চুকে তো যাবে নিতাই চিন্তিত স্বরে বলে, যদি রায়বাঘিনী হঠাৎ এসে পড়ে বাপের খোঁজ চায়?
চাইবে, পাবে না। বরেন মুখ বাঁকিয়ে বলে, যে যা চায়, সে তা পেলে তো জগতে কোনও সমস্যাই থাকত না।
তাহলে বলছিস, চেপে বসে থাকব নিশ্চিন্দি হয়ে?
নিশ্চয়।
.
ঠিক সেই সময় কৌশিকদের বাড়িতেও এই রকম আলোচনাই চলছে।
সুদক্ষিণা প্রশ্ন করেছে তাহলে দাদা চুপ করে বসে থাকবে?
কৌস্তুভ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, কিছু করে উঠতে পারেনি।
পারবে কি করে, অপর্ণার সামনে বেশী উদ্বেগ প্রকাশও বারণ। ছুটোছুটি করতে উঠলে, বিপদ আবার কোন্ দিক থেকে আসবে কে বলতে পারে?
সুলক্ষণা নিজের ঘরে বসে আছেন।
সুদক্ষিণা পাশের কাদের বাড়ি থেকে কোথায় যেন ফোন করে এসেছে।
এমনি একটা সময়ে ঘড়ির কাঁটাটা বোধ করি সাড়ে নটার ঘর ছাড়িয়ে দশটার দিকে এগোতে সুরু করেছে, হঠাৎ বংশী ছুটে এসে খবর দিল এসেছে!
.
এসেছে?
অপর্ণা একবার উঠে বসেই শুয়ে পড়ে বলল, পাখাটা একটু জোরে– তারপর বলল, একা? না দুজন?
সুদক্ষিণা দ্রুত নীচে নেমে যাচ্ছিল, সুলক্ষণা ডেকে থামালেন। বললেন, বেশী কিছু বকাবকি করতে যাসনে।
বকাবকি করতে যাব না? সুদক্ষিণা ফিরে দাঁড়াল, এক প্লেট সন্দেশ নিয়ে সামনে ধরব তাহলে? এই বলছ?
হ্যাঁ তাই বলছি হাসলেন একটু সুলক্ষণা।
সুলক্ষণা বুঝতে পারছেন না ব্যাপারটা কোন দিক থেকে আর কি কারণে এই মূর্তি নিয়েছে। মূল কারণ তো আবার তিনি নিজেই। চট করে কিছু বলে বসা ঠিক নয় এ বোধ রয়েছে। তাই সুদক্ষিণাকে বিশ্বাস করলেন না। নিজেই হাল ধরতে গেলেন।
আর নীচে নেমেই প্রথমে চোখে পড়ল চৈতালীর বিগত কালকের মতই বিবর্ণ নিষ্প্রভ অবনতমস্তক মূর্তিটা।
বিচলিত হয়ে গেলেন সুলক্ষণা, কিছু একটা বলতে গেলেন, এগিয়ে এল কৌশিক। খুব নীচু গলায় বলল, ওর বাবা কেমন আছেন জিগ্যেস কোর না মা।
জিগ্যেস করব না!
না। কারণ জিগ্যেস করবার কিছু নেই।
জিগ্যেস করবার কিছু নেই?
মানে বুঝতে দেরি হল না সুলক্ষণার। আস্তে বললেন, এতক্ষণ কোথায় ছিলি?
নানা ঝামেলায়! জীবনে জানি না এসব জায়গায় কি করতে হয়, না হয়। শেষ পর্যন্ত অনেক চেষ্টা করে–
সুলক্ষণা হাতের ইশারায় থামিয়ে দিয়ে বললেন, নে কাপড়-চোপড় একটু ছেড়ে নে তোরা, হাতমুখ ধো। রাত হয়েছে, খেতে বোস।
সুলক্ষণা ভাবলেন, খুব সহজ কথার মধ্য দিয়ে, আর অন্যমনস্কতার ভানের মধ্য দিয়ে, ব্যাপারটাকে হালকা করে নেবেন। গুরুত্ব কমিয়ে দেবেন।
কিন্তু চৈতালী?
চৈতালী কি তাই করবে?
চৈতালী কি অন্যমনস্ক হবে? হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসবে?
