তাই পাগলের মতই একটা কথা বলে বসে।
তা আমিও তো তোমাদের সংসারের কোন কাজে লাগি না। নিজেই তো বল, সংসারের একটা কুটোও ভাঙতে পারে না। কিন্তু কই স্বস্তির কিছু অভাব তো নেই আমার? সর্বদা তো মনে পড়ে না, আমি সুলক্ষণা দেবীর দয়ার ওপর পড়ে আছি।
এবার না হেসে পারেন না সুলক্ষণা। হেসে ফেলেন। হাসতে হাসতে বলেন, তোর যেমন কথা! তুই আর ও?
আহা একেবারে এক রকম না হলেও, কৌশিক মার মুখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, তুমি তো ওর ভার নিয়েছ? ওর মা হতে স্বীকার পেয়েছ?
সুলক্ষণা আরও হেসে ওঠেন, মা নয়, মাসী।
সে তো তোমার হিংসুটে ছেলেমেয়ে দুটোর ভয়ে।
ও বলেছে বুঝি তোকে? খুব গপপো করেছিস ওর সঙ্গে, কেমন?
কৌশিক বলে, করেছি বৈকি। একটা মানুষ, যোবা নয়, কালা নয়, তার সঙ্গে সাক্ষণ এক বাড়িতে থাকছি, কথা কইব না?
তা তোর দিক থেকে তো তুই খুব উদারতা মানবিকতা হৃদ্যতা আরও এ ও তা দেখাচ্ছিস, কিন্তু ক্ষেণু? ক্ষেণু তো ওকে দেখতেই পারে না। ওকে না খাঁটিয়ে শুধু যদি আদর করে মানুষ করে তুলতে থাকি, ক্ষেণু রেগে আগুন হবে না?
কৌশিক একটু চুপ করে থেকে গম্ভীরভাবে বলে, তাহলে বুঝতেই হবে মেয়ে মানুষ করবার ক্যাপাসিটি তোমার নেই। নিজের মেয়েটাকে মেয়েমানুষ করেই রেখে দিয়েছ। হিংসুটি খলকুটি গাঁইয়া মেয়ে।
তারপর হেসে উঠে বলে, আসলে এ বার্তা ক্ষেরই প্রেরিত। আমি দূত মাত্র।
ক্ষেণুর!
হ্যাঁ। ওই আমাকে সাধলো, ছোড়দা মাকে ভেজাগে যা। আহা মেয়েটা একটু সুযোগ পেলেই মানুষ হতে পারে, ওকে ওই বংশীদার অ্যাসিস্টেন্ট করে রাখা কি ঠিক?
মেয়ের এই আনুকূল্যে সুলক্ষণা অবাক হলেন। সুলক্ষণা হয়তো খুশীও হলেন। নিজের মনের মধ্যে যে বাসনার উদ্ভব হয়েছিল, যে বোধ দেখা দিয়েছিল, তার জন্যে আর লড়াই করতে হবে না ভেবে শান্তি পেলেন, তবু মনের মধ্যে সেই কাঁটাটি খচখচ করতে লাগল।
আমারটি ওরা নিয়ে নিল!
যেটি একান্ত নিজস্ব ছিল, সেটি সকলের হয়ে গেল!
বললেন, আর তোদের দাদা বৌদি?
কৌশিক তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, ওনারা তো মহৎ ব্যক্তি! ওঁদের জন্যে ভাবনা কি?
কথাটা সত্যি। ওরা হিংসুটে নয়।
অতএব নির্ভাবনায় চৈতালী নামক ভাগ্যহত প্রাণীটিকে ভাগ্যের দরজার কাছে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া চলে। ওর সমস্ত ঘাটতি কেবলমাত্র দয়ার বাটখারা চাপিয়ে চাপিয়ে সমান করে নেওয়া চলে।
ভাবা চলে, ওকে কোন স্কুলে ভরতি করে দেওয়া হবে, না বাড়িতে মাস্টার রেখে পড়ানো হবে! নাকি এরাই ভাইবোনে একটা বেওয়ারিশ ছাত্রীর ওপর হাত পাকাবে?
.
কিন্তু ও পক্ষও তো নিরেট দেওয়াল নয়!
ও পক্ষেও বুদ্ধির ঘরে জানলা দরজা আছে।
সে বেঁকে বসল।
যেদিন গঙ্গার ঘাটে নিয়ে গিয়ে চৈতালীকে শুদ্ধ করিয়ে নিয়ে এলেন সুলক্ষণা, সেদিন সুলক্ষণাকে সে প্রশ্ন করল, এবার সব কাজ করতে পাবো তো মাসীমা?
