এবার সুদক্ষিণা বলে, বিপদ আসা আর বিপদের মুখে পাঠানো তফাত নয় কি মা?
তা আমার হাত থেকে বিপদ আসাই যদি ওর ভাগ্যে থাকে, সেও তো আমি রদ করতে পারব না ক্ষে।
ওই! হল! সেই তোমার ভাগ্য। তা হলে তো মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি বলে কিছু থাকা উচিত নয়। কিন্তু যাই বল মা, ভাগ্য-টাগ্য যদি মানো তত তোমার তুকতাকও মানা উচিত! মেয়েটা নির্ঘাত তোমায় তুক করেছে। নইলে ভাল করে ভেবে দেখ, কি অন্ধ তুমি হয়ে গেছ? খুব দি ভাল মেয়ে হয়, চোর-ডাকাত কিছু যদি নাও হয়, বাড়ির রাঁধুনীর বাবা-মা হাসপাতালে থাকলে কে কবে বাড়ির ছেলেকে পাঠায় দেখতে
সুলক্ষণা স্থির স্বরে বলেন, আসল জায়গাটায় ভুল করেই সব গুলিয়ে ফেলছিস ক্ষে। বাড়ির রাঁধুনী না ভেবে বাড়ির মেয়ে ভাবলেই আমার অঙ্কটা বুঝতে পারবি।
বাড়ির মেয়ে!
সুদক্ষিণা অভিমানক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলে, তাই বল। বাড়ির একমাত্র মেয়ে বলে মনে বড় অহংকার ছিল, সেটা গেল। এবার বোধ করি ওঁকে দিদি বলে ডাকবার হুকুম আসবে?
সুলক্ষণা ঈষৎ হেসে বলেন, সে হুকুম আমার কাছ থেকে না এসে, তোর নিজের ভেতর থেকেও আসতে পারে ক্ষে।
আমি তোমাদের মতন অত মহৎ নয়।…এই যে দাদা এসে গেছ। মার কাণ্ড জানো? ছোড়দাকে পাঠিয়েছেন চৈতালীর সঙ্গে, তার বাবা না কাকা কে হাসপাতালে আছে তাকে। দেখাতে। এখনো ফেরেনি তারা।
কৌস্তুভ একবারমাত্র মা বোন দুজনের মুখভাব অবলোকন করে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে, তাই নাকি? আর পরক্ষণে তার থেকে চতুগুণ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে ওঠে, কিন্তু অপর্ণার কি হল? আবার হঠাৎ
সুলক্ষণা ঘর থেকে বেরিয়ে যান।
.
আচ্ছা, মেয়েটা কোথায় গেল বল্ দেখি?
নিতাই তার প্রিয় সাগরেদ বরেনকে জিগ্যেস করে, একেবারে হাওয়া হয়ে গেল কি করে?
বরেন নাক কুঁচকে বলে, বুঝতে পারছ না দাদা? তলে তলে প্রণয়ী জুটিয়ে রেখেছিল, যেই বাপ চোখের আড়াল হয়েছে, সেই
না না, নিতাই প্রতিবাদ করে ওঠে, সে প্যাটার্নের মেয়ে নয়। দেখতিস না মেজাজ? যেন রায়বাঘিনী। ওসব মেয়ে–
বরেনের বোধ করি কোনখানে একটু জ্বালা আছে, তাই তিক্তস্বরে বলে, বাঘিনী বলে কি আর প্রেমে কসুর হয়? গরু গাধাদের দিকে হেনস্থার দৃষ্টিতে তাকাতে পারে, কিন্তু জগতে বাঘও তো আছে।
.
