মেসোমশাই শুনতে পেলে হৈ চৈ করে উঠতেন, হয়েছে, মাথা-খাওয়া শুরু হয়েছে। দেখ ভগবান জিনিসটা একটু দুষ্পচ্য, ওটা এ বয়সে হজম হয় না। ওটা আর ওকে এক্ষুনি গুলে খাওয়াতে বোসো না। মেলোমশায়ের কথাগুলো কী সুন্দরই ছিল! এমন কি মাসীর বাড়িতে যারা বেড়াতে আসত, তারাও যেন সব সুন্দর চমৎকার চকচকে ঝকঝকে।
আর তার এই বাবার বাড়িতে?
ভাবলেই চোখে জল আসত চৈতালীর।
আজ আবার সেই বাড়ির জন্যেই চোখে জল আসছে।
বাবা মরে গেল তার।
আর কোনদিন ভাল হবার দিন পেল না বাবা, দিন পেল না সৎ কারবার ফঁদবার।
.
অবশ্য সেই সৎ আর ভাল সম্বন্ধে তখন মোহ খুব একটা আর ছিল না চৈতালীর। চুরি জোচ্চুরি লোক ঠকানো, এগুলোকে সে প্রায় বাহাদুরীর পর্যায়ে ফেলত, এবং জগতে যে ভাল লোক বলতে কেউই নেই, সবাই চোর, এ ধারণা ক্রমশই বদ্ধমূল হয়ে উঠেছিল তার।
বাবার মন্ত্রে দীক্ষা হচ্ছিল চৈতালীর, তবে বাবার রুচিতে তার রুচির মিল ছিল না। বরেনকে বাবা জামাই করবার বাসনায় আছে মনে করলেই বাবার ওপর রাগে ব্রহ্মাণ্ড জ্বলে যেত, এবং বরেনকে বঁটা মারতে ইচ্ছে করত।
তবু কৌশিকের মত আলোয় গড়া মানুষও যে পৃথিবীতে আছে, তা তো তখন স্বপ্নেও জানত না চৈতালী।
জানত না সুলক্ষণার মত এমন মা থাকে জগতে।
সুদক্ষিণাকে ভয় করেছিল প্রথমটা।
সে ভয় ভেঙে যাচ্ছে।
ভয় ভাঙছে, কিন্তু স্বাচ্ছন্দ্য আসছে কি? দৈবাৎ অসতর্কে ভুলে গিয়ে হয়তো একটু সহজভাবে কথা কয়ে উঠল, পরক্ষণেই কুঁকড়ে যায় মন, মনে হয় আমি ওদের সঙ্গে সমান হয়ে কথা বলছি?
ওরা কী, আর আমি কী!
আমি কি ওদের কাছে বসবারও যোগ্য?
সুলক্ষণা মহীয়সী, সুলক্ষণা করুণাময়ী, তাই চৈতালী এই স্বর্গে প্রবেশের অধিকার পেয়েছে।
না হলে কি হত!
ভাবতে গিয়ে শিউরে ওঠে চৈতালী।
শচীন মজুমদার নামক লোকটা অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তির ছাপ মেরে হাসপাতালের লাশ কাটা ঘরে চালান হওয়ায় পর চৈতালী মজুমদার নামক মেয়েটাকে কি সেই বাঘ ভাল্লুকের দল আস্ত রাখত?
কিন্তু
আর একটা কথা স্মরণ করলেই সমস্ত মনটা তার কুঁকড়ে ছোট হয়ে আসে।
কথা নয়, দৃশ্য।
প্রথম দিনকার সেই দৃশ্য।
একটা গেলাস চুরি করতে এসে ধরা পড়েছে চৈতালী!
চাকর বংশী তাকে জাপটে ধরে রেখেছে। ছি ছি ছি!
ভাবলে তখুনি মরে যেতে ইচ্ছা হয়। এরা আশ্চর্য মহানুভব, তাই সে দৃশ্যের কথা ভুলে গেছে। কিন্তু চৈতালী? সে কেমন করে ভুলবে?
তা ছাড়া
অপর্ণা!
অপর্ণা কি ভুলতে দেবে?
অপর্ণার চোখে তো আজও সেই প্রথম দর্শনের দৃষ্টি।
সেই ঘৃণা বিস্ময় আতঙ্ক!
