অপর্ণা বোকার মত বলে, ছাতে? তোমার ঘরের সামনেই তো ছাত? দেখা হয় না তোমার সঙ্গে?
কৌস্তুভ অগ্রাহ্যভরে বলে, গরীব দুঃখীর মেয়ে, খেটে খাওয়াই অভ্যাস–আশ্চয্যি হবার কি আছে?
.
না, তা হয় তো নেই।
কিন্তু আশ্চয্যি হতে হচ্ছে এখন কৌশিককে অপর্ণার উত্তেজনায়।
তোমরা সিনেমা যাও, আমি আজ রাঁধব।
ঘোষণা করে অপর্ণা উত্তেজিত মুখে! রক্ত ফুরিয়ে যাওয়া শরীর আরক্ত করে তুলতে পারে না মুখটাকে, শুধু ঘাম গড়িয়ে পড়ে রগের পাশ দিয়ে।
তুমি রাঁধবে!
কৌশিকও সুদক্ষিণার মতই ভুল করে।
হা হা করে হেসে ওঠে।
কেন? আমি রাঁধতে জানি না? খাওনি কখনো তোমরা আমার হাতে?
আহা খেয়েছি বৈকি। কিন্তু সে সব তো প্রাগৈতিহাসিক যুগের কথা। এখন তোমার হাতের রান্না খাওয়া মানে তো হত্যাপরাধ। হঠাৎ এ খেয়াল?
অপর্ণা আঁচলটা টেনে গায়ে ঘুরিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে রুদ্ধ গলায় বলে, কেন, একদিন ইচ্ছে হতে পারে না? যাও, তোমরা ওকে নিয়ে যাও। আমি রাঁধবই।
কৌস্তুভ গম্ভীর ভাবে বলে, পাগলামি কোর না অপর্ণা, শুয়ে পড়ো। বেশী হাসি-ঠাট্টাও তোমার শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর তা জানো তো! শোও, শোও।
না, শোব না।
.
শান্ত অপর্ণা হঠাৎ জেদী হয়ে উঠেছে।
বুঝলাম অপর্ণা অবুঝ হয়ে উঠেছে।
আমি যাচ্ছি।
আঃ অপর্ণা! কি ছেলেমানুষী হচ্ছে?
না, আমি যাব। আমি কাজ করবো।
কৌস্তুভ ধরে ফেলে।
কৌশিককে ইশারা করে পাখাটা বাড়িয়ে দিতে।
অপর্ণাকে শুইয়ে দেয়।
অবশ্য শুইয়ে দেবার দরকার বিশেষ ছিল না। নিজেই শুয়ে পড়েছে সে ঘেমে ঠাণ্ডা হয়ে!
দেখ দিকি, ছি ছি! কী যে পাগলামি করো!
কৌস্তুভ স্ত্রীর হাতের ওপর আস্তে আস্তে হাত বোলায়। নীল নীল শিরা-ওঠা সাদা প্যাকাটির মত হাত।
এই হাতে একগোছা করে চুড়ি পরে থাকে অপর্ণা। হাতের ওই শীর্ণতার দৈন্য যেন আরও বেশী স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাতে।
কৌশিক বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।
ভাবে, দাদা যদি মাঝে মাঝে বকত বৌদিকে, তাহলে হয়তো ভদ্রমহিলার কিছুটা উপকারই হত। ভাবে, ওকে একবার সহজ মানুষের মত ছেড়ে দিলে কী হয়? এখানে না থোক, কোথাও চেঞ্জে নিয়ে গিয়ে। হয়তো ওকে সর্বদা ওই তুমি মারা গেলে, মারা গেলে ভাবটা মনে করিয়ে দেওয়াই ওকে মৃত্যুর দিকে খানিকটা এগিয়ে দেওয়া।
কিন্তু কৌশিকের বুদ্ধি নিচ্ছে কে?
মা আর ছেলেতে মিলে–
না, সিনেমা আর যাওয়া হয় না সেদিন সুদক্ষিণার। তার বদলে কৌশিককে যেতে হয়। ডাক্তারকে ডাকতে।
অনবরত ঘেমে ঘেমে ঠাণ্ডা মেরে যাচ্ছিল অপর্ণা।
ডাক্তার আসে। তাই পুরো ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া পর্যন্ত আর পৌঁছয় না।
বয়েস বেশী নয় ডাক্তারের, কিন্তু বিচক্ষণ। ওর বিচক্ষণতার জোরেই তো এযাবৎ টিকে আছে কৌস্তুভ রায়ের স্ত্রী অপর্ণা রায়।
.