নিতাইয়ের চৈতালী সম্পর্কে ঠিক এ রায়টা মনঃপূত হয় না। মেয়েটাকে তো দেখছে সেই ছোটবেলা থেকে। তা ছাড়া সেদিনই শচীনের হাসপাতালের চিকিৎসার খরচ নিয়ে যে কোদল হয়ে গেছে নিতাইয়ের সঙ্গে চৈতালীর, এই হারিয়ে যাওয়াটা তারই প্রতিক্রিয়া কিনা ভেবে খুব একটা স্বস্তি নেই তার। কে জানে বাবা, গঙ্গায় ডুবেটুবে মরতে গেল না কি? যা তেজী মেয়ে! সেদিন তো মনে হচ্ছিল ভস্ম করে ফেলে বুঝি নিতাইকে।
কিন্তু নিতাই তো তা বলে ওই একফোঁটা মেয়েটার কাছে বেকুব বনে গিয়ে টাকার বাক্স খুলতে বসবে না। চোরাই আফিঙের যে ব্যবসাটি ছিল তাদের, তার সব কিছু ঝামেলা নিতাই নিজে পোয়াত না? শচীনটা কতটুকু কী করেছে? সব কি নিতাই শচীনকেই জানাত? যতটুকু ওকে দিয়ে করানো যায় তাই করিয়েছে। এসব কাজে দুচারজনকে না নামালেও তো সুবিধে হয় না। মনের মতন বৌটা দুম করে মরে যাওয়ায় লোকটা তো জীবনে হতাশ হয়ে নেলাক্ষ্যাপা হতে বসেছিল; সেই স্কুলের সহপাঠিত্বের পরিচয় ঝালিয়ে নিতাই ওকে আয়ত্তে এনে মানুষ করে তুলেছিল।
তখন তো জানতই না নিতাই, ওর বৌটা একটা মেয়ের জন্ম দিয়ে তবে নিজে মরেছে। শুনলো অনেক দিন পরে, শচীন বলল ওর একটা মেয়ে আছে, সে মাসীর কাছে মানুষ হচ্ছে।
তা সে মেয়েকে কি শচীন নিজের কাছে আনতে চেয়েছিল কোনদিন? না চায়নি। নিতাই-ই প্ররোচনা দিয়ে দিয়ে তাকে এখানে আনিয়েছে।
মেয়ে শুনে উল্লসিত হয়েছিল নিতাই।
এ সব ব্যবসায় একটা এক্সপার্ট মেয়ে ভয়ানক কাজে লাগে। কালে ভবিষ্যতে সেই মেয়েই দলনেত্রী হয়ে উঠে একশো পুরুষের কান কাটে।
নিতাই আশা করেছিল শচীনের মেয়েটাকে তেমনি এক্সপার্ট করে তুলবে। তাই ছোট থেকেই আনতে বলেছিল ওকে। বলেছিল, কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ, পাকলে করে টাশ টাশ কিন্তু সেই মাসী মাগী না কে, সে মেয়েটাকে দশ বারো বছরেরটি না করে ছাড়ল না। আদৌ ছাড়ত না, যদি না নিজে বিধবা হয়ে অথই জলে পড়ত।
তা সেই, যা বলেছিল নিতাই, তাই হল। এক্সপার্ট যে হল না ছুঁড়ি তা নয়, কিন্তু ওই। টাশ টাশ!
নিতাইকে তো দুচক্ষের বিষ দেখেছে বরাবর। আর শচীনও ওদিকে খুব হুঁশিয়ার ছিল। মেয়েকে আগলে আগলে ফিরত।
কিন্তু এখন?
এখন কোত্থান থেকে আগলাবি আগলা? সময়ে যদি একটা বেথা দিতিস তাও বা হত। এই তত বরেন, মেয়েটার ওপর ওর যথেষ্ট লোভ ছিল, জাতে ও বামুন, দিতে পারত অনায়াসে। তা নয়। মেয়ে ওঁর দামী।
এখন? দামী মেয়ে এই তো ভেসে গেল।
বরেনের কথায় নিতাই গা ঝাড়া দিয়ে বলে, ওসব কথা যাক, এখন করা যাবে কি তাই ব? এদিকে তো এই বিপদ ঘটে গেল, ওদিকে মেয়ে হাওয়া
বরেন বিরক্ত স্বরে বলে, হাওয়া হোক, ঝড় হোক, আমাদের কি নিতাইদা? যার সঙ্গে চক্ষুলজ্জা সেই যখন
কিন্তু আমাদের, ইয়ে আমাদের আর একবার হাসপাতালে না যাওয়া কি ঠিক হল? লাশটা–
বরেন তাচ্ছিল্যের ভঙ্গী করে, ক্ষেপেছ দাদা! খাল কেটে কুমির আনতে চাও? লাশ নিতে গেলে, জেরার চোটে তোমাকে একেবারে ফাঁস করে ছাড়বে না? এ বাবা যাদের মড়া তারা বুঝবে। অজ্ঞাত পরিচয় লিখে গাদায় জ্বালিয়ে দেবে। চুকে যাবে ল্যাঠা।
