আহা তা অত কৈফিয়তের কি আছে? আমি বলছি অসুবিধে হবে? হুকুম করবে চলে যাব, ব্যস! তবে
কি তবে?
মহিলাটিকে একটু বারণ করে দিয়ে, আমার সঙ্গে যেতে যেতে পথে যেন ফাঁস ফাস না করেন।
.
সুলক্ষণা ছেলের এই অনুরোধের কোন জবাব দেননি, হেসে সরে গিয়েছিলেন সেখান থেকে।
সুলক্ষণা ছেলেকে বলেছিলেন পথ থেকে ফল কিনে দিতে।
ফলের বহর দেখে লজ্জায় কুণ্ঠায় এতটুকু হয়ে গেল চৈতালী। এ কি! চৈতালীর বাপের জন্য এত!
এরা সত্যিই এমন মহানুভব, না পুরো পরিবারটাই পাগল?
এত কি হবে?
না বলে পারল না চৈতালী।
কৌশিক গম্ভীর মুখ করে বলে, কখন কত লাগে ধারণা আছে আপনার?
আপনি!
চৈতালীকে ওই সুকান্তি ভদ্রছেলেটি আপনি বলছে! মরমে মরে গিয়েও কি এদের ভদ্রতার ঋণ পরিশোধ হবে?
হবে না।
তবু চৈতালী নম্র গলায় বলে, আমাকে আপনি বলবেন না! মাসীমা আমায় দয়া করে
দেখ আপনি না বললাম না বললাম, ওই দয়া-টয়া বললেই ট্যাক্সি থেকে নেমে সটান বাসে চড়ে বাড়ি ফিরে যাব।
ওর কথার ধরনে হেসে ফেলে চৈতালী। তারপর আস্তে নিঃশ্বাস ফেলে বলে, বড় হয়ে পর্যন্ত খালি বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি জানোয়ারই দেখেছি, পৃথিবীতে যে দেবতাও আছে, তা দেখিনি কোনদিন।
সুলক্ষণা ওদের পাঠিয়ে দিয়ে চুপ করে বসে ভাবছিলেন, আমার পরীক্ষাটা কি বড্ড বেশী দুঃসাহসিক হচ্ছে? আমি কি বিপদ ডেকে আনব? কৌশিককে অসংগত অনুরোধের চাপ দিয়ে বিব্রত করলাম? আমি কি
বংশী এসে দাঁড়াল।
বলল, মা, আমি তো বুন্ধু, চাকর নফর, কিন্তু একটা কথা না বলে তো পারছি না।
সুলক্ষণা হেসে ফেলে বললেন, না বলে যখন পারছিসই না, তখন বলেই ফেল?
চোট্টা মেয়েটাকে তো মাথার মণি করলে, কিন্তু ওর মতিগতি সুবিধের নয়।
সুলক্ষণা ভুরু কোঁচকালেন।
এটাই প্রশ্ন।
বংশী বেশ জোরালো স্বরে বলে, তোমার ওই রুপোর গেলাসটা, যেটা নিয়ে কাল হাতেনাতে ধরা পড়েছিল, সেটার ওপর ওর ছোঁকছোঁকানি যায়নি। তখন দেখি মাজা গেলাসটা হাতে নিয়ে একেবারে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেন জগতের সকল চিন্তা ওই গেলাসটায়। নেহাত আমাকে দেখতে পেয়ে তাড়াতাড়ি রেখে দিল। তা কি আর বলে, জিগ্যেস করতে বলল, গেলাসে কার নাম লেখা?
সুলক্ষণা শান্ত গলায় বলেন, এতে হলটা কি? হয়তো নামটাই পড়ছিল।
তোমার যেমন সারল্য মন, তেমনিই তো বলবে। জানি, দোষ ধরবে না। আমার রাগ ধরে গেল। বললাম, কার নাম কি বিত্তান্ত, অত কথায় তোর দরকার কি? মা দয়া করে আশ্রয় দিয়েছে–
বংশী!