উৎসবের দিন ফুরোয়।
আবার সেই বিষণ্ণ আবহাওয়া।
অপর্ণার ওঠা বারণ।
কৌস্তুভের রোজ অফিসের দেরি হয়ে যাচ্ছে, সুলক্ষণাকে রোজ দুতিনবার স্নান করতে হচ্ছে।
সুলক্ষণা?
তা সুলক্ষণা ছাড়া আর কে?
নার্স রাখা কি সম্ভব?
বারো মাস তিরিশ দিনের জন্যে?
কিন্তু চৈতালীর কথা মনে পড়ছে না সুলক্ষণার?
বিনি পয়সায় যে খেতে পাচ্ছে, পরতে পাচ্ছে, থাকতে পাচ্ছে!
সুলক্ষণার মনে পড়ে না।
মনে পড়ে চৈতালীর নিজেরই।
যখন খেতে বসেছে কৌস্তুভ, সুলক্ষণা কাছে বসে।
সুলক্ষণা বলেন, কী যে বলিস। তুই আর কত করবি?
আরও অনেক করা যায় মাসীমা। আমার যা কাজ, সে তো তক্ষুনি ফুরিয়ে যায়। সারাদিনই মনে হয় বসে আছি।
তা হোক। রুগীর সেবা কি সোজা নাকি?
সোজা নয় বলেই তো বলছি মাসীমা! শক্ত কাজেই আনন্দ আমার। আমি বৌদির সেবার ভার নেব। দাদা, আপনি বলুন মাকে।
আপনি বলুন!
দাদা!
কৌস্তুভ চমকে ওঠে। বলে, আমি? কী বলবো আমি?
কী আর! মাকে বোঝাবেন। আমার ওপর যাতে বৌদির ভারটা ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্দি হতে পারেন!
সে কি, সে কি? তাই কি সম্ভব?
কেন? অসম্ভব কিসে?
চৈতালী দৃঢ়স্বরে বলে, বৌদি আমার হাতের সেবা নেবেন না?
কৌস্তুভ আবারও হয়তো সে কি সে কি বলতে যাচ্ছিল, সুলক্ষণা হঠাৎ তাকে অপ্রতিভ করে দিয়ে বলে ওঠেন, না নেওয়াই সম্ভব।
আচ্ছা, নেন কি না নেন, আমি বুঝব।
না না, কৌস্তুভ বলে, সে হয় না।
কেন হয় না, তা তো বলছেন না।
সে, ও ইয়ে মানে লজ্জা পাবে।
লজ্জা পাবেন? কেন? আমি যদি বাইরের নার্স হতাম?
সে আলাদা কথা রে চৈতালী– সুলক্ষণা বলেন, ওসব খেয়াল ছাড়।
চৈতালী দৃঢ়স্বরে বলে, মোটেই ছাড়ব না। আপনাকে আর এত খাটতে দেব না। লজ্জা তো আমারও আছে। বেশ তো, মাইনে করা লোককে যদি লজ্জা না হয় তো মাইনেই দেবেন আমাকে। বলেছেন তো প্রথমে।
কথাটা মিথ্যা নয়।
হাতখরচ করিস বলে কিছু টাকা প্রথম দিকে দিতে চেয়েছিলেন সুলক্ষণা, নিতে চায়নি চৈতালী। হাতজোড় করে প্রত্যাখ্যান করেছে। বলেছে, হাতে হাতে তো সবই পাচ্ছি মা, আশার অতিরিক্ত, দরকারের অতিরিক্ত পাচ্ছি। তবে আবার টাকা নিয়ে কি করব আমি?
বাঃ, তোর যদি কিছু ইচ্ছে হয়—
তোমার কাছে চেয়ে নেব মা। চাইলে দেবে না?
.
সামনে মাসী, আড়ালে মা।
নিভৃত সেবার সময়।
যখন দুপুরে ছেলেমেয়ে বাইরে থাকে সুলক্ষণার, বৌ ঘুমোয়, তখন চৈতালী গায়ে হাত বুলিয়ে দেয় সুলক্ষণার, চুলের জট ছাড়িয়ে দেয়। সুলক্ষণার ঘর গুছিয়ে দেয়, বিছানা রোদে দেয়।
প্রথম প্রথম অস্বস্তি বোধ করতেন সুলক্ষণা, অনভ্যস্ত চিত্ত কারও কাছে সেবা নিতে সঙ্কুচিত হত, কিন্তু এই নম্র অথচ প্ৰবলা মেয়েটার কাছে হার মানতে হয়েছে সুলক্ষণাকে।
