এখন ভাল লাগে।
একটা মানুষ কেবলমাত্র আমার জন্যে নিজেকে দিচ্ছে, দিতে পেরে কৃতার্থ হচ্ছে, এ অনুভূতি, বড় সুখের। তাই ওর হাতে সঁপে দিয়েছেন নিজেকে।
তাই আড়ালে এই সম্বোধনের লুকোচুরি।
আড়ালে মা, তুমি, সামনে মাসীমা, আপনি।
মা বলে ডাকতে পায়নি কখনো।
এই আকাঙ্ক্ষা সেই অভাবের।
সুলক্ষণা বলেন মাঝে মাঝে, আর অত কষ্ট কেন বাপু? মা-ই বলিস। আর কিছু বলবে না ওরা।
চৈতালী মাথা নীচু করে হেসে বলেছে, না, এই বেশ। এই মজা! আমি যে তোমার চোর মেয়ে! তাই লুকোচুরি!
সুলক্ষণা বলেন, হ্যাঁ সত্যি, সে কথাটা ভুলে গিয়েছিলাম। শুধু চোর মেয়ে নয়, চোরের মেয়ে! তাই আমার মত আস্ত একটা মানুষকেই চুরি করে বসে আছিস।
.
এরপর আর মাইনের কথা ওঠেনি।
আজ উঠল।
চৈতালী নিজেই ওঠাল।
সুলক্ষণা বললেন, মাইনে নিবি তো?
নিতেই হবে! চৈতালী কৌস্তুভের আনত মুখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ়স্বরে বলে, না নিলে যখন বৌদি আমার হাতের সেবা নেবেন না!
পরাস্ত হলেন সুলক্ষণা।
এত কথা সুদক্ষিণা জানে না।
কৌশিক তো নয়ই।
সুদক্ষিণাই জানতে পেরে জানাল কৌশিককে। উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, ছোড়দা শুনেছিস, চৈতালীকে দিয়ে বৌদির সব কিছু করানো হচ্ছে।
সব কিছু মানে?
সব কিছু মানে সব কিছু। বিছানায় পড়ে থাকার পিরিয়ডে এখন বেডপ্যান পর্যন্ত
ধেৎ!
ধেৎ মানে? নিজের চোখে দেখে এলাম।
মা কি বললেন?
মাকে জিগ্যেস করিনি। দেখেই তাজ্জব হয়ে তোর কাছে ছুটে এসেছি। সত্যি ছি ছি, না হয় একটা বেওয়ারিশ মেয়ে পাওয়া গিয়েছে, তাই বলে এই সমস্ত কাজ
সুদক্ষিণার নিজের মত বয়সের একটা মেয়েকে এ কাজ করতে দেখে ভারী বিচলিত বোধ করছে সুদক্ষিণা।
মা করেন, কিছু মনে আসে না।
মা যেন সব কিছুর ঊর্ধ্বে।
কৌশিক ওর পিঠটা ঠুকে দিয়ে বলে, উত্তেজিত হয়ো না ভগ্নী, এটা ওকে দিয়ে কেউ জোর করে করায় নি। সুযোগও নেয়নি। এ ওর স্বখাত সলিল। নিশ্চয় নিজেই ব্যাকুলতা করেছে, বেডপ্যানটা নিয়ে কাড়াকাড়ি করেছে মার সঙ্গে
তুই কি করে বুঝলি?
বুদ্ধির দ্বারা। তোর ঘটে একফোঁটা বুদ্ধি থাকলে তুইও বুঝতিস।
আমি কিন্তু মাকে বলব
কেন মিথ্যে মাথা গরম করছিস?
যা হচ্ছে হতে দে
হ্যাঁ, ওই কথাই বলে কৌশিক।
ওই বলেই বোনকে প্রবোধ দেয়।
কিন্তু নিজে?
নিজে জেরার পথ ধরে।
সুবিধেও হয়ে যায়।
দুপুরবেলা কৌশিক যে বাড়ি আছে, জানত না চৈতালী।
নিত্যি যেমন দুপুরে বালতিখানেক কাপড়-চোপড় সাবান কেচে ছাতে মেলে দিতে আসে, তেমনি এসেছিল। নিত্যি যেমন কাজ সেরে নীচে নেমে যাবার সময় কৌশিকের ঘরটায় একবার ঢুকে একটু বসে, একটু গুছিয়ে রেখে চলে যায়, তেমনিই ঢুকেছিল, সেদিন ঢুকেই থতমত খেল।
কিন্তু চট করে চলে যাওয়াও বিপদ। হয়তো বা সন্দেহজনকও। তাই প্রশ্ন করতে হল, এ কী, আপনি এখন ঘরে যে?
