সুদক্ষিণার তো তবু মা আছেন।
মায়ের মত মা!
আর ও বেচারী জীবনে কখনো মাকে চোখেই দেখেনি।
তবে?
সহানুভূতি না এসে পারা যায়?
ভাল না বেসে পারা যায়?
এ সহানুভূতি, এ ভালবাসা চৈতালীর ওপরও কাজ করছে বৈকি। দূরীভূত করছে তার নিজেকে সরিয়ে রাখবার প্রচেষ্টাকে আর কাঠিণ্যকে।
সুলক্ষণার স্নেহ তাকে আশ্রয় দিয়েছে, মর্যাদা দিয়েছে, কিন্তু অনেকখানিটা জায়গা দিতে পারেনি, দিতে পারেনি নিজেকে নিশ্চিন্তে মেলে ধরবার মত অনেকটা পরিসর। যেন সুলক্ষণার একান্ত নিজস্ব বস্তু ছিল ও সুলক্ষণার হাতের খুঁটি। এই খুঁটিটি নিয়ে সুলক্ষণা ওঁর ছেলেমেয়ের সঙ্গে খেলার ছক্ পেতে বসেছেন।
সুলক্ষণার ইচ্ছা আর নির্দেশে নিয়ন্ত্রিত হয়ে চৈতালী নামক খুঁটিটি সুলক্ষণাকে জয়ের গৌরব এনে দেবে।
তাই সুলক্ষণার স্নেহগণ্ডির পরিসরের মধ্যে আবদ্ধ থেকে সেই দায়ের ভার বহন করছিল চৈতালী, সুদক্ষিণা আর কৌশিক সেই স্বল্পপরিসর ঠাই থেকে টেনে বার করে আনছে দায়হীন খোলা হাওয়ার দেশে।
তবু ভেসে যায় না চৈতালী।
সুলক্ষণাকেই আঁকড়ে থাকে।
শুধু মনের মধ্যে এক বিচিত্র আলোর খেলা চলে।
সুদক্ষিণা বলে, দেখ, বয়েস হিসেবে তোমাকে দিদি টিদি গোছের কিছু একটা বললে ভাল দেখাত, কিন্তু সে সব আমার কেমন আসে না। তাই নাম ধরেই ডাকি। কিছু মনে কর না তো?
চৈতালী কৃতার্থতায় রঙিন হয়ে ওঠে।
বলে, কী যে বলেন।
কৌশিক বলে, দেখ ক্ষে, অত ঘটা করে ক্ষমা চাওয়ার ফার্সটা না করে ওর এই সব আপনি আজ্ঞে গুলো বন্ধ করলে পারতিস। অন্তত সেটাই ভাল দেখাত। বয়সে খুব মারাত্মক একটা ডিফারেন্স আছে বলে তো মনে হয় না।
সুদক্ষিণা একটু লাল হয়ে উঠে বলে, জানি না তো বাপু। দেখে একটু বড় মনে হয়, তাই বলছি। তোমার বয়েস কত গো চৈতালী?
চৈতালী আস্তে বলে, একুশ।
তবে? সুদক্ষিণা কৌশিকের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, আমার তো সবে কুড়ি সুরু হয়েছে।
মেয়েরা তো কখনো ঠিক বয়েস বলে না– কৌশিক মন্তব্য করে।
মেয়েদের সম্পর্কে এত জ্ঞান সঞ্চয় করলি কী করে ছোড়দা? সুদক্ষিণা বলে, তবে এখনো একটু কাঁচা আছিস। এ জ্ঞানটুকু জন্মায়নি ঠিক বলে না বলে, বয়েস বাড়িয়ে বলে। চৈতালী–
আহা ওর কথা কে বলছে? আমি বলছি তোর কথা–
আমার কথা? বড্ড তোর সাহস বেড়েছে দেখছি ছোড়দা, আমায় রাগাতে আসছিস। আমি বয়েস কমাচ্ছি?
অসম্ভব কি?
ওঃ তাই তো! আমার বয়েস জানিস না তুই?
দেবতা জানে না, তো আমি কোন্ ছার!
বেশ, বেশ, আমি বলছি আমার বয়েস দশ! হল তো?
