কী সেই দুর্বিপাক?
প্রলোভনে ভুলে কুলত্যাগ?
গুণ্ডার অত্যাচার?
দাঙ্গা-হাঙ্গামার সময় গৃহচ্যুত হয়ে ছিটকে পড়ে
কিন্তু তাই বা কেমন করে হবে? বাপ ছিল তো! বাপের কাছেই ছিল এযাবৎ। বাপের পদবী বলেছিল মজুমদার। অর্থাৎ জাত ভালই। কী তবে ওর ইতিহাস?
যে ইতিহাস এমন একটা মার্জিত বুদ্ধি সভ্য মেয়েকে ছিঁচকে চুরিতে নামায়!
কেমন করে উদ্ধার করা যায় সে-ইতিহাস।
ওর পক্ষে কি বলা সম্ভব?
আর ওকে জিগ্যেস করাই কি কৌশিকের পক্ষে সঙ্গত?
তবে যেটা জিগ্যেস করা সম্ভব, সেটা করে।
তোমার সেই মেসোমশাই বুঝি মারা গেছেন?
হ্যাঁ। আমার যখন এগারো বছর বয়েস।
ও! তোমায় বুঝি খুব ভালবাসতেন তিনি?
খুব! কত যে গল্প বলতেন! আর কত বিষয় যে শিক্ষা দিতেন সেই সব গল্পের মধ্যে দিয়ে।
বলেই পাংশুবর্ণ হয়ে ওঠে চৈতালী।
শিক্ষা!
শিক্ষা কথাটা মুখে আনছে সে!
যদি কৌশিক হেসে ওঠে?
যদি বলে ওঠে, তা বটে। খুব ভাল শিক্ষাই তিনি দিয়েছিলেন।
কিন্তু এরা তা করবে না।
এরা ইতর নয়।
তাই সুদক্ষিণা বলে ওঠে, যাই বল মেসোমশাই পিসেমশাই থাকা খুব ভালো। বেশ আদর হয়, তাই না?
আর কৌশিক বলে, উনিই বোধ হয় পড়াতেন?
চৈতালী মাথা নীচু করে বলে, যতদিন ওঁর কাছে থেকেছি। অবিশ্যি স্কুলের পড়া পড়াতে বিশেষ ইয়ে করতেন না, গল্প কবিতা এই সবের মধ্যে দিয়ে
গল্প কবিতা!
ও বাবা! আবার স্কুলেও পড়েছে!
কর্পোরেশান স্কুলেই খুব সম্ভব। সুদক্ষিণা সেটা জেনে নেবার কৌতূহল সংবরণ করতে পারে না, বলে, কোন্ স্কুলে পড়তে?
ভিক্টোরিয়া। ওটাই তবু বাড়ির কাছে ছিল—
ভিক্টোরিয়া! সেরেছে। তাহলে তো5, সুদক্ষিণা যেন বিচলিত হয়ে ওঠে।
কোন্ ক্লাস পর্যন্ত এটা জিগ্যেস করবে কিনা ভাবতে ভাবতেই উত্তরটা পেয়ে যায়। চৈতালী নিজেই বলে। স্বগতোক্তির মতই বলে ওঠে, কদিনই বা পড়তে পেলাম। ক্লাস সিক্সে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই তো
আহা, সুদক্ষিণা আপন মনে বলে, আর পড়া হল না? কেউ পড়তে পেল না– ভাবতে এত খারাপ লাগে।
চৈতালী মৃদু স্বরে বলে, না, তারপরও পড়েছিলাম দুতিন বছর, বাবার কাছে আসার পর, সে একটা বাজে স্কুল
সেই বাজে স্কুলের সামান্য মাইনেও যে বাবা ঠিকমত দেয়নি বলে স্কুল থেকে নাম কাটিয়ে দিয়েছিল, সে কথা আর বলে না চৈতালী। তা ছাড়া নিজের সেই বদভ্যাস! স্কুলের অন্য মেয়েদের জিনিস বাড়িতে আনা। ছি ছি!
বাবার কাছে আসার পরের ইতিহাস তো সবই বাজে বিশ্রী। চোর হয়ে উঠেছিল চৈতালী তখন।
ভাবলে অবাক লাগে, কী মুখরা, কী রণচণ্ডী ছিল সে! নিজের সেই মূর্তিটাকে বুঝি এখন আর চৈতালী চিনতে পারছে না।
তার বাবার বন্ধুদের আড্ডার সেই রসদ যোগানদার মেয়েটা কি সত্যিই চৈতালী?
