কোনও বিশেষ বিষয়ে বা ক্ষেত্রে উৎসাহ না থাকলেও অমলের আতঙ্কের চেহারাটা ছিল সুস্পষ্ট ও নির্দিষ্ট। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ইংরিজি। যেমন গম্ভীর তেমনি কড়া ইংরিজির ভূপেন স্যার। নেসফিল্ডের গ্রামার তার ভগবদ্গীতা। অজস্র এবং প্রায়শই অযৌক্তিক নিয়ম সুত্র মুখস্থ করা ও সেগুলির যথাযথ প্রয়োগ অমলের কাছে যেন এভারেস্টআরোহণ। চেষ্টা করাও অনর্থক কারণ ট্রানস্লেশনে সাবস্টেন্সে তার হাতে ক্লাসের ফার্স্টবয় সুবিনয়ও পাঁচ সাড়ে পাঁচের বেশি রাখতে পারে না। কতকাল পরে সেই সুবিনয়ের সঙ্গে দেখা। বাই চান্স। ওকালতিতে ভাল পসারও করেছে। কোণার্ক সিমেন্টের রিটেইনার। কটকে কাজে এসেছিল। উঠেছিল ভুবনেশ্বরে আই টি ডি সির হোটেল কলিঙ্গ অশোকে। কফি শপে দেখা। অমলকে সেখানে এক পার্টি খাওয়াচ্ছিল।
—আরে অমল না?
–সুবিনয়! বেশি বদলাসনি।
–তুই কিন্তু বেশ ভুঁড়ি বাগিয়ে ফেলেছিস।
–বাগাবো না। ব্যাংকার বলে কথা। তা কেমন আছিস বল। এখানে কী করছিস? কথার ফাঁকে সুবিনয় বলে–
–মনে আছে ভূপেন স্যারের কথা? ট্রানস্লেশনের খাতাটা খুলে সেই আধখানা চাঁদ চশমার কাঁচের মধ্যে দিয়ে একদৃষ্টে তাকানো আর হাঁক—এই যে অমলা এদিকে আয়। এটা কী লিখেছিস? ইংরিজি না উড়ে? হা হা হা।
—চুপ চুপ। এখানে ও শব্দটি উচ্চারণ কোরো না। আমরা বাঙালিরা বড় অন্যায়ভাবে অন্যদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছি। আমি কিন্তু এদের কাছ থেকে খুব কো-অপারেশন পাই। কলকাতার চেয়ে ঢের ভাল আছি এখানে।
—আরে ধৎ তুইও যেমন। ওরকম সেন্সে নিচ্ছিস কেন। ভূপেন স্যারেরা ছিলেন প্রি-প্যারোকিয়ালিজম যুগের মানুষ। তখন লোকে অত তোয়াক্কা করে কথাটথা বলত না। দে ডিন্ট মীন এনিথিং।
তা অবশ্য ঠিক। তারা কিছু ভেবে কথা বলতেন না। ছিলেন তো নেহাত সাধারণ বাঙালি নিম্নমধ্যবিত্ত। তবে হ্যাঁ, ভদ্রলোক অর্থাৎ পড়াশোনার বুনিয়াদ পাকা। তাই বোধহয় যাদের তেমন পড়াশোনা করতে দেখতেন না তাদের প্রতি অবজ্ঞা। হাজার বছরের ব্রাহ্মণ্য বুদ্ধিজীবীর অহঙ্কার বাঙালি উচ্চবর্ণের মজ্জায় মজ্জায়। বাংলার বুড়ো দুঃখহরণবাবু কম বিধিয়ে বিঁধিয়ে কথা শুনিয়েছেন অমলকে, ব্যাটার বাংলা শোনো। একটা যুক্তাক্ষর ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারে না। প্রশান্তকে বলে পোসান্তো। প্রতিকার কে পোতিকার আর শস-ষ তো ছাড়। আরে বাপু দু-তিন পুরুষে আর কত ওঠা যায়। চাষার জিভে কি আর বাংলা হবে। তিনি জাতে ব্রাহ্মণ, সংস্কৃত শব্দগুলি তার অনায়াস আয়ত্ত, বাংলা ভাষার স্ট্যান্ডার্ড উচ্চারণ তার জিভ অনুযায়ী। অতএব জাত তুলে খোঁটা দিতে বাধত না। যদিও সে সময় অমলের বাবা হরিচরণ দাস বি এ বি এল স্কুলের গভর্নিং বডির মেম্বার কংগ্রেসের স্থানীয় চাই মিউনিসিপ্যাল ইলেকশনে লড়েন।