ভাইবোনের এই কৌতুক কলহে হেসে ফেলে চৈতালী আর বোধ-করি স্থানকাল-পাত্র বিস্মৃত হয়েই বলে ওঠে, মেয়েদের বয়েস লুকোনো নিয়ে আমার মেসোমশাই যা মজার একটা গল্প বলতেন। বিলেতের গল্প অবিশ্যি। ওখানের একজন ধনীলোক কাজে অবসর নেবার পর গ্রামে বাস করতে গেলেন। থাকতে থাকতে তার ইচ্ছে হল, গ্রামে বিখ্যাত হবার জন্যে কিছু একটা করবেন। ভেবে চিন্তে তাই ঘোষণা করলেন, গ্রামে যদি কোন একশো বছরের বুড়ি থাকে, তাকে তিনি তাঁর বাকী জীবন মাসে পঁচিশ পাউন্ড করে পেনসন দেবেন।
দেখা গেল, ঘোষণা শুনে সেই পেনসনের দাবীদার হয়ে কেউ এল না।
তিনি ধরে নিলেন গ্রামে একশো বছরের বুড়ি নেই। তখন আবার ঘোষণা করলেন গ্রামের আশী বছরের বুড়িরা ওই পেনসন পাবে।
দেখা গেল তাতেও একজনও সাড়া দিল না। ধনী ভদ্রলোক ক্ষুব্ধ হয়ে ভাবলেন, গ্রামের মহিলারা সকলেই কি অল্পজীবী?
অতঃপর তিনি বললেন, ষাট বছর বয়সের মহিলা মাত্রেই তার ওই পেনসনটা পেতে পারবেন। এমন আশ্চর্য তাতেও গ্রাম নীরব। উনি চটে মটে বললেন, ব্যাপার কি? এখানে কি পাইকারি হারে বয়স্থা মহিলারা খুন হন? নচেৎ এ রকমটা হবে কেন?
রেগে গিয়ে ভদ্রলোক চল্লিশ বছরের মহিলাদের ওপর পেন ধার্য করলেন, এবং তাতেও সেই পুরনো ফলই পেলেন। এবারে ভদ্রলোক আর রাগও করলেন না। আর হতাশও হলেন না। খুব কৌতুক অনুভব করলেন। সেই কৌতুকের বশবর্তী হয়ে বললেন, পঁচিশ বছরের মেয়েদের এই পেনটা দেবেন তিনি।
এইটি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই দলে দলে মহিলা আসতে সুরু করলেন তাঁর বাড়িতে। পঁয়ত্রিশ থেকে পঁচানব্বই পর্যন্ত। ভদ্রলোক তো দিশেহারা।
ঝোঁকের মাথায় গল্পটা বলে ফেলে ভারী কুণ্ঠিত হয়ে পড়লো চৈতালী। এসে পর্যন্ত একসঙ্গে এর সিকি কথাও কোনদিন বলেনি। তা ছাড়া তার কি এখন মজার গল্প বলার সময়? কী না জানি ভাবল এরা।
এরা কিন্তু কিছুই ভাবল না। বরং হেসে উঠল এবং কৌশিক সপ্রশংস হাসি-হাসি মুখে প্রশ্ন করল, কার কাছে শুনেছিলে এ গল্প?
আমার মেসোমশাই।
বলে আরও জড়সড় হয়ে পড়ে চৈতালী। তার যে একটা অতীত ছিল, এবং সেখানে তার আত্মীয়স্বজনের উপস্থিতি ছিল, একথা কি প্রকাশ করবার? অন্তত এদের কাছে প্রকাশ করবার? সেই অতীতকে নিশ্চিহ্ন করে মুছে ফেলবার সংকল্পই তো করেছে সে, বাপের মৃতদেহের সামনে।
কিন্তু এরা এতসব বোঝে না।
বরং এরা অবাকই হয়, আর বোধকরি কিছুটা লজ্জিতও।
ইস্, সুদক্ষিণা আবার জিগ্যেস করেছিল বাংলা বই পড়তে পারে কি না, অন্তত ছোটদের বই-টই।
কৌশিকও আগে ভাবেনি, এমন গুছিয়ে সুন্দরভাবে গল্প বলার মত বুদ্ধি ওর থাকতে পারে। এমন এক উৎকট পরিবেশের মধ্যে দেখা গিয়েছিল মেয়েটাকে!
সন্দেহ নেই, সত্যিই ভাল ভদ্রঘরের মেয়ে, কোন একটা দৈব-দুর্বিপাকে পড়েই
