বাবা ভিন্ন আপনার লোক তার রইল কোথায়?
মেসো মারা যেতেই নাকি দেখা গিয়েছিল অগাধ দেনা তার। নিঃসন্তান মাসী যথাসর্বস্ব বেচে দিয়ে কাশী-বাসিনী হবার উপক্রম করছেন, সেই সময় বাবা গিয়ে পড়ল মেয়ে মেয়ে করে। মাসী চোখের জল মুছতে মুছতে ছেড়ে দিলেন। বাবা মেয়ে মেয়ে করেছিল অবশ্য নিতাইয়ের প্ররোচনায়। নিতাই বলেছিল একটা কমবয়সী মেয়ে দলে থাকলে ব্যবসার পক্ষে খুব জুতের। তাকে দিয়ে মাল পাচার করা যায়, কেউ সন্দেহ করতে পারে না। স্কুলের বই খাতা ব্যাগের মধ্যে দিয়ে
তা করেছিল সে কাজ চৈতালী অনেকবার, কিন্তু ওই বদ লোকগুলোর হাতে তাকে ছেড়ে দেয়নি বাবা। নিতাইয়ের পরামর্শে নিয়ে এলেও তার পিতৃচেতনা মেয়েকে অনিষ্ট থেকে রক্ষা করেছে। মেয়েটাকে বড্ড বেশী ভালও বেসে ফেলেছিল। তবে প্রথম প্রথম চৈতালীকে বাগে আনতে খুব বেগ পেতে হয়েছে বৈকি শচীন মজুমদারকে। মাসীর বাড়ির তুলনায় বাবার বাড়িটাকে নরক মনে হত চৈতালীর। প্রতি মুহূর্তে সেই মনে হওয়াটা ধরা পড়ে যেত। বাবা সেটা বুঝত না তা নয়।
বুঝত আর রেগে রেগে বলত, মাসী মেসো উপকারের মধ্যে এইটি দেখছি করেছেন, মেয়েকে আমার রাজনন্দিনী বানিয়ে রেখে গেছেন।
তা চৈতালী কথায় কম যেত না। চৈতালীও বলে উঠতো, বড় অন্যায় করেছে। মা-মরা মেয়েটাকে নিয়ে গিয়ে হাড়ির হাল করে মানুষ করলেই খুব ভাল হত, কেমন?
তা যেমন অবস্থা তেমন ব্যবস্থাই ভাল। রাজার হাল করে আপনি তো কাটিয়ে গেলেন কর্তা, শেষরক্ষা হল? পরিবারের গলায় দেনার পাহাড়টি ঝুলিয়ে তো মরলেন।
সত্যিই তাই করে গেছেন ভদ্রলোক। অথচ খোদমেজাজি বেপরোয়া, সৌখিন আর দরাজ বুক সেই মানুষটাকে দেনা করে বাবুয়ানা করে গেছেন বলে নিন্দে করতেও বাধে।
চৈতালীর চুপ করে থাকার সুযোগে বাবা বলত, আমিও একদিন ভদ্রলোক ছিলাম রে চৈতি, তোর ওই ফ্যাসানি মেশোর সঙ্গে এক শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে যখন একসঙ্গে বসে নেমতন্ন খেয়েছি, ওর থেকে আমাকে ভাল দেখাত, বুঝলি? এখন তুই দেখছিস বাবার হাড়ের ওপর চামড়া নেই। গরীব ছিলাম বটে, কিন্তু এমন ছোটলোক ছিলাম না, সেটা শুনে রাখ।
বাবার চেহারা যে একদা ভালই ছিল সেটা চৈতালীও দেখেছে বৈকি, মানুষটাকে দিয়ে নয়, ছবির মধ্যে। মাসীর ঘরের দেয়ালে একটা বর-কনের ছবি দেখেছে বরাবর। ছোটমাসী মেয়েটাকে চিনিয়ে দিয়েছিল, তোর মা তোর বাবা।
সেই বরবেশী বাবাকে কি ভালই লাগত চৈতালীর!
