তবে যে সেদিন বললি, পড়াশোনায় খুব চাড় আছে
তা আছে। সেটা অস্বীকার করছি না। কিন্তু রান্নাঘর ভাড়ারঘরের অধিকার ত্যাগ করে নয়। ষোল আনা বজায় রেখে
তবে থাক। যে যার নির্বুদ্ধিতার ফল ভোগ করবে। তবে ভাবছিলাম মনটন খারাপ, কিছু তো করা হয় না। ও বেশ বেঁধে চলেছে, আর আমরা বেশ খেয়ে চলেছি, ব্যস!
সুদক্ষিণা বলে, বলে দেখব?
দেখ! হয়তো বৃথা পণ্ডশ্রম। যাইহোক মাকে কিন্তু বলিস আগে।
সুলক্ষণা তখন বৌয়ের চুল বেঁধে দিচ্ছিলেন।
.
সুদক্ষিণা এসে ভূমিকা করল, মা, সন্ধ্যেবেলার রান্নাটা বংশী চালিয়ে নিতে পারবে না আজ?
সুলক্ষণা অবাক হলেন।
অপর্ণা অবাক হয়ে তাকাল।
সুদক্ষিণা আবার বলল, কি, পারবে না?
পারবে না কেন? কিন্তু কারণটা কি? চৈতালী কি শরীর খারাপ টারাপ কিছু বলেছে?
না, না, শরীর খারাপ হতে যাবে কেন? ভাবছিলাম, সিনেমা যাই। তা ও বেচারী তো কোথাও যেতে টেতে পায় না–রাতদিন বাড়ির মধ্যে থাকে, ফেলে যেতে ইচ্ছে করছে না– থেমে গেল সুদক্ষিণা। থতমত খেল।
অপর্ণার ফ্যাকাশে মুখ শাকমূর্তি হয়ে গেছে।
সুলক্ষণা অস্বস্তি অনুভব করলেন।
কত বছর যেন হয়ে গেল, অপর্ণা বাড়ির বাইরে যায়নি, জগতের কোন আমোদ আহ্লাদের ভাগ গ্রহণ করতে পায়নি।
সুদক্ষিণাও বোধ করি বৌদির মুখ দেখে অপ্রতিভ হল। এমন দিনও তো ছিল অপর্ণার, যখন নিজে সে সেজেগুজে পরীর মত হয়ে এসে বলত, ক্ষেণু, সিনেমা যাবে?
সুদক্ষিণা বলত, বাবা সামনে পরীক্ষা
আরে দূর! জীবনভোর তো পরীক্ষা দেবে। পৃথিবীকে ভোগ করে নিতে হয়।
সুলক্ষণা বলতেন, পড়ো মেয়ে, এত নিত্যি নিত্যি সিনেমা থিয়েটার দেখা কেন বৌমা? তোমরা যাচ্ছ যাও!
অপর্ণা বলত, ওকে ফেলে যেতে ভাল লাগে না মা!
.
সে সব কদিনের ব্যাপার? সে সব কবেকার ঘটনা? কদিন পৃথিবীকে ভোগ করে নিতে পেরেছিল অপর্ণা?
কিন্তু আজ সুদক্ষিণার ভূমিকা প্রধান।
সুদক্ষিণাকে আজ আর নিয়ে যেতে হয় না, সে নিজেই নিয়ে যাবার মালিক। তাই সেও আজ বলছে ওকে ফেলে যেতে ইচ্ছে করছে না।
কিন্তু সেই ওটা অপর্ণা নয়। সে আর একজন। ধুলো মাটি থেকে কুড়িয়ে তুলে ঠাকুরঘরে স্থাপনা করা হয়েছে যাকে। সে যে বাইরে কোথাও যেতে পায় না, সারাদিন বাড়ির মধ্যে পড়ে থাকে, এই কষ্টকর অবস্থাটা অনুভব করে কাতর হচ্ছে সুদক্ষিণা!
এতে যদি শুধু অপর্ণার সাদা ফ্যাকাশে রঙটা বাসী শাকের মত হয়ে যায়, আর কিছু হয় না, সেটা অপর্ণার অসীম ক্ষমতার পরিচয়। দেহে যার রক্ত নেই, তার পক্ষে এতটা ক্ষমতা আশ্চর্য বৈকি।
সেই আশ্চর্য ক্ষমতা নিয়ে অপর্ণা শুধু তাকিয়ে রইল।
সুদক্ষিণা অপ্রতিভ হয়েছে।
বৌদির সামনে কথাটা বলতে আসা শোভন হয়নি বুঝতে পেরেছে, কিন্তু হাতের ঢিল মুখের কথা! এখন কথা অসমাপ্ত রেখে চলে যাওয়া আরও লজ্জা!