কৃচ্ছ্র সাধনের পদ্ধতি সে জানে না, কিন্তু মা-বাপ মারা গেলে যে অশৌচ পালনের কৃচ্ছু সাধন করতে হয়, তা সে জানে। আর করতেই যদি হয় তো, আঠারো আনাই হোক না? সেই পদ্ধতিই ধরে সে। কিছু না খাওয়ার পদ্ধতি।
.
বাতাসের মোড় ঘুড়ে গেল।
চৈতালীর পিতৃবিয়োগ, সমস্ত সংসারের কাছ থেকে একটু বিশেষ স্নেহ এনে দিল চৈতালীর জন্যে! তার অশৌচ পালনের কৃচ্ছসাধন সমস্ত সংসারের থেকে একটা যেন শ্রদ্ধা এনে দিল!
আর এই স্নেহ আর শ্রদ্ধার পরিপ্রেক্ষিতে চৈতালী যেন মূল্যবান হয়ে উঠল।
সুদক্ষিণা বললে, এই বংশী, খবরদার ওকে কিছু বলবি না।
বংশী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে, আমি আবার কবে কি বললাম কাকে? বংশী যে চাকর, সেই চাকর।
ওসব কথা কেন? কিছু বলবি না, তাই বলে রাখছি। আর
কৌশিক বলে, মা, ও বেচারীকে এখন আর কিছুদিন কাজটাজ নাই করতে দিলে?
সুলক্ষণা ঈষৎ বিরক্ত হয়ে বলেন, বাপমরা অশৌচ ওর এখন, করবেই বা কি? করছেই বা কি?
না, তাই বলছি।
কৌস্তুভ এসে বলে, অপর্ণা বলছিল এ সময় ওকে
সুলক্ষণা ভুরু কুঁচকে বলেন, কাকে?
মানে তোমাদের এই মেয়েটার কথা হচ্ছিল। বলছিল, এ সময় ওর আত্মীয়-টাত্মীয়দের কাছে গেলেই ভাল হত।
তাহলে কোথায় ওর আত্মীয়রা আছে খুঁজে বার করো।
বলে চলে গেলেন সুলক্ষণা।
.
হ্যাঁ, বাতাসের মোড় ঘুরে গেছে বাড়ির। কাদাবালি মাখা যে পাথরকুচিটুকু সুলক্ষণা নিজে কাদা থেকে তুলে ধুলো-বালি ধুয়ে আঁচলে মুছে লোকচক্ষে ধরে আত্মসন্তোষ লাভ করেছিলেন, লোকে যদি সে বস্তুকে মূল্যবান বলে বুঝে নিয়ে কাড়াকাড়ি করে, সোনা বাঁধিয়ে আঙটি বানাতে চায়, সুলক্ষণার ভাল লাগবে কেন?
সুলক্ষণার আর ওকে ঘষে-মেজে উজ্জ্বল করে তোেলবার অবকাশ থাকল কই? কোথায় থাকল বড়মুখ করে বলতে পারার অবকাশ, দেখলি তো আমার হিসেব ঠিক কি না? বুঝলি তো আমি কাঁচ কি হীরে চিনতে পারি কি না।
তাই চৈতালীর ওপর একান্ত স্নেহ থাকলেও ওদেরটা বাড়াবাড়ি ঠেকছে। সেদিন ওরা সুলক্ষণার বুদ্ধিকে বিদ্রূপ করেছিল, আজ সুলক্ষণা ওদের সুবুদ্ধিতে বিরক্ত হচ্ছেন!
কিন্তু সে কথা ওদের বোঝার ক্ষমতা নেই।
তাই সুদক্ষিণা চৈতালীকে দোতলায় নিজের ঘরে ডেকে নিয়ে বসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে লেগেছে, কতদূর লেখাপড়া করেছে চৈতালী, গল্পের বই পড়তে পারে কিনা। যদি পারে তো পড়ক না বসে বসে, কত তো গল্পের বই রয়েছে সুদক্ষিণার ঘরে। ওর ছেলেবেলার বইগুলোও আছে। বড়দের বেশী শক্ত বই না পড়তে পারে তো ওইগুলোই পড়ক। কত মজার মজার গল্প, দেশ-বিদেশের গল্প, রামায়ণ-মহাভারতের গল্প
চৈতালীর বাবা মারা গেছে!
এই খবরটাই সুদক্ষিণাকে দ্রব করে দিয়েছে। আহা, হোক চোর-ঘঁচোড় বিচ্ছিরি বাবা, তবু বাবা তো! সুদক্ষিণা তো জানে, বাবা মারা গেলে কী কষ্ট হয়।
