চৈতালী জোর দিয়ে বলে ফেলেছিল, উনি ভুল বলেছেন, উনি আমার বাবা।
ভদ্রমহিলা রেগে গেলেন।
রেগে আগুন হয়ে বললেন, এমন কথা তো বাপের জন্মে শুনিনি। ভুল করে মেয়েকে বলবে ভাগী!
কথাটা শচীনের কানে গেল।
গেল তো গেল, শচীন যখন একটু রঙে রয়েছে। শুনতে পেয়ে বলে উঠল, বেশ করব বলব, আলবৎ বলব। আমার মেয়েকে আমি যা খুশী বলব, উনি জবাবদিহি চাইবার কে?
কে তা দেখিয়ে দিলেন ভদ্রমহিলা।
আশ্ৰয়টা গেল। অমন ভাল আশ্রয়।
ভালমন্দ কত আশ্রয়ই গেল তারপর। এখন শচীন মজুমদার সেরা আশ্রয় পেয়ে গেছে, এরপরে আর বাসা খুঁজে বেড়াতে হবে না তাকে।
আর শচীন মজুমদারের মেয়ে?
তার কপালে তো স্বর্গবাস লেখা ছিল। সেই স্বর্গে এসে পৌঁছেছে সে। কিন্তু কদিনের জন্যে?
কে জানে?
অপর্ণার চোখ যেন তীব্র শাসন করে বোঝাতে চেষ্টা করে,–এ তোমার অনধিকার প্রবেশ।
সুলক্ষণা সুদক্ষিণার মত উচ্চমনা যদি হত অপর্ণা! তা নয় সে।
শুধু দেহটাই তার অসুস্থ নয়, মনটাও অসুস্থ।
সুদক্ষিণা গল্প করেছে
বিয়ের সময় কি সুন্দর চেহারা ছিল বৌদির! কী হাসিখুসি মুখ! কোথা থেকে যে এক বিশ্রী রোগ এল–
চৈতালী ভেবে পায়নি দেহে রোগ এল বলে মনেও রোগ আসবে কেন।
ভেবে পায়নি বলেই সুদক্ষিণার হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে থেকেছে।
সুদক্ষিণা বলেছে, বৌদির কথায় কখনো কিছু মনে করো না ভাই। উনি একটু ওই রকমের। ছোড়দা বলে–
সব কথায় ছোড়দার কথা আনে সুদক্ষিণা। কারণ ছোড়দার সঙ্গেই যত গল্প সুদক্ষিণার।
সেদিন চৈতালীকে একটা বই হাতে দিয়ে বসিয়ে ছুটে যায় তিনতলার ঘরে। হাঁপিয়ে বসে পড়ে বলে, দেখ ছোড়দা, আমাদের মোটেই উচিত নয় ওকে বংশীর অ্যাসিস্টেন্ট করে রেখে দেওয়া! আসলে ও সত্যিই ভদ্র ঘরের মেয়ে, শুধু বাবার দোষে
কিন্তু বাপের ওপর কি ভালবাসা! বাবাঃ!
খুবই স্বাভাবিক। আর যখন কেউ নেই।
সুদক্ষিণা একটু চুপ করে থেকে বলে, কিন্তু দেখ ছোড়দা, একটা কথা আমি ভাবছি
ওরে বাবা তুই আবার ভাবছিস? শুনি কি ভাবনা?
কথাটা গুছিয়ে গাছিয়ে বলে সুদক্ষিণা।
বলে, ওই অশৌচ না কি, ওটা মিটে গেলেই তো মা আবার চৈতালীকে রান্নাঘরে ভরতি করে দেবেন, যার জন্যে সেই অদ্ভুত অবস্থায় ওকে ঘরে তুলে নিয়েছেন মা পথ থেকে।
কিন্তু সেটা কি ন্যায়ধর্ম এবং মানবিকতা হবে? চৈতালী যখন একটা সত্যিকার আস্ত ভদ্রমেয়েওর মধ্যে বস্তু রয়েছে, সে বস্তুকে মূল্য দিয়ে ওকে উঁচু কোঠায় তুলে নেওয়া যায়। ওকে একটা সত্যিকার মানুষে পরিণত করা যায়।
যেটা করা যায়, সেটা না করা কি অমানবিকতা নয়? নিজেদের সুবিধের জন্যে রাঁধুনী করে রেখে দেওয়া হবে ওকে!
