তবু দাঁড়াল।
ভাবল, আমি কি চলে যাব?
তারপর দেখল কখন যেন চারটে বেজে গেছে, উনুনে আগুন দিয়েছে বংশী। নেমে এল আস্তে আস্তে।
.
কিন্তু আগুন কি শুধু উনুনেই?
মানুষের হাতের তালুতেও আগুন থাকে না কি? আঙুলের ডগায়?
সেই উত্তপ্ত আগুন-ভরা হাতে যদি কেউ কারও কবজি চেপে ধরে, জ্বলে যায় না সেখানটা? ফোঁসকা পড়ে যায় না?
হাতটা ছাড়িয়ে নেবার ব্যর্থ চেষ্টায় ঘেমে উঠে হাতের অধিকারিণী রুদ্ধকণ্ঠে বলে, ছাড়ুন!
না ছাড়ব না! আগে কথা দাও, অপর্ণার ঘরে আর যাবে না তুমি?
কেন?
সে প্রশ্ন থাক না।
বিনা যুক্তিতে শুনব কেন কোন কথা?
ওকে সেবা করতে যাবারই বা কী দরকার তোমার?
ধরুন টাকার জন্যে। বিনি মাইনের কাজ করছি আপনাদের বাড়ি, ভাবলাম বড়লোকের স্ত্রীর নার্সিং করে যদি ভাল মাইনে পাওয়া যায়?
বিশ্বাস করি না।
অবিশ্বাসের কী আছে, আমি গরীব, আমি চোর।
তবু বিশ্বাস করব না।
হাত ছাড়ুন!
না।
যদি চেঁচাই?
পারবে না।
কী করে জানলেন?
জানি। এ আশ্রয় ভেঙে যাবার ভয়ে সব সয়ে চুপ করে থাকবে তুমি!
যদি মাকে বলে দিই?
পারবে না। কারণ জানো মা বিশ্বাস করবেন না। আমি জানতে চাই, তুমি কেন হঠাৎ অপর্ণার সেবা করবার জন্যে ব্যাকুল হলে?
যদি বলি, ওই ঘরের আশ্রয়টাই নিরাপদ মনে হয়েছিল!
কী? কী বললে?
হ্যাঁ, তাই! ভেবেছিলাম কান যে কথা বিশ্বাস করবে না, সে কথা প্রমাণিত করার একমাত্র উপায় চোখ! অহরহ ওই চোখের পাহারায় থাকতে পেলে–
চুপ, চুপ করো।
আমি বলতে চাইনি।
কুশীর সঙ্গে তোমার কিসের এত গল্প?
জিগ্যেস করে উত্তর আদায় করবেন?
না, জিগ্যেস করব না। জিগ্যেস না করেই বুঝতে পেরেছি। জানো, একথা যদি মার কানে ওঠে—
জানি উঠবে না। ওঠাতে পারবেন না। আপনি বেশ ভাল রকমই জানেন, তাতে আমার এ বাড়ির আশ্রয় যেতে পারে। আপনার সব প্রশ্নের উত্তর তত পেলেন, এবার হাত ছাড়ুন! কবজিটা ভেঙে যাবে।
অপর্ণার ঘরে আর ঢুকবে না নিশ্চয়?
কথা দিতে পারছি না।
তোমার কাছে হাতজোড় করছি।
ওই তো কাগজের পুতুল, ওকে আপনার এত ভয় কেন?
ভয় কেন? আশ্চর্য! এটা একটা প্রশ্ন? শোনো, তুমি এসে পর্যন্ত সমস্ত সংসার জটিল হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছে আরও কিছু যেন আসছে। ভয়ানক কোন বিপদ..ভীষণ কোন ঝড়…
তবে আমাকে চলে যেতে দিন।
না না! তা হয় না। শুধু তোমায় মিনতি করছি—
আচ্ছা, ঠিক আছে। কিন্তু যদি প্রশ্ন ওঠে, কি জবাব দেব?
জবাব আমি দেব। বলব, অপর্ণা পছন্দ করে না, অপর্ণা বিরক্ত হয়।
কিন্তু সেটা তো বানানো কথা! উনি তো খুব পছন্দ করছিলেন আমাকে। ডেকে সাড়া না পেলেই বরং বিরক্ত হন। যদি ডাকেন? তাহলে?