তাই আস্তে আস্তে বলে সুদক্ষিণা, বেচারীর বাপ মারা গেল সেদিন।
এইটুকু তবু হাতে ছিল।
এইতেই মুখরক্ষা!
সুলক্ষণা বৌয়ের মুখের দিকে অলক্ষ্যে একবার তাকিয়ে নিয়ে নির্লিপ্ত স্বরে বলেন, চালিয়ে নিতে বংশী না পারে তা নয়, তবে চৈতালীই ছাড়তে চায় না। যার হাতে জিনিস, সে যদি না ছাড়ে, আর একজন ধরবে কি করে?
অপর্ণা হঠাৎ শাশুড়ীর হাত থেকে চুলটা ছাড়িয়ে নেয়। দাঁড়িয়ে উঠে বলে, আমি রান্না করব এবেলা!
একথা শুনে হেসে উঠল সুদক্ষিণা।
নিশ্চিন্ত ব্যাধ!
জানে না বাণটা কোথায় গিয়ে বিঁধল।
জানে না তাই হেসে ওঠে। লহরে লহরে হাসে।
যাক বাবা সমস্যাটা মিটল। বংশীকেই বা দরকার কি? তাহলে তো আজ
এইমাত্র যে অপর্ণার মুখের চেহারা বদলে গিয়েছিল, সে কথা ভুলে যায় সুদক্ষিণা, তাই হেসেই ওঠে সে।
হেসে হেসেই কথা শেষ করে, ভালমন্দ কিছু দেখছি আজ খাওয়া যাবে।
সুদক্ষিণা এত নির্বোধ হল কেন?
প্রতিক্রিয়ার কথা ভেবে শঙ্কিত হন সুলক্ষণা।
ঈষৎ কঠিন স্বরে বলেন, পাগলামি করিসনে ক্ষেণু! নিজেরা যাচ্ছিস যা।
ক্ষেণু এই হঠাৎ সুর বদলে চকিত হয়। বোধকরি সচেতন হয়। বৌদির বদলে যাওয়া মুখটার দিকে তাকিয়ে আস্তে সরে যায়। ভাবে, দূর ছাই! আমাদের আবার হাসিঠাট্টা! যা একখানি বৌ হয়েছেন বাড়িতে!
করুণার বদলে রাগ আসে সুদক্ষিণার, সেই ফ্যাকাশে-মুখ মানুষটার ওপর। ভাবে, যাই। ছোড়দাকে জানাইগে মাতৃ-আজ্ঞা। ছোড়দা হয়তো বলবে, থাকগে গিয়ে কাজ নেই।
তা বলতে পারে।
হঠাৎ এই বিরক্তির মধ্যেও সুদক্ষিণার মুখে একটা আলগা হাসি ফুটে ওঠে।
ছোড়দাটা যা পাগলা। হয়তো
.
আর একখানা মুখেও তখন ফুটে উঠেছে এইরকম একটু আলগা হাসি।
সে মুখ এ বাড়ির রাঁধুনীর।
দ্রুতহাতে কুটনো কুটে নিচ্ছিল সে, এখন হাতটা নিশ্চল। তাকিয়ে আছে সামনের দিকে।
সামনেই একটা বেতের মোড়া পড়েছিল, সেটাকে টেনে নিয়ে জুত করে বসেছে কৌশিক। বলছে, তা নিজেকে এত দরকারী করে তোলার প্রয়োজনই বা কি? না হয় লোকে ভাবলই, মেয়েটা কোন কর্মের নয়। হলটা কি তাতে? আমাকে তো সবাই কোন কর্মের নয় বলে খরচের। খাতায় লিখে রেখেছে, কই আমি তো কোন অপরাধ বোধ করি না। অস্বস্তিও পাই না।
চৈতালীর মুখে ওই হাসিটা ফুটে উঠেছে।
এত অদ্ভুত কথা বলেন আপনি!
কথাটা অদ্ভুত কিছুই নয়। তুমিই অদ্ভুত। আজ পর্যন্ত তো দেখিনি, কোন মেয়ে সিনেমা দেখতে আপত্তি করে।
চৈতালী কি ভুলে যায়, ও কে?