কিন্তু বাবা যখন তাকে নিতে গেল? বাবার চেহারা দেখে সে আড়ষ্ট হয়ে গেল। রোগা পাকসিটে, অর্ধেক চুল পাকা, পেশীর রেখায় শ্রীহীন মুখ, আর পোড়া পোড়া তামাটে রঙ। সেই লোকটাকে দেখে তার স্রেফ একটা ঘোটলোকই মনে হয়েছিল।
তা বাবার কথার উত্তরে ঝঙ্কার দিয়ে উঠত চৈতালী, শুনে তো রাখছি, বলি ছোটলোক হতে কে মাথার দিব্যি দিয়েছিল?
কে?
শচীন যেন আকাশে বার্তা পাঠাচ্ছে এইভাবে ক্রুদ্ধ গর্জন করে উঠত, কে? এই তোমারই গর্ভধারিণী!
মা? আমার মা?
আলবাৎ! কেন, মরতে কে বলেছিল তাকে সাতসকালে? বড় ডাক্তার ডাকবার ক্ষমতা যার না থাকে, তার পরিবার বাঁচবে না? মরে গিয়ে দগ্ধে রেখে যাবে?
তা মা কি রাগ করে আত্মহত্যা করেছিলেন বাবা?
না করুক। বলি মরল তো ভাল চিকিৎসার অভাবে। আমি যদি বড় বড় ডাক্তার ডাকতে পারতাম, দামী দামী ওষুধ খাওয়াতে পারতাম, সাধ্যি ছিল ওর দুম করে মরে যাবার? যাক, আমিও সেই চিতে ছুঁয়ে দিব্যি করলাম, শালার বড়লোক হতেই হবে, যেত তেন প্রকারেণ।
আবার এক এক সময় ভারী মনমরা হয়ে যেত বেচারা শচীন মজুমদার। হয়তো এমনি, হয়তো বা ভাগ-বখরা নিয়ে দলের লোকদের সঙ্গে ঝগড়া হয়ে গেলে। তখন মেয়েকে কাছে ডেকে বলত, দেখ চৈতি, এ শালার ব্যবসা-বাণিজ্য আর নয়। তোর একটা বিয়ে দিয়ে জামাই ব্যাটার সঙ্গে মিলে একটা সৎ কারবার ফাঁদব।
চৈতালী বলত, কিন্তু সৎ হবার ক্ষমতা তোমার আর আছে বাবা?
শচীন মজুমদার বলত, মাঝে মাঝে সে ভয়ও করে চৈতি, আবার ভাবি ওই হারামজাদা পাজীগুলোর সঙ্গ ত্যাগ করতে পারলে
হ্যাঁ পারলে, তবে পারবে না।
বলে মুখ ঝামটে চলে যেত চৈতালী।
আর ভাবত মা যদি না অকালে মরত তার, তাহলে মাসীর বাড়ির মত সংসার তাদেরও হত। তার মা, মাসীর মত রোজ বিকেলে স্টোভ জ্বেলে খাবার করতে বসত, আর চৈতালীকে ডেকে ডেকে বলত, আয় কাজ শেখ। সিঙ্গাড়াগুলো গড়ে দে। হয়তো হেসে হেসে বলত কচুরি বেলতে না শিখলে বিয়ে হয় না, বুঝলি?
সেই এগারো বছর বয়সেই তো কত কাজ শিখে ফেলেছিল চৈতালী। ঘর সাজানো, টেবিল গোছানো, আলনায় কাপড়-চোপড় ঠিকমত করে ঝোলানো, সব শেখাতেন মাসী।
ফুলগাছের টব ছিল ছাদে, বেল মল্লিকা গোলাপের, মাসীর সঙ্গে জল দিতে উঠত, আর মাসীকে বলতো, আচ্ছা মা, ছাতে কেন শিউলি গাছ পোঁতো না?—
হ্যাঁ মাসীকেই মা বলে ডাকত চৈতালী।
মাসী বলত, মা ডাক শিখিয়েছি, কিন্তু মা তোর ছিল রে, আমাদের সকলের ছোট্ট বোনটা। তাকে মুছে ফেলতে চাই না। তোর ওই ছবির মাকে তুই প্রণাম করবি, ভালবাসবি, ভক্তি করবি, বুঝলি?
চৈতালী বলত, ধ্যেৎ! নেই, দেখতে পাই না, তাকে আবার ভক্তি ভালবাসা। না দেখলে বুঝি ভালবাসা যায়?
মাসী বলত, যায়! যাবে না কেন! ভগবানকেও তো আমরা দেখতে পাই না, তাবলে