২. ছবিগুলো চোখের সামনে
ছবিগুলো চোখের সামনে ফুটে উঠছে, চলে যাচ্ছে, ছুটোছুটি করছে।…
সেখানে নিতাইকাকা আছে, বাবা আছে, বরেন আছে, আর আছে কতকগুলো জঘন্য নোংরা গুণ্ডা শ্রেণীর লোক। তাদের মধ্যে পাঞ্জাবী আছে, বেহারী আছে, মুসলমান আছে, বর্মী আছে, চীনে আছে, আরও কত রকম যেন জাতের লোক আছে, তারা তাড়ি খাচ্ছে, তাস খেলছে। মাতাল হয়ে গড়াগড়ি যাচ্ছে, আবার কী সব ষড়যন্ত্র করছে ওরই মধ্যে।
প্রথম প্রথম বুঝতে পারত না চৈতালী, পরে বড় হয়ে বুঝেছে, ওরা সব লুকিয়ে আফিং কোকেনের ব্যবসা করে। ওর মধ্যে আবার একজন একবার সোনা নিয়ে ব্যবসাও ধরেছিল। ধরা পড়ল, শেষে জেলে গেল।
তবে এই সব লোকের সামনে চৈতালীকে বার করত না কোনদিন বাবা। প্রাণ গেলেও না।
নিতাইকাকা বলত, আহা-হা তাতে কি? তোমার মেয়ে সবারই মেয়ের মত চা নিয়ে গেল, খাবার পরিবেশন করল–এতে দোষ কি?
বাবা বাঘের মত গজরে উঠে বলত, না!
পরিবেশন করত বরেন।
বরেন আসত বাড়ির মধ্যে।
মানে তখন, যখনও বাড়ী বলে বস্তুটা ছিল বাবার। শ্যামপুকুর বাই লেনের সেই নোনাধরা ইট বার করা বাড়িটাও রাখতে পারেনি বাবা, বেচে দিয়েছিল। তারপর থেকে নানাস্থানী।
কিন্তু তখন বাড়িটা ছিল।
এঁদোপড়া রান্নাঘরটায় প্রকাণ্ড একটা উনুন জ্বেলে বিরাট হাঁড়িতে মাংস আর ভাত রাঁধতে হত এক একদিন। বরেন ভেতরে এসে নিয়ে নিয়ে যেত।
বরেনের চেহারাটা মনে পড়তেই ঠোঁট কামড়ালে চৈতালী। ঠিক যেন রাস্তার একটা ঘেয়ো কুকুর। তেমনি মানঅপমানহীন, তেমনি লোভী।
কতই বা বয়েস তখন চৈতালীর?
পনেরো, ষোলো। তখন থেকেই কী বিরক্তই করত চৈতালীকে।
জোর নয়, দাবী নয়, উৎপাত অত্যাচার নয়, শুধু গা ঘিনঘিনে কাঙালপনা। একদিন চৈতালী একখানা লোহার খুন্তি উনুনের আগুনে লাল টকটকে করে তাতিয়ে বরেনের দিকে বাড়িয়ে ধরে বলেছিল, দেখ, আর কোনদিন যদি এই সব কথা বলতে আসো, জেনো তোমার কপালে এই আছে। কাউকে বলে দিয়ে শাস্তি করাতে যাব না আমি, নিজের হাতেই শাস্তির ব্যবস্থা করব।
সেদিন থেকে গুম হয়ে গিয়েছিল বরেন, আর বেশী কথা বলত না। নীরবে রান্নাঘরে আসত যেত।
.
কিন্তু বাবার মনের ইচ্ছে জানত চৈতালী। বাবা ওই লক্ষ্মীছাড়া বরেনটাকেই মনে মনে জামাইয়ের আসনে বসিয়ে রেখেছিল। ভেবেছিল একবার একটু বেশী পয়সা পিটে নিয়ে এসব কাজ ছেড়ে দেবে, শ্বশুর জামাই দুজনে মিলে একটা সত্যিকার সৎ কারবার ফঁদবে। বাকী জীবনটা নিশ্চিন্তে নিরুদ্বেগে কাটাবে।
হঠাৎ চোখ উপচে জল এল চৈতালীর।
বাবাকে সে শ্রদ্ধা করত না, ভক্তি করত না, কিন্তু ভালবাসত। ভাল না বেসে কি করবে?