সুলক্ষণা বললেন, এত ব্যস্ত হচ্ছিস কেন? শরীর মন ভাল নেই, থাক না
শরীর তো খুবই ভাল আছে মাসীমা! আপনার যত্নে তো এই কদিনে ডবল মোটা হয়ে গেলাম।
হ্যাঁ গেলি! তা যাক মনটা একটু সুস্থির থোক না।
কাজ না করলে মন আরও অস্থির হয়ে ওঠে মাসীমা।
তা বইটই তো পড়ছিস।
সে কী সারাক্ষণ?
সুলক্ষণা হেসে উঠে বলেন, তা সারাক্ষণই চালা। ক্ষেণু কুশী তো আমার ওপর কড়া নিষেধ জারি করে দিয়েছে, যাতে তোকে ওই সব হাবিজাবি কাজে না ভরতি করি আবার। করলে ওরা আমায় ফাঁসি দেবে!
চৈতালী এ পরিহাসে হাসে না।
শঙ্কিত চোখে বলে, কেন মাসীমা?
কেন আর? লেখাপড়া শিখে মানুষ হবি। বংশীর শাগরেদী করবি না–
চৈতালী মুখ তুলে বলে, কাজ না করতে পেলে আমি টিকতে পারব না মাসীমা! আর–আর যদি মানুষ হওয়ার কথা বলেন? আমার মধ্যে যদি কিছুও মনুষ্যত্ব থাকে, আপনাদের হাওয়াতেই মানুষ হয়ে যাব। লেখাপড়া কি আর কাজকর্ম করলে হয় না?
তা সেই কথা বোঝাস তোর দাদা-দিদিকে।
বলে চলে যান সুলক্ষণা।
দিদিই বলেন ক্ষেণুর সম্পর্কে।
বয়সে ছোট হলেও।
ওটুকু শ্রেণী বিচার রয়েছে এখনও তার মনের মধ্যে।
.
অপর্ণা কদিন একটু ভাল আছে।
উঠে হেঁটে বেড়াচ্ছে।
অতএব এখন এদের উৎসবের দিন।
এখন সুদক্ষিণা বলতে পারে, অনেকদিন সিনেমা দেখা হয়নি মা!
কৌশিক বলতে পারে, মা ভাবছি সামনের ছুটিতে দুদিন কোথাও ঘুরে আসি।
কৌস্তুভ বলতে পারে, রেডিওটা বন্ধ পড়ে থেকে থেকে ইয়ে হয়ে গেল, খুলব অপর্ণা? গান শুনবে?
আর স্বয়ং অপর্ণার বলতে ইচ্ছে হয়, আমায় কিছু করতে দিন না মা! বেশ তো ভাল আছি।
সুলক্ষণাকে সস্নেহ ভর্ৎসনায় নিবৃত্ত করতে হয় অপর্ণার সেই সহজ হয়ে যাবার ইচ্ছেটাকে।
তবু বাড়িতে আনন্দের হাওয়া বয়।
.
আপাতত সেই হাওয়া বইছিল বাড়িতে।
সুদক্ষিণা বলল, চল্ ছোড়দা, সিনেমা দেখে আসি।
কেন? কৌশিক স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে বলে, আর একটু ফ্যাশান শিখতে? কি করে আঁচলটা আরও কায়দা করে বাতাসে ওড়ানো যায়, কি করে মুখে আরও বেশী করে চুনকালি মাখা যায়–
থাম্ থাম্। যথেষ্ট সেকেলেপনা হয়েছে। রাস্থ কথা। টিকিট কেটে আনগে যা।
কৌশিক ইতস্তত করে বলে, কটা টিকিট?
কটা? কটা আবার? আর কে যাবে?
মানে বলছি, সে তো জানি–মা যান না, বৌদির কথা বাদ, কিন্তু ধর চৈতালীকে তো অফার করতে পারিস তুই।
চৈতালীকে? হুঁ! সে তার অন্নপূর্ণার আসন ত্যাগ করলে তো! সেই রান্নাঘরে পড়ে আছে। দেখলি তো সেদিন? কম বোঝানো বোঝালাম? সেই এককথা, কাজ না করলে বাঁচব না। যারা কাজ না করতে পেলে মারা যায়, এই সুখের পৃথিবীর আমোদ আহ্লাদ তাদের জন্যে নয়, বুঝলি? তারা ওই ঘানিই ঘোরাবে। আমি ওকে মানুষ করে তোলবার আশা ছেড়ে দিয়েছি।
