু। খিদে ও ঘুম মোটামুটি। সব মিলিয়ে রোগীর অবস্থা উন্নতির দিকে বলে মনে হয়। তবে অসুস্থতার দায়িত্ব অস্বীকার করে।
অতীতের স্মৃতি মন্থনে দেখি পরিবার নিকটজন বন্ধুবান্ধবের প্রতি তার আবেগ অনুভূতি একান্তভাবে অপূর্ণ। এমনভাবে কথা বলে যেন কোনও তৃতীয় ব্যক্তির জীবনকাহিনীর বিবরণ দিচ্ছে। যেন সে ব্যক্তি ভিন্ন সত্তা। বাস্তবের সঙ্গে সমস্যাটা কী নিজেকে মেনে নেওয়ার তীব্র অনিচ্ছা থেকে উদ্ভূত?
.
আমি কি সাফাই গাইছি? জীবিকাকে কেন্দ্র করেই পুরুষের জীবন আর আমার সেখানেই ঘাটতি খামতি। উন্নতির মইয়ে মাঝবরাবর উঠে আটকে গেলাম। শেষ ধাপে চড়ে বিজয় ঘঘাষণা হল না। অথচ কম ইন্ডাস্ট্রির আমি মদত যুগিয়েছি? সেগুলির মধ্যে দুটি লাভজনক হয়েছে। কটি অচিরেই রুগ্ণ বাদবাকির অস্তিত্ব শুধু কাগজে কলমে। প্ল্যান থেকে প্রোডাকশনের স্টেজেই এল না। এ সবের দায়ভার কি একা আমার? প্রত্যেকটির ক্ষেত্রে আমি আর পাঁচটা ফিনানসিয়াল ইনস্টিটিউশনের সঙ্গে একমত হয়ে সুপারিশ করেছি। এই তো খুব বিজ্ঞাপন-টিজ্ঞাপন দিয়ে কটকে অফিস খুলল সূর্য ব্রুয়ারিজ, খাঁটি দিশি মালিকানা, কারখানা পারাদীপে। তার তৈরি ককেস বিয়ার বাজারে রপ্তানি দিতে না দিতেই কোম্পানি লালবাতি। যার শেয়ারের দাম সেরদরে কাগজের চেয়ে বেশি নয় সেই কোম্পানি প্লান্ট সহ মোটা দামে কিনে নিল রাজ্য সরকার। প্রাক্তন মালিক মহান্তি কটকের বেস্ট এরিয়া তুলসীপুরে বিরাট বাড়ি করেছে, মার্বেলের মেঝে সেগুনকাঠের জানালা দরজা। সন্ধ্যায় স্কচ খেতে খেতে নাতনির সঙ্গে দাবা খেলে। যে মানবগোষ্ঠীতে উৎপাদন শুধু মালিকের ব্যক্তিগত ভোগের জন্য, যেখানে বিবর্তন এখন ব্যবসা-বাণিজ্যের পর্যায়ে আসেনি সেখানে ইন্ডাস্ট্রি বসানোর অজুহাতে সরকারের মাথায় হাত বুলিয়ে মোটা টাকা বের করে নিয়ে ব্যক্তিবিশেষের স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি বৃদ্ধির প্রলোভন কে রুখবে। বসে খাবার ধান্দা যেখানে জীবনের পরমার্থ সেখানে বাণিজ্যের লেনদেন চলবে কী করে। হ্যাঁ আমার কর্তব্য ছিল প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকারি লোন কতটা এবং কেমন ভাবে সদ্ব্যবহার হচ্ছে দেখা। মনিটরিং করা তো বাইরে থেকে রিপোর্ট নেওয়া। দরকার ছিল গোয়েন্দাগিরি। তবে কার টাকা কে খরচ করে। পাবলিক সেক্টর মানে তো রুলিং পলিটিক্যাল পার্টির স্বার্থ অনুযায়ী হরির লুঠ। আর আমি তো সে খেলায় চুনোপুটি।
যেমন ধরা যাক গীতা থাপারের টি আই এল অর্থাৎ থাপার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কেসটা। ভদ্রমহিলার তখন খুব নামডাক। ভারতের সবচেয়ে নামী মহিলা শিল্পোদ্যোগী যাঁর কেরিয়ার শুরু হরিয়ানায়, দুধ বেচে যিনি বছর পনেরোর মধ্যে একটি ছোটখাটো সাম্রাজ্যের অধিশ্বরীওষুধের কারখানা থেকে হাইফ্যাশানের জুতো তৈরি বা জল-স্থল অন্তরীক্ষে মাল ও মানুষ বহনের এজেন্সি—কী করেননি। চেহারাও তেমনি ইমপ্রেসিভ। ফর্সা লম্বা চওড়া কাঁধ ছাপানো একটাল কলপের দাক্ষিণ্যে কালো কুচকুচে চুল, চড়া মেকআপ, ঘন রঙের শাড়ি ব্লাউজ। পাঁচ মাইল দূর থেকে জানান দেয় খাঁটি আর্যকন্যা। সে