তাই কৌশিকের সঙ্গে কৌতুক করে বসে? দুই চোখ নাচিয়ে হেসে উঠে বলে, কোন মেয়ে করে না। অনেক মেয়ে আপনি দেখেছেন বুঝি?
দেখছিই তো হরদম। কিন্তু তোমার মত এমন দেখলাম না। খাও দাও ঘুরে বেড়াও, সুখে স্বচ্ছন্দে থাক–তা নয়। বেশ তবে কাজকর্ম করো, হেসেখেলে কাটাও, তা নয়। অদ্ভুত!
.
চৈতালী কৌশিকের এই কথার ধরনে না হেসে পারে না। হাসে। কিন্তু পরক্ষণেই গম্ভীর স্বরে বলে, আমি কি সাধারণ আর সবাইয়ের মত?
বেশ, না হয় অসাধারণই। কিন্তু এই সাধারণদের সঙ্গে একটুআধটু মিশলে মাহাত্ম্য কিছু ক্ষুণ্ণ হবে না।
আমি যদি আপনাদের সঙ্গে মিশতে যাই, আপনাদের মাথা হেঁট হবে না?
আমাদের মাথা কি এতই হালকা যে, এই সামান্য ভারে হেঁট হয়ে যাবে?
কিন্তু আমি যে কী, তা তো আমি নিজে জানি। কোন লজ্জায় কবে–
কৌশিক এবার গম্ভীর হয়।
সত্যিকার গম্ভীর।
বলে, জীবনের প্রারম্ভে মানুষ যা জানে, সেটাই শেষ জানা হতে পারে না। নতুন করে জানতে শিখতে হয়, নতুন করে নিজেকে গড়তে হয়। কেউ যদি কোন অগৌরবের মধ্যে জন্মায়, সেটা তার নিজের হাত নয়, কেউ যদি জ্ঞান বুদ্ধি জন্মাবার আগে ভুল নির্দেশে চলে কাঁটাঝোপে গিয়ে পড়ে, সেটাই তার পথ নয়। প্রতিদিনের জন্মানোর মধ্যে দিয়ে গৌরব সৃষ্টি করতে হয়, প্রতিদিনের চেষ্টার মধ্যে দিয়ে ভাল পথ নির্ণয় করতে হয়। আর সেটা শুধু নিজের ওপর শ্রদ্ধা থাকলে। নিজের ওপর শ্রদ্ধা না থাকলে–কে? কে ওখানে?
চমকে উঠে পড়ল কৌশিক।
বলল, সিঁড়ির তলার দরজা দিয়ে এসে কে চট করে ওপরে উঠে গেল মনে হল না?
কি জানি, দেখিনি তো।
দেখনি? কিন্তু আমি যেন দেখলাম, সাদা কাপড়ের মত কি যেন একটা
তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল কৌশিক।
.
কিন্তু সত্যিই কি দেখেনি চৈতালী?
দেখেছে।
শুধু আজ নয়, রোজই দেখে। যখন তখন দেখে। দেখে আর কণ্টকিত হয়। অবাক হয়। ভয়ে বেশীক্ষণ ভাবতেও পারে না।
তাই হিসেব মেলাতেও পারে না।
কোন প্রকারেই পারে না।
অথচ আগ্রহাতুর মুগ্ধ একজোড়া চোখের দৃষ্টি যেন শরীরী হয়ে সর্বাঙ্গে লেগে থাকে, আটকে থাকে, একা ঘরে বসেও মনে হয় মুছে ফেলা যাচ্ছে না তাকে।
সেই দৃষ্টি দুজনের ওপর স্থির হয়েছিল এতক্ষণ নিভৃত কোন অন্তরাল থেকে। বুঝতে পেরেছে চৈতালী।
.
বৌয়ের চুল বেঁধে দিয়ে এসে বসেছিলেন সুলক্ষণা। ওকে দেখতে পেলেন তিনি। বললেন, কি খুঁজছিস রে কৌশিক, এঘর-ওঘর করে?
চোর!
চোর খুঁজছিস?
হ্যাঁ, মনে হল কে যেন সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল। একটু সাদার আভাস
উঠে এল তো খোকা!
খোকা!
তাই তো দেখলাম।
কিন্তু? না না, দাদা কেন অমন ঝট করে চলে আসবে? আমরা রয়েছি ওখানে।
সুলক্ষণা হেসে ফেলে বললেন, তাহলে দেখ খুঁজে, কোথায় চোর! এক চোর নিয়েই তো–
চোর ফোবিয়া! কৌ
স্তুভ শান্ত গলায় বলে, এ রকম হয় মানুষের।
হয়? কৌশিক বলে, তোমাদের কথার কোন মানে হয় না। তুমিই তাহলে ওরকম চট করে উঠে এসেছ?