কৌশিক ইজিচেয়ারে শুয়ে পা দোলাচ্ছিল, উঠে বসল।
গম্ভীর ভাবে বলল, আমিও প্রশ্ন করতে পারি, এ কী তুমি এখন এ ঘরে যে?
চৈতালী চারদিকে চেয়ে দেখে।
রোদে ঝাঁ ঝাঁ স্তব্ধ দুপুর, ছাতের একধারের একখানা মাত্র ঘর, তিনদিকের রোদ পেয়ে যেন ভাজা ভাজা হচ্ছে। অথচ কৌশিক নির্বিকার চিত্তে বসে আছে মাথার ওপরকার পাখাটা পর্যন্ত না খুলে।
প্রথমেই পাখাটা খুলে দেয় চৈতালী।
যতটা ঠেলে দেওয়া যায় পয়েন্টটা দেয়।
হয়তো কিছু একটা করে আড়ষ্টতা কাটাবার জন্যেই এই কাজটা করা। হয়তো বা করে ওই আত্মভোলা ছেলেটার ওপর মমতার বশেই।
খুলে দিয়ে নিত্য অভ্যাসমত টেবিলের অগোছালো বইগুলো গোছাতে গোছাতে বলে, আমি তো এ সময় রোজই আসি।
কৌশিক আরও গম্ভীরের ভান করে।
বলে, কেন? এ ঘরে কী কাজ? কি জন্যে আসো?
চৈতালী ফিরে দাঁড়ায়।
হঠাৎ অন্য এক চোখে চায়, অন্য এক সুরে কথা বলে ওঠে, যদি বলি চুরি করতে আসি!
.
এই স্তব্ধ দুপুরের পটভূমিকায়, যখন দূরে কোথায় যেন একটা ঘুঘু পাখির ডাক ছাড়া কোথাও কোন শব্দ নেই, তখন এই অন্য চাওয়া, অন্য সুর কৌশিককে বুঝি একটু কাঁপিয়ে দেয়, একটু বুঝি অস্বস্তিতেও ফেলে, তবু সামলে নিতে জানে সে।
তাই হেসে উঠে বলে, দ্যাটস্ রাইট। তাই আমি কিছুদিন থেকে কোন কিছু যেন খুঁজে পাচ্ছি না। সব কিছু হারিয়ে যাচ্ছে।
কী কী হারিয়েছে?
লিস্ট করে রাখিনি। তবে মনে হচ্ছে যে বেশ অনেক।
দুই হাত বিস্তারিত করে মাপটা দেখায় কৌশিক।
চৈতালী তেমনি এক সুরে বলে, লিস্ট করে রাখবেন, পুলিসে ডায়েরী করার সময় কাজে লাগবে।
তাই রাখব ভাবছি।
আমি কিছু ভাবছেন না?
আর কি?
ভাবছেন না–এই জন্যেই বলে, স্বভাব যায় না মলে! এত পাচ্ছে চোরটা, তবু মাঝদুপুরে চুপি চুপি এসে আমার ঘর খুলে চুরি করতে আসে!
তাও ভাবছি হয়তো কৌশিকও যেন আর এক চোখে চায়।
নাকি চায় না?
ও শুধু চৈতালীর চোখের ভ্রম!
কৌশিকের চোখের দৃষ্টি কোনদিন শরীরী হয়ে এসে আক্রমণ করে না। আগুনের তাপের মত জ্বালা ধরায় না। মুছলেও মুছতে চায় না, এমন ভাবে গায়ে লেগে থাকে না।
ওর চোখ আলোর মত।
আয়নার মত।
দীঘির জলের মত।
কৌশিক বলে, সে অপরাধের বিচার হবে।
কোথায়?
এই এখানেই। এটাই কোর্ট। আর এই মান্যগণ্য ব্যক্তিটিই জজ!
আমার কাজ আছে। নীচে যাচ্ছি।
নো নো, আগে বিচারটা হয়ে যাক।
এভাবে দুপুরবেলা বসে বসে আপনার সঙ্গে গল্প করলে লোকে কি বলবে?
কী আবার বলবে? কৌশিক ভুরু কুঁচকে বলে, এটা গল্প নয়, কাজের কথা হচ্ছে। বলছি–এটা কী হচ্ছে?