জানি না, তাহলে কি! কিন্তু আমি বলছি, খুব একটা ভয়ঙ্কর পথ বেছে নিয়েছ তুমি। এ পথে বিপদ আসতে পারে, মৃত্যু আসতে পারে। খুব সাবধান!
অথচ আপনি সাবধান হলে সবই সহজ হয়ে যায়।
আমি? আমি কি সাবধান হই না? হচ্ছি না? কিন্তু রক্তমাংসের তৈরী মানুষ আর কত বেশী সাবধান হতে পারে বলতে পারো?
.
জানলার ধারে গিয়ে হাতটাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখল চৈতালী।
না, ফোসকা পড়েনি, শুধু রক্ত জমে গিয়ে কালশিটে পড়ে গেছে, শুধু আগুনের ফুলকির মত যেন একটা দাহ উঠছে ভেতর থেকে।
কি হল? হাতে কি হল?
ক্ষেণু এসে হাতের বইগুলো দুদ্দাড় করে নামাল।
আর হঠাৎ রাগে সমস্ত শরীর জ্বলে উঠল চৈতালীর। সবাই সুখী থাকতে পারে, সবাই নিশ্চিন্ত। শুধু পৃথিবীর সমস্ত যন্ত্রণা, সমস্ত ভয় জমানো আছে চৈতালীর জন্যে।
শুধু একটি ভদ্র আশ্রয়, শুধু একটু মাতৃস্নেহ, শুধু একখানি সংসারের পরিবেশ, এই তো রাজার ঐশ্বর্য হয়েছিল চৈতালীর, এতেই তো সে ধন্য হয়ে গিয়েছিল, সেই পাওয়াটুকু নিয়েই সমস্ত জীবন কাটিয়ে দিতে পারত, কিন্তু চৈতালীর ভাগ্যের শনি সেটুকুকে তিষ্ঠোতে দিল না। আনলো ঘূর্ণিঝড়!
সে ঝড় একদিকে যেমন সারাজীবনের দুঃসহ গুমোট কাটিয়ে দিয়ে আনল উদার আকাশের • খোলা হাওয়া, তেমনি আনল ধুলো বালি শুকনো পাতা। সে বালি চোখে ঝাঁপটা মারছে, সমস্ত আলো থেকে আড়াল করে ধরছে।
কই কি হল বললে না? হাত পোড়ালে বুঝি?
রাগকে লাগামে কষে আটকাতে হবে।
চৈতালী কেমন একরকম হেসে বলে, হ্যাঁ।
তা তো পুড়বেই। জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সব কাজ নিজের ঘাড়ে তুলে নিতে গেলেই কাটে, ঘেঁড়ে, পোড়ে। ওষুধ লাগিয়েছ কিছু?
নাঃ! লাগাতে কিছু হবে না।
না না, অবহেলা করা ঠিক নয়। তিল থেকেই তাল হয়– সুদক্ষিণা বলে ওঠে, যাক আজকের কী খাবার বল? খিদেয় তো নিজেকেই নিজে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে।
.
চৈতালীর মনে পড়ে, ছোলার ডাল সেদ্ধ করে বেটে রেখেছিল আজ, ডালপুরী করে দেবে বলে। নিরামিষ খাবার করলে সুলক্ষণারও খাওয়া হয়, তাই রোজ বিকেলেই দেশী খাবার বানায় চৈতালী।
সুলক্ষণা বলেন, ছিলি তো একটা বাউণ্ডুলে বাপের কাছে, এত সব শিখলি কোথায়?
চৈতালী হাসে। বলে, এমনি।
কিন্তু এমনি নয়, কিছুদিন তার বাবা একটা খাবারের দোকানের ভেতরদিকের একটা ঘরের ভাড়াটে ছিল। সে ঘরের সামনেই সর্বদা দোকানের যাবতীয় রসদ প্রস্তুত হত।
বড় বড় তেলজবজবে বারকোশে রাশি রাশি ময়দা, বড় বড় গামলায় শিঙাড়ার পুর, বড় বড় পরাতে কচুরির ভাজি, ডালপুরীর পুর, সব বসানো থাকত ওদের ঘরের সামনের ঘরটায়।
খাবারওলা বলেছিল ওর কারিগরদের একজন দেশে গেছে, চৈতালীরা বাপ-বেটিতে যদি