কৌস্তুভ গায়ের পাঞ্জাবিটা খুলে হ্যাঁঙারে ঝুলিয়ে রাখতে রাখতে বলে, বললাম তো আমি যেমন ভাবে রোজ আসি, ঠিক সেই ভাবেই এসেছি।
হ্যাঁ, ঠিক এই কথাই প্রথমে বলেছে কৌস্তুভ। বলেছে, কেন, তাড়াতাড়ি আসতে যাব কেন? যেমন আসি–
কৌশিক বলেছে, তুমি তো সিঁড়ি ওঠ গুনে গুনে—
কথাটা সত্যি।
কৌশিকের মত কৌস্তুভ কোনদিনই দুটো সিঁড়ি একসঙ্গে টপকে ওঠে না।
কৌশিকের রাগে রাগ করেনি কৌস্তুভ। হাসেওনি। শুধু বলেছে, তাই-ই এসেছি।
তাহলে চোর সোজা ছাতে উঠেছে—
কৌস্তুভ বলেছে চোর ফোবিয়া।
কিন্তু চোর শুনে যার ভয় পাবার কথা, সে ভয় পায় না। শুধু ওদের দুই ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, লোকটাকে কী রকম মনে হল ঠাকুরপো? মেয়ে না পুরুষ?
কি জানি বাবা! সিঁড়ির ঠিক বাঁকটায় ওঠার সময় একটা পাঞ্জাবির কোণের মত
কী মজা! কী মজা! হঠাৎ হাততালি দিয়ে ওঠে অপর্ণা। নেহাৎ ছেলেমানুষের মত বলে, তাহলে যে করে তোক খুঁজে বার করে ফেল ঠাকুরপো। চোরে চোরে বিয়ে দিয়ে দিই। বাড়িতে যখন এত চোরের আমদানি!
কচি খুকীর মত হাসি কথা আর হাততালি।
কৌশিক অবজ্ঞার হাসি হাসে।
.
একদা যখন অপর্ণার বিয়ে হয়েছিল, এক গা গহনা আর সরস্বতী প্রতিমার মত রূপ নিয়ে ঝলমলিয়ে এসে ঢুকেছিল অপর্ণা এ সংসারে, তখন কৌশিকের কিশোর চিত্ত একেবারে মুগ্ধ হয়ে সেই ঔজ্জ্বল্যের কাছে আত্মসমর্পণ করে বসেছিল। বৌদির কাছ থেকে নড়তে ইচ্ছে করত না তখন কৌশিকের।
কিন্তু সে ঔজ্জ্বল্য আজ হারিয়ে গেছে।
রক্তমাংসের মানুষটা কাগজের পুতুল হয়ে গেছে, আর বিচ্ছিরি রকমের বোকা হয়ে গেছে। ক্রমশ পরিণত হয়ে ওঠা কৌশিকের তাই বৌদিকে নিতান্ত নাবালিকা বলে করুণা হয়। ওর নিতান্ত ছেলেমানুষের মত কথা শুনে হাসি পায়।
তাই অবজ্ঞার হাসি হাসল কৌশিক।
কিন্তু কৌশিকের বড় ভাই?
তার মুখটা লাল হয়ে উঠল কেন? বোধ করি অপমানেই। কৌশিকের এই হাসি তত তার চোখে পড়েছে।
অপর্ণা বলল, তোমরা সিনেমা যাচ্ছ শুনলাম।
যাচ্ছিলাম তো। কৌশিক বলে, মার ওই পুষ্যি বোনঝিটিকেও অফার করেছিলাম। কিন্তু সময় নেই তার। কাজের অসুবিধা হয়ে যাবে। মানুষ যে কী করে এত কাজ-পাগলা হতে পারে! বংশী তো প্রায় বেকার হয়ে গেছে আজকাল। সেদিন দেখি, ও বাসন মাজছে। বকতে গেলাম বংশীকে, বংশী উলটে আমাকেই বকে দিল। বলল, শুনবে না, আমার হাত থেকে কাজ কেড়ে নিয়ে নিয়ে সব কাজ করবে। আমি কি করব? আর সত্যি এতও পারে! সব কাজ শেষ করে ফেলে ছাতে উঠে যায়, চাল ডাল বড়ি আচার রোদ্দুরে দিতে।
