তা সেই সময় অনেক কাজ শিখে ফেলেছে চৈতালী। কিন্তু সে কথা বলা যায় না। বলতেই হয়, কি জানি, এমনি!
সুদক্ষিণাকে বলল চৈতালী, তুমি যাও ওপরে, হাত মুখ ধুয়ে আসতে আসতে হয়ে যাবে।
তার মানে হয়নি!
তা তো হয়নি। চৈতালীর অনেক খানিকটা সময় যে হরণ করে নিয়ে গেল এক দস্যু।
আর শুধুই কি সময় হরণ করল?
হয়ে যাবে!
সুদক্ষিণা বলে, আহা থাক না তবে বাবা। ওই হাত-টাত পুড়িয়েছ! আগে তো রোজ এসে। টোস্ট খেতাম, তাই খাওয়া যাবে। চল চল, বরং একটা মজার কথা আছে–
মজার কথা?
হ্যাঁ ভারী মজার! ছোড়দা এলেই বলব ভাবছিলাম।
বাড়িতেই তো আছেন এখন ছোড়দা!
বাড়িতে? এ সময়? এত সুমতি? তাহলে তো আজ একটু সিনেমাতেও যাওয়া যায়। সেদিন তত বৌদি মার্ডার কেস করে ছাড়ল।
ছোড়দা, ছোড়দা! ডাকতে ডাকতে দুমদাম করে ওপরে উঠে গেল সুদক্ষিণা।
.
এ শব্দ অপর্ণার বুকে গিয়ে হামানদিস্তার ঘা দিল।
অপর্ণা ক্ষীণ গলায় বলল, দরজাটা বন্ধ করে দেবে? তবু একটু
কৌস্তুভ উঠে গিয়ে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে আসে।
অপর্ণা বলে, অত দূরে বসছ কেন?
দূরে কোথা? এই তো কাছে।
বিছানায় উঠে এসে বসে কৌস্তুভ।
অপর্ণা একটু নিঃশ্বাস ফেলে বলে, জীবনে আমার বড় ঘেন্না ধরে গেছে।
কৌস্তুভ আস্তে ওর গায়ে হাত রেখে কাতর গলায় বলে, এসব কথা বললে আমি কত কষ্ট পাই বোঝো না কেন অপু?
না, তাই বলছি। যদি সেকাল হত, বেশ সুন্দরী স্বাস্থ্যবতী একটি মেয়ে দেখে আর একটা বিয়ে দিয়ে দিতাম তোমার।
কৌস্তুভ ওর গালের হাড়ে একটু টোকার মত দিয়ে বলে, সেকালে জন্মাইনি বলে আপসোস হচ্ছে আমার।
অপর্ণা একটু চুপ করে থেকে বলে, মার ওই পুষ্যি মেয়েটার খুব স্বাস্থ্য।
অপর্ণার দেহের মধ্যে নতুন রক্ত আর তৈরী হয় না বলেই কি স্মৃতিশক্তি অত কমে গেছে অপর্ণার? .
একশোবার শুনেও চৈতালী নামটা মুখস্থ করতে পারে না? বলে, মার পুষ্যি মেয়ে!
কৌস্তুভ চকিত হয়ে বলে, কে? কার কথা হচ্ছে?
ওই যে তোমাদের বাড়ির রাঁধুনী। যখন এসেছিল কী রোগা, কী নোগা! আর এই কমাসেই দেখ চেহারা। গা দিয়ে তেল পিছলে পড়ছে। একটা জোয়ান মেয়ের চেহারা যেমন হওয়া উচিত, ঠিক তেমনি।
কথা বলে আর স্বামীর মুখের দিকে নিষ্পলকে তাকিয়ে থাকে অপর্ণা!
কী দেখছ?
তোমায়।
কখনো দেখনি বুঝি?
কই আর দেখলাম!
থাক, আর দেখতে হবে না। ওষুধটা খেয়ে ফেল।
ওষুধটা ঢালতে ঢালতে ভাবে কৌস্তুভ, রক্তশূন্যতা শুনে শুনে কান পচে গেল। এত রক্ত শুষেও কোন উন্নতি হচ্ছে না।
আশ্চর্য!
ওষুধ খেতে চায় না অপর্ণা, ভুলিয়ে ভালিয়ে প্রতিবার খাওয়াতে হয়।
সে পর্ব মিটলে, অপর্ণা আস্তে থেমে থেমে বলে, ওকে একবার ডাক না?