সুলক্ষণার তীব্র স্বরে বংশী থমকে থেমে যায়।
সুলক্ষণা দাঁড়িয়ে উঠে সরাসরি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলেন, আর কোনদিন যেন এ ধরনের কথা না শুনি। আর ওভাবে তুই টুই করে খারাপ ভাবে কথা বলবি না ওর সঙ্গে। ক্ষেণুকে যেভাবে মেনে চলিস, সেই ভাবেই মেনে চলবি ওকে।
রায় দিয়ে চলে যান সুলক্ষণা।
আর রোষে ক্ষোভে ধিক্কারে বংশী সংকল্প করে কালই দেশে চলে যাব। ওই চোর মেয়েটা একবেলা একটু ভাল রান্না বেঁধেছে, তাই এত আদর তার? আর বংশী যে- ঠিক আছে যাব যাব। এই তিন সত্যি।
.
কিন্তু তিন সত্যি কি রক্ষা হল বংশীর?
বসে তো ছিল অনেকক্ষণ গুম হয়ে, তার পর?
চৈতালী আর কৌশিকের ফিরতে দেরি দেখে সুলক্ষণা যখন বংশীকেই ডেকে বললেন, কই ওরা তো এখনো এল না দেখছি, ওদিকে বৌমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। দুধটা ততক্ষণ জ্বাল দেবার ব্যবস্থা কর বংশী।
তখন বংশী ছিটকে এসে হাউমাউ করে চেঁচিয়ে উঠল, মা হয়ে নিশ্চিন্দি হয়ে বসে আছ কী করে মা? একবার খেয়াল করছ না–ব্যাপারটা কি ঘটেছে?
সুলক্ষণাও চিন্তান্বিত ছিলেন। কিন্তু তা প্রকাশ না করে বলেন, কেন বল্ তো? কী হল?
কী হল? ছেলেটাকে ইচ্ছে করে ডাকিনীর খপরে ধরে দিয়ে কোন্ বদমাইশ গুণ্ডার আড্ডায় পাঠিয়ে দিলে কে জানে, কী তার কপালে ঘটছে কে জানে! আর বলছ যে, কী? আজন্ম কলকাতায় আছ, জানো না কতরকমের বদমাইশি আছে সংসারে। বুঝতে পারলে না সব বানানো গপো। ওই হাসপাতালের ছুতো করে কোথায় নিয়ে গিয়ে তুলল কে জানে। হাসপাতালে গেল কি না বড়বাজারে! যেখানে যত রাজ্যের গুণ্ডাপট্টি। অতবড় মেডিকেল কলেজ গেল, তাতে কুলোল না ওর বাপের? ছলনা, ছলনা, আমি বলছি সব ছলনা।
.
সুলক্ষণা ভেতরে ভাঙলেও বাইরে মচকান না, বলেন, থাম বংশী, পাগলের মত বকিসনি। এ স। গাড়ি পাওয়া অত সোজা নাকি?
কিন্তু ভেতরে কি সত্যি ভাঙলেন?
তার বিধাতার কাছে কি দৃঢ়তার সঙ্গে জানালেন না, ঠাকুর মুখ রেখো!
আর ঠিক সেই সময়
সুদক্ষিণ, ছুটে এল, মা, বৌদি ভয় পেয়ে কীরকম করছে!
ভয় পেয়ে কী রকম করাটা বৌদির নিত্য-নৈমিত্তিক। এবং ভয়টার কারণ প্রায়শই এত তুচ্ছ যে, রাগ করতেও বেন্না করে। তবু কৌস্তুভ বাড়িতে না থাকলে যেতেই হয়, ছুটে গেলেন।
দেখলেন অপর্ণা ঘামছে চোখ বুজে শুয়ে।
কী হয়েছে?
জানি না, সুদক্ষিণা বলে, কে ওর মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে ছোড়দাকে গুণ্ডারা খুন করেছে
আঃ, কী আশ্চর্য! এ ওই নির্বুদ্ধির ঢেঁকি বংশীটার কাজ। সুলক্ষণা ব্যস্ত হলেন, বৌমা! বৌমা!
অপর্ণা চোখ খুলে কান্নাভরা গলায় বলে ঠাকুরপোকে কেন যেতে দিলেন মা?
সুলক্ষণা তাঁর ইষ্টদেবতাকে স্মরণ করে বলেন, দিয়েছি তার কি?
মনে হচ্ছে কোন বিপদ হয়েছে!
সুলক্ষণা দৃঢ় স্বরে বলেন, আমি না পাঠালেই কি ও বাড়ি বসে থাকতে বৌমা? নাকি ও নিজে বেরোলে বিপদ আসতে পারত না?