সময় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর জহর নামে একটা কোট ছিল, সেটা গায়ে পড়লে কয়েক দশক সময় কোথায় উবে যেত। বাস্তবে তিনি যে সময়ের মুখ্যমন্ত্রী, জহর কোট গায়ে চলে যেতেন তার চেয়ে পঞ্চাশ বছর পেছনে। এই সময় হজমটা তার অস্তিত্বের এত গভীরে স্থায়ী ছিল যে বহু বছর আগে তাঁর প্রথম মন্ত্রিত্বের সময় যে আমলার কাজে বিশেষ সন্তোষ পেয়েছিলেন এখন তিরিশ বছর বাদে সেই আমলাটিকে খুঁজে পেতে তর তামিলনাড়ুর অপেক্ষাকৃত অখ্যাত অবসরপ্রাপ্ত জীবন থেকে তুলে নিয়ে এসে সরকারের উপদেষ্টা পদে স্থাপিত করেন এবং সে পদটিতে ভদ্রলোক বছর দুয়েক সম্পূর্ণ কাজকর্ম ছাড়া কাটিয়ে একদিন ইস্তফা দিয়ে আবার তামিলনাড়ুতে ফিরে যান। জহর কোটের এমন মাহাত্ম্য যে এটি গায়ে পরলেই রাজ্যজুড়ে বিশাল বিশাল ইস্পাত প্রকল্পের স্বপ্ন মুখ্যমন্ত্রীর চোখে ভাসে। যেমনটি দেখা যেত একসময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ভারতে। আমাদের মুখ্যমন্ত্রী সে কালের লোক। অতএব, দেশি-বিদেশি অনাবাসী সব জাতের সাদা কালো হলুদ সব রঙের শিল্পপতিদের তার রাজ্যে আমন্ত্রণ আপ্যায়ন, স্থানীয় খবরের কাগজে পাতা জুড়ে ছবিসহ বিস্তৃত বিবরণ। রেডিও টিভিতে ফলাও করে রাজ্য সরকারের সঙ্গে শিল্পপতিদের আলাপ-আলোচনার অগ্রগতির সংবাদ পরিবেশন। রাজ্যের যেখানে সেখানে ঘেঁটুপুজোর মতো ভূমিপুজোর ধুম (যার প্রত্যেকটিতে অমলকুমার দাসের উপস্থিতি লক্ষণীয়)।
সেই সময় এমন অনুকুল মাটিতে গীতা থাপারের মতো করিয়ে কম্মে মহিলার যে সাদর অভ্যর্থনা হবে তাতে আশ্চর্য কী। বিশেষ করে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী মুখ্যমন্ত্রী যখন স্ত্রীজাতির উন্নতি বিধানে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বয়সকালে তিনি শ্রেণী নির্বিশেষে স্ত্রী জাতিয়ার উন্নতির উৎস ছিলেন। এখন বার্ধক্যে তাঁর রেকর্ড হল রাজ্যে প্রতিটি মহিলা মহাবিদ্যালয় পরিদর্শন, কোনও কোনও ক্ষেত্রে কলেজের বার্ষিক অনুষ্ঠানে আতিথ্য গ্রহণ করতে গিয়ে অনুষ্ঠানের কয়েক ঘণ্টা আগেই হঠাৎ উপস্থিত হয়েছেন এবং সেখানকার ছাত্রী অধ্যাপিকাদের তাকে অন্তরঙ্গ আপ্যায়নের সুযোগ দিয়েছেন (নিন্দুকেরা অবশ্য বলে এর ফলে যে কলেজে বি. এ.-র টিউটোরিয়েল ক্লাস করার মতো জায়গা নেই, সেখানে এম. এক্লাস খোলার প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়ে এসেছেন। ) এমন নারীদরদী মুখ্যমন্ত্রীর আমলে যে মহিলা মালিকানায় টি আই এল রাজ্যের দ্বিতীয় ইস্পাত প্রকল্পের যোজনা প্রস্তুত করতে না করতেই তার অনুমোদন এবং কার্যে রূপান্তর ঘটবে তাতে আশ্চর্য কী। বলাবাহুল্য আই পি বি আই এর পক্ষ থেকে আমার অর্থাৎ অমল কুমার দাসের ভূমিকা অকৃপণ সহযোগিতার। উত্তর ভারতীয় কর্মতৎপরতা যে পূর্বভারতীয় দীর্ঘসূত্ৰী আলস্যের কত বিপরীত, টাকা খরচের ব্যাপারে চোখের সামনে প্রমাণ হয়ে গেল। ঢাকঢোল পিটিয়ে এক শুভদিনে প্রকল্প কার্যকরী, ব্লাষ্ট ফারনেস চালু। সে উপলক্ষে বড়াখানা এত বছর পেরিয়ে এত কাণ্ডকারখানার পরও মনে জ্বলজ্বল করছে। একেবারে চোখের সামনে ভাসে।