দীর্ঘ পল্লবাচ্ছাদিত বিস্ফারিত দুই চোখে তেমনি করেই চেয়ে থাকে অপর্ণা চৈতালীর দিকে।
কথা বলে না।
না, দু একদিন কথা বলেছিল। বলেছিল, আমার বাপের বাড়িতে নতুন কোনও ঝি চাকরকে ঢোকাবার সময় প্রথমেই তার ঠিকানা জেনে নেওয়া হয়।
তারপর তার আগের জীবনের ইতিহাস জেনে নেওয়া হয়। মা বলেন, কে জানে বাবা চোর হবে কি ডাকাত হবে, খুনে হলেও হতে পারে। রান্নায় যদি বিষই মিশিয়ে দেয়। যাকে জানি না, শুনি না, তাকে বিশ্বাস কি?
চৈতালীর মুখ লাল হয়ে উঠেছিল।
চৈতালী তবু মৃদু স্বরেই বলেছিল, তা তো ঠিক। তবে বিশ্বাস যাকে নেই, সে যে তার নাম পরিচয় অতীত ইতিহাস সব ঠিক বলবে, তাতেই বা বিশ্বাস কি?
অপর্ণা নিঃশ্বাস ফেলে বলেছিল, সেই তো! আমার বাবা বলতেন, আগুন সাপ আর চোর, এই তিন নিয়ে ঘর করা যায় না। হয় ঘর যাবে, নয় প্রাণ যাবে।
নিজের জবানে সব কথা গুছিয়ে বলতে পারে না অপর্ণা, বাপ-মায়ের জবানীতে বলে।
অপর্ণার কাছ থেকে সরে সরে বেড়ায় চৈতালী। দুধ দিতে, খাবার দিতে, একটি একটি করে গরম লুচি ভেজে ঘরে দিয়ে আসতে অপর্ণার কাছে আসতেই হয় বটে, সাধ্যপক্ষে কথা বলে না। বোবা পুতুলের মত যায় আসে, কাজ করে।
কি জানি যদি অপর্ণা তার মার নিয়মে চৈতালীর অতীত ইতিহাস জানতে চায়!
সে যে বড় ভয়ানক।
কিন্তু সুলক্ষণাকে তো সেদিন সব বলেছিল চৈতালী, সুলক্ষণা কি সে কথা কাউকে বলেননি?
চৈতালী ভেবেছে।
ভেবে ভেবে অনুমান করেছে, সুলক্ষণা সে সব কথা নিজের মধ্যেই আবদ্ধ রেখেছেন।
আশ্চর্য, আর কোনদিন একটিও কথা জিগ্যেস করলেন না সুলক্ষণা। যেন ভুলে গেছেন, চৈতালী এ বাড়ির লোক নয়। ভুলে গেছেন, চৈতালী এই সেদিনও এ বাড়িতে ছিল না।
যদি না ভুলতেন
যদি চৈতালীর জীবনের প্রতিটি দিনের ঘটনা জানতে চাইতেন?
চৈতালী কি তাহলে বলতে পারত পৈতৃক বাড়ি বিক্রী করে ফেলার পর হতভাগা শচীন মজুমদার একটা তরুণী অনূঢ়া মেয়ের হাত ধরে কত ঘাটের জল খেতে খেতে শেষ পর্যন্ত মাঠকোঠায় এসে পৌঁছেছিল! সে ইতিবৃত্ত কি বর্ণনা করার?
মেয়েকে শচীন কখনো পরিচয় দিয়েছে ভাইঝি বলে, কখনো ভাগ্নী বলে, কখনো বলেছে বন্ধুর মেয়ে। চৈতালী রেগে উঠে প্রশ্ন করলে বলেছে, আহা বুঝছিস না, আমার মত হতভাগার মেয়ে তুই, এটা লোককে বলতে চাই না!
অথচ এই বোকামীর জন্য একবার একটা ভাল আশ্রয় ছাড়তে হয়েছিল তাদের।
বাড়িওলি-গিন্নী চৈতালীকে সুনজরে দেখেছিলেন, তার কী একটা অসুখের সময় চৈতালী সেবা করেছে, তার সংসারের রান্না করে দিয়েছে। ওর পরিপাটি কাজ দেখে মুগ্ধ হয়েছেন তিনি, কিন্তু একদিন বাধল বিপত্তি।
হঠাৎ গিন্নী একদিন ডেকে প্রশ্ন করলেন, হ্যাগা বাছা, শচীনবাবু তো বলে তুমি নাকি তার ভাগ্নী, তবে তুমি বাবা বাবা কর কেন ওকে?