তাই তো অঙ্ক আর বিজ্ঞানে অমলের আদা জল খেয়ে লাগা যাতে ভবিষ্যতে ইংরিজি বাংলার বিশেষ ধার ধারতে না হয়। মেজো জ্যাঠার রাখা মাস্টার দাদাদের খবরদারি তার ওপরে সংরক্ষণের সুবিধা সব মিলে বহু চেষ্টায় একটি অপেক্ষাকৃত নতুন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে নাম লেখানো। ব্যস আরেক পুরুষ বাঙালি ভদ্রলোক।
—আরে, ব্যস আপনি ইঞ্জিনিয়ার নাকি! এই না শুনছিলাম ব্যাংকে কাজ করতেন? ছায়া দেবনাথ কাহিনীর মাঝখানে ঢুকে পড়ে।
—হ্যাঁ ঠিকই শুনেছ। তবে আমি তো সাধারণ ব্যাঙ্কে ছিলাম না। ব্যবসা-বাণিজ্য, বিশেষ করে নতুন ইন্ডাস্ট্রি প্রোমোট করার জন্য টাকা জোগানো ছিল সে ব্যাঙ্কের কাজ। আর নতুন ইন্ডাস্ট্রি মানেই তোকলকারখানা বসানো। তাই সরকারের মনে হল ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাকগ্রাউন্ড থাকলে ভাল। পাবলিক সেক্টর তো তাই একটু অদ্ভুত অদ্ভুত ধারণা।
—আর হিসাবপত্র? ব্যাঙ্ক মানে তো টাকার হিসাব তাইনা? কাকে টাকা দেবেন, কাকে দেবেন না, দিলে কত দেবেন, এসব আপনার কাজ না?
–মেয়েটা বাঙাল হলে কী হবে বুদ্ধি আছে।
–সে তো বটেই। সরকারের সব গাইডলাইন দেওয়া থাকে কোন ইন্ডাস্ট্রি কতটা প্রায়রিটি পাবে। কোন রাজ্যে বেশি বিনিয়োগ করা উচিত। এছাড়া টাকা চাইলেই তো দেওয়া যায় না। প্রজেক্ট প্ল্যান চাই। সেটা আমার অফিস থেকে একজামিন করে তারপর রেকমেন্ড করা। হেড অফিসে পাঠাই। ডিসিশন সেখানে।
এসবে ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যেটা কতটুকু লেগেছে। সত্যি ব্যাঙ্কে কাজ করার ফলে আমার ডিগ্রিটা শুধু কাগজেই রয়ে গেল। হাতে-কলমে কিছুই কাজে এল না।
আমাদের দেশে কজন পুরুষ যে বিদ্যাটা শেখে তা কর্মক্ষেত্রে বাস্তবে লাগায়। অথচ দোষ দিই মেয়েদের, বিএ-এমএ পাশ করে মা-ঠাকুমার মতো ঘরকন্না নিয়ে আছে। পড়াশোনা কোনও কাজে লাগে না। অদ্ভুত। বলি তাদের স্বামীদের পড়াশোনা কোন কাজে লেগেছে? আসলে প্রাচীন মেধা আধ্যাত্মিকতা ঐতিহ্য ইত্যাদি নিয়ে মুখে বড়াই করি এদিকে মনে মনে সমস্ত উদ্যমের সমস্ত শিক্ষার উদ্দেশ্য অর্থোপার্জন।
৩. রোগী প্রচুর কথা বলছে
ছায়া দেবনাথের গবেষণা, কেস নং ৯
রোগী প্রচুর কথা বলছে। বর্তমান জগৎ বা পারিপার্শ্বিক সম্বন্ধে এখনও কৌতূহল দেখা যায় না। সর্বদা অতীতে স্থিতি। তবে স্মৃতিচারণ আগের মতো অতটা বিক্ষিপ্ত নয়। একটা নির্দিষ্ট ছক যেন আঁচ করা যায়। যে ঘটনাটি মনে পড়ে তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দিতে রোগী এখন সমর্থ। শুধু তাই নয়, ঘটনার সঙ্গে তার জীবনের সম্পর্কের হদিসও স্পষ্ট। অর্থাৎ বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে একদিন যে যোগাযোগ ছিল এবং এই যোগাযোগের টানাপড়েনেই যে জীবন এ সত্যটা ধীরে ধীরে তার চেতনায় আসছে।