.
তা এ কথাটা যে একা সুদক্ষিণাই ভেবেছে তা তো নয়।
কৌশিকও ভেবেছে বৈকি।
সেদিন অতগুলো ঘণ্টা চৈতালীর সঙ্গে নানা বিপাকের মধ্যে ঘুরে বেড়িয়ে এবং সদ্য পিতৃশোকাতুর মেয়েটার সঙ্গে একত্রে অতটা রাস্তা এক গাড়িতে আসায়, অনেকটা পরিচয় ঘটেছে। তারপর আরোই ঘটছে।
সে পরিচয় অনেকটা ভাবিয়ে তুলেছে কৌশিককে, অনেক প্রশ্ন এসেছে মনের মধ্যে। আর বার বার মনে হয়েছে, এখন তো দুচার দিন, তারপর?
তারপর তো সেই বংশীর শাগরেদী!
সেটা কি ঠিক হবে?
কিন্তু বলবে কে?
তুই বল, বলল সুদক্ষিণা।
কৌশিক বলে, আমায় আবার কেন জড়াচ্ছ বাবা এর মধ্যে? তোমার বান্ধবী হয়েছে, তুমি বলগে না তোমার মাকে।
সুদক্ষিণা হঠাৎ একটু চোরা হাসি হেসে বলে ওঠে, কে বলতে পারে, ভবিষ্যতে তোরই বান্ধবী হয়ে উঠবে কিনা।
কৌশিক হেসে উঠে বলে, তা তো নিশ্চয়, ভবিষ্যতের কথা কে বলতে পারে? কিন্তু আপাতত যখন হয়ে ওঠেনি, তখন আর–আমি কেন বাবা?
জীবে দয়া হিসেবে।
তুই পারবি না?
পারব না কেন? তবে তুই বললেই বেশী কাজ হবে।
বেশ।
এও ওদের এক হিসেবের ভুল।
মেয়ের কাছ থেকে না শুনে ছেলের কাছ থেকে শুনে বেশী প্রভাবিত হবেন সুলক্ষণা, এমন মনে করবার হেতু নেই।
সুলক্ষণা ওঁর ওই ক্ষ্যাপা ছেলেটার দিকেও গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকালেন।
তারপর বললেন, রান্নাবান্না করতে দেব না? তাহলে এই অখণ্ড সময়টা নিয়ে কি করবে ও?
লেখাপড়া করবে। কৌশিক নিশ্চিন্ত দৃঢ়তায় বলে, লেখাপড়ার থেকে ভাল জিনিস আর কী আছে?
কিন্তু তাতে আমার কী লাভ হল?
তোমার লাভ? তোমার কী লাভ হল তাই ভাবছ? সে কী গো মা! এই রকম তুচ্ছ একটা লাভ-লোকসানের কথা তুমি ভাবতে পারলে? তুমি?
সুলক্ষণা মনে মনে একটু নরম হলেন।
দেখলেন এটা সেই তার চিরকালের ছেলেটা। এর ওপর অন্য সন্দেহ করা অবিচার। তবু হাসলেন না।
বললেন, তা কোনদিন কি বলেছি, আমি কোনমতে স্বর্গ হতে টসকে, পড়েছি এ মর্ত্যভূমে বিধাতার হাত ফসকে। সংসারী মানুষ, সংসারের লাভ-লোকসান দেখব না?
না, দেখবে না।
আর ওকে যখন রাখলাম, তখন যে বড্ড ঠাট্টা করেছিলি?
কৌশিক হেসে উঠে বলে, সেই কথা দেখছি মনে করে রেখেছ? ঠাট্টায় বিচলিত হবার লোক তো তুমি নও বাপু! হল কি তোমার? লিভারের কাজ ভাল হচ্ছে না বুঝি?
যা পালা, ইয়ার ছেলে!
সুলক্ষণা একটু তাড়া দিলেন, তারপর বললেন, কিন্তু মনস্তত্ত্বের অনেক তত্ত্ব আছে, বুঝলি? কাজ একটা না দিলে ওরই বা ভাল লাগবে কেন? নিজেকে দরকারী মনে হবে কেন? সব সময় যদি মনে পড়ে, আমি এদের দয়ার ওপর আছি, তাহলে স্বস্তি পাবে কেন?
তা কৌশিক তো পাগলই।
