কোনটা?
এই একাধারে রাঁধুনী চাকরানী খোবানী ঝাড়দারনী মেথরানী, সব কিছুর পার্ট প্লে করে চলা! মানে হয় এর?
চৈতালী হেসে ওঠে, নাম করে করে বললেই অনেক। আমার তো কিছুই কষ্ট হয় না। গায়েই লাগে না।
বাহাদুরি নেবার জন্যে অনেকে পিঠে হাতি তোলে, তাতেও তাদের গায়ে লাগে না।
বাহাদুরি নেবার জন্যে?
তবে আবার কি?
যদি বলি আমার ভাল লাগে?
তামা-তুলসী-গঙ্গাজল হাতে করে এসে বললেও বিশ্বাস করব না।
কেন, কেউ কি কাজ করতে ভালবাসে না?
বাসে। বাসতে পারে। কিন্তু শ্রীমতী অপর্ণা রায়ের সেবার ভার কেউ ভালবেসে কাঁধে তুলে নেয়, এ আমাকে কেটে ফেললেও বিশ্বাস করব না।
আর মার বুঝি কষ্ট হয় না?
ক্ষুব্ধস্বরে বলে ওঠে চৈতালী।
মা!
মাসীমা, মাসীমা! আপনাদের মা। তাকেই তো ওই সব কিছু
সেটা মার অভ্যাস হয়ে গেছে।
আমারও হবে।
কৌশিকের তরল কণ্ঠে একটু বুঝি গভীরতার স্পর্শ লাগে। সে ম্লান হেসে বলে, তা হয়তো হবে। কিন্তু মার হল, নিজের ছেলের রুগ্ন বৌ। মার কথা আলাদা। কিন্তু তুমি করবে কোন্ প্রেরণায়? দৈনিক কমণ চালের ভাত খাও যে সেই ভাতের দাম আর উসুল হচ্ছে না!
চৈতালী চোখ তুলে বলে, শুধু ভাতের দাম? সেই ঋণ শোধ করছি আমি?
কৌশিক হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে যায়।
ওই নির্ভীক স্পষ্ট চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে এক পলক। তারপর স্তব্ধতা ভেঙে বলে, ভাতের ছাড়া আর যদি কোন ঋণ থাকে, সে কি শোধ দেবার?
আমি যাই!
যাবে। তার আগে শোনো, এভাবে পাগলের মত আত্মপীড়নের কোন মানে হয় না।
যদি বলি আত্মপীড়ন নয়, আত্মনিবেদন!
কৌশিক আর একবার স্তব্ধ হয়।
তারপর বলে, অপর্ণা রায়ের কাছে অন্তত সে নিবেদন না করলেও চলে।
বিশেষ করে কারও কাছেই নয়। ধরুন শুধু এই সংসারের কাছেই।
তোমার হিসেবের সঙ্গে আমার হিসেব মেলে না– কৌশিক বলে, বংশীকে বসিয়ে রেখে? তার কাজগুলো পর্যন্ত করার প্রয়োজনীয়তা কিছুতেই স্বীকার করানো যাবে না আমাকে।
চৈতালী টেবিলের ওপরটা আঁচল দিয়ে ঝাড়তে ঝাড়তে মুখ না ফিরিয়ে বলে, বসে থাকলেই আমার হাত-পায়ের মধ্যে কেমন একটা অস্বস্তি হতে থাকে, হয়তো চোরের রক্ত বলেই–
চৈতালী!
চৈতালী চুপ।
চৈতালী, শোনো। এইটুকু শুধু বলে রাখি, এ সংসারে তোমার পোেস্ট কেবলমাত্র দয়ার আশ্রয়ের আশ্রিতার নয়।
এত ভয় দেখাবেন না!
ভয়?
হ্যাঁ, ভয়! ভয়ানক ভয়! আমার এই নতুন জীবনটুকু মুছে যাবার ভয়, এই আশ্রয়ের বাসাটি ভেঙে যাবার ভয়। মার মুখোমুখি দাঁড়ানোর ভয়
হঠাৎ সমস্ত শরীরে একটা মোচড় দিয়ে ছুটে নীচে নেমে যায় চৈতালী।
আর কৌশিক ভাবে, মানুষ কি নিজেই নিজের কর্তা? নিজের ওপর কি কন্ট্রোল রাখতে পারে মানুষ?