কাকে? শঙ্কিত চোখে চায় কৌস্তুভ।
ওই যে ওই চৈতালীকে।
না, নামটা বিস্মৃত হয়নি তাহলে।
কৌস্তুভ শান্ত গলায় বলে, ওকে কেন?
বিছানাটা একটু ঝেড়ে দেবে
কী আশ্চর্য! এটুকুর জন্যে লোক ডাকতে হবে? আমি দিচ্ছি
না, আরো কাজ আছে। ডাক না।
কৌস্তুভ উঠে দাঁড়ায়। টেবিলে রাখা ওষুধের শিশিগুলোর দিকে তাকায় একবার। তাকায় দেরাজের ওপর আর আর্শির সামনে। সর্বত্রই শিশি। শুধু শিশিই নয়, নানারকম শিশি কৌটো টিউব।
সেইগুলোর দিকে তাকিয়ে যেন নাম পড়ে নিতে চায় কৌস্তুভ। যেন ওই নামগুলোর মধ্যে ওর ভয়ানক দরকারী একটা কিছু লুকোনো আছে।
তারপর বেরিয়ে ডাকে, বংশী!
বংশীকে কেন?
ও ডেকে দেবে।
কেন? তুমি ডাকতে পার না? ডাক না?
আমার ডাকার কী দরকার?
বাঃ, রোজ ভাত খাও ওর কাছে
বেশী কথা বলা হয়ে যাচ্ছে। একটু চুপ কর। দরকারী কথা ছাড়া আর কিছু বলা বারণ, মনে নেই?
৩. বংশী এসে দাঁড়ায়
বংশী এসে দাঁড়ায়।
কৌস্তুভ বলে, তোর বৌদিদি কী যেন বলবে!
অপর্ণা চোখ বোজে।
অপর্ণার রক্তহীন গালে যেন হালকা সিঁদুরের ছোপ পড়ে।
বংশী বার দুই বৌদি বৌদি ডেকে একটু ইতস্তত করে বলে, ঘুমোচ্ছেন!
কৌস্তুভ আশ্চর্য হয়
। অন্তত বংশী দেখে, বড়দা খুব আশ্চর্য হয়ে গেছে।
বলে, এই তো জেগে ছিল।
দাঁড়িয়ে থাকে খানিকক্ষণ বংশী, তারপর সরে পড়ে।
আর অনেকক্ষণ ধরে ঘুমের ভান করে পড়ে থাকতে হয় অপর্ণাকে।
.
মজার কথাটা সুদক্ষিণার কৌশিককে নিয়েই।
ক্লাসের একটি মেয়ে কতদিন ধরে বলছিল, তার মা নাকি সুদক্ষিণাকে দেখতে চেয়েছেন, তাই গিয়েছিল সুদক্ষিণা। আর তিনি সুদক্ষিণাকে হাতে পেয়ে–হি হি করে হাসে সুদক্ষিণা, বুঝলি ছোড়দা, আমাকে পেয়ে সে এক মজার প্রস্তাব!
হেসেই অস্থির, কৌশিক ওর মাথায় একটা বইয়ের কোণ ঠুকে দিয়ে বলে, প্রস্তাবটা কি তাই তো শুনলাম না। তোর বিয়ের নাকি? এমন একটি নিধিকে দেখেই বুঝি ছেলের বৌ করে নিতে ইচ্ছে করছে?
হি হি হি, প্রায় তাই, কাছাকাছি এনেছ। ছেলের বৌ নয়, মেয়ের বর। দেখা নিধির দিকে ফিরেও একবার দেখল না, না দেখা নিধির জন্যেই কাতর। পুঙ্খানুপুঙ্খ জিগ্যেস করল আমাকে তোর কথা।
আমার কথা? আমার কথা মানে? আমার আবার কী কথা?
আহা, এই তুমি রাগী না হাসিখুশী? মেজাজী না হেলাফেলা? ঝালের ভক্ত না মিষ্টির ভক্ত?
এই সব জিগ্যেস করল?
করল তো।
আর তুই তার উত্তর দিলি বসে বসে?
দিলাম তো!
গোল্লায় যা।
খাবারের প্লেট নিয়ে ঘরে ঢুকল চৈতালী। বলল, এ কি দিদি, হাত মুখ ধোওনি?
ধোবো! মজার কথাটা শুনে যাও, এই এই
কী?
ছোড়দার না, একটা হিল্লে হয়ে যাচ্ছে। আমার ক্লাসের একটা মেয়ের মা