এই মুহূর্তে যে সব কথা হয়ে গেল এখানে, তার সম্পর্কে কি এক বিন্দুও ধারণা ছিল কৌশিকের? ও কি ভেবেছিল এই সব কথা বলবে? শুধু আলটু-বালটু কতকগুলো কাজ করার জন্যে বকবে বলেই তো দাঁড় করিয়েছিল চৈতালীকে।
তারপর ভাবল, বিচলিত হচ্ছি কেন?
তা ছাড়া আর কী-ই বা বলেছি? কথার পিঠে কথা পড়ে যে ধারায় চলে গেছে, সেই ধারায় কথাকে ঠেলে দিয়েছি বৈ তো না। ওতে ভাববার কিছু নেই।
ভাবল ভাববার নেই, তবু ভাবতে লাগল।
প্রথম থেকে পর পর কী কথা হল ভাবতে লাগল।
ভাবতে লাগল প্রতিদিন দুপুরে এ ঘরে আসে চৈতালী, আশ্চর্য!
অনেক কিছু ভাবার পর হঠাৎ সচেতন হয়ে ভাবতে চেষ্টা করল, চৈতালী এ বাড়িতে ঢুকেছিল বাসন চুরি করতে!
ভাবতে পারল না।
বার বার খেই হারিয়ে গেল সেদিনের কথা, ঝাপসা হয়ে গেল সে-দিনের ছবি।
.
ফুলের মত সুরভিত, পালকের মত হালকা অথচ ভয়ানক একটা ভয় পাওয়ার মত দুরুদুরু মন নিয়ে ছাত থেকে নেমে এসেছিল চৈতালী। এসেই থমকে গেল। অপর্ণার ঘরে সুলক্ষণা।
ব্যস্ত হয়ে একখানা হাতপাখা নিয়ে বাতাস করছেন বৌকে।
চৈতালী এসে দাঁড়াতেই ঈষৎ কঠিন সুরে বলেন, ভার যদি নিতে পারবি না তো সাহস করেছিলি কেন?
মূক চৈতালী অপর্ণার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। দেখে তার চোখ বোজা, চোখের কোণে জল।
ডেকে ডেকে নাকি পায়নি তোকে! ছিলি কোথায়?
ছাতে।
ছাতে? আবার আজ গুচ্ছির সাবান কেচেছিস বুঝি?
চৈতালী মাথা হেঁট করে দাঁড়িয়ে থাকে।
আর বন্ধ চোখ আস্তে খুলে, অপরিসীম ক্লান্ত সুরে অপর্ণা বলে, ঠাকুরপোর আজ ছুটি না?
সুলক্ষণার ঘরের পাশে একটা ঘর আছে, ছোট্ট এক ফালি, ট্রাঙ্ক বাক্স রাখবার, কাপড় ছাড়বার। সুলক্ষণার সুবিধের কথা ভেবেই যখন বাড়ি তৈরী হয়েছিল, তখন সুলক্ষণাই এ বাড়ির প্রধান ছিলেন। তখন কিসে সুলক্ষণার সুবিধে হবে, সেটাই চিন্তা ছিল সংসারের সমস্ত সদস্য কটির। তখন অপর্ণা শুধু বৌ!
শান্ত নম্র মিষ্ট হাস্যমুখী বৌমা মাত্র।
তার জন্যে ভাল শাড়ী দামী গহনা ছাড়া আর কিছু ভাবা হত না।
কিন্তু কখন কোন্ ফাঁকে অপর্ণাই কেন্দ্রে এসে গেছে। সুলক্ষণা সরে গেছেন কেন্দ্র থেকে। এখন শুধু অপর্ণার সুবিধে ভাবা হয়। শুধু সুলক্ষণার ঘরের পাশের এই ফালি ঘরটা ওঁর সেই সব দিনের সাক্ষ্য দেয়। সে বলে, এক সময় ওঁর সুবিধের জন্যে অনেক ভাবা হত।
কিন্তু সুলক্ষণাই সেই স্মৃতিটুকু মুছে ফেলেছেন। সেই ঘরটার দখল ছেড়ে দিয়েছেন। সেখানে চৈতালীকে জায়গা দিয়েছেন। এটা এখন চৈতালীর ঘর।
নিজের ঘর।
সেই ঘরে এসে জানলার কাছে দাঁড়াল চৈতালী।
এ জানলা রাস্তার ওপর নয়, বাড়িরই পাশের গলির ধারে।
