সুলক্ষণা ইনজেকশনের সময় ছিলেন, তারপর নেমে গিয়েছিলেন ডাক্তারের সঙ্গে সঙ্গে।
আবার এলেন।
বললেন, তোর তো বেলা হয়ে যাচ্ছে খোকা, চান করবি, খাবি। আমি একটু না হয় বসছি বৌমার কাছে, তুই যা।
অপর্ণা ক্ষীণ কুণ্ঠিত কণ্ঠে বলে, না না, আমি একাই থাকতে পারব।
কৌস্তুভও বলে, তুমি এখন আবার! কেন, ক্ষেণু নেই?
না, ওর তো আজ গানের ক্লাস। ব্যস্ত হচ্ছিস কেন, যা তুই।
ব্যস্ত কৌস্তুভ হচ্ছিল এতক্ষণ মনে মনে, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে। কিন্তু ব্যস্ততা দেখানো চলে না, তাহলে অপর্ণা আহত হবে। অভিমানের জোর নেই, শুধু চোখ দিয়ে জল পড়ে।
মার বিবেচনায় স্বস্তি পেয়ে নেমে গেল সে। এবং যথারীতি চান করে এসে টেবিলের ধারে বসে শান্ত গম্ভীর গলায় ডাক দিল, বংশী!
কিন্তু বংশী এল না।
এল চৈতালী।
.
কোস্তুভ কৌশিকের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীত।
মেয়ে দেখলেই অস্বস্তি অনুভব করে ও। সকালবেলা কৌশিক যখন চৈতালীকে নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করছিল, কৌস্তুভ অস্বস্তিতে ঘেমে উঠছিল।
তাই চৈতালীকে ভাত দিতে আসতে দেখে ওর ক্ষিদেই উপে গেল। চৈতালী কিন্তু নির্বিকার। এল, কুঁজো থেকে জল গড়িয়ে টেবিলে রাখল, ভাত বেড়ে আনল, পরিপাটি করে পাশে বাটি সাজিয়ে দিল, নুন লেবু সব দিয়ে আস্তে সরে গিয়ে দরজার বাইরে দাঁড়াল।
অস্বস্তির মাঝখানেও অবাক হয়ে গেল কৌস্তুভ!
সম্পূর্ণ অপরিচিত জায়গায়, আনকোরা নতুন হাতে এত সুন্দরভাবে কাজ হওয়া সম্ভব? আর এতগুলো রান্না হয়ে ওঠা?
শুধু বংশী কেন, বামুনঠাকুরদের আমলেও দেখেছে কৌস্তুভ। রান্না হয়ে না ওঠার জন্যে সুলক্ষণা অনুযোগ করতেন, গরম ডাল ভাত ঠাণ্ডা করবার জন্যে হানটান করছেন, এইটাই কৌস্তুভ বহুদিন থেকে দেখতে অভ্যস্ত। সুলক্ষণার স্বামীর আমল থেকেই। ভদ্রলোক স্ত্রীকে রান্না ভঁড়ার ঘরে বেশীক্ষণ থাকতে দিতে আদৌ ভালবাসতেন না। কাজেই সারা সকাল সুলক্ষণাকে তার কাছেই ঘুরতে হত, এদিকটা দেখা হত না।
আজও তো কই দেখেননি মা, ভাবল কৌস্তুভ। আর সঙ্গে সঙ্গেই ভাবল, অথচ এ এত সুন্দর করে।
আচ্ছা কাল তো মেয়েটাকে এত পরিষ্কার দেখতে লাগছিল না। কাজকর্ম করলে মেয়েদের চেহারা বদলে যায় নাকি?
আর কিছু লাগবে?
না না। আবার কি।
কৌস্তুভ ব্যস্ত হয়ে জলের গ্লাসে হাত ডুবিয়ে উঠে পড়ল।
চৈতালী হঠাৎ খুব স্পষ্ট গলায় বলে উঠল, ভাত তো সবই দেখছি পড়ে রইল। আমার হাতের রান্না বলে ঘেন্নায় খেতে পারলেন না বুঝি!
না না, ইস সে কি! আমি কোনদিনই এত–জিগ্যেস কোরো মাকে পালিয়ে গেল কৌস্তুভ।
আর চৈতালী নিষ্পলকে তাকিয়ে রইল সেই ফেলে ছড়িয়ে খাওয়া ভাতের থালাটার দিকে। এদের কাছে ভাতের কোন দাম নেই।
অবশ্য চৈতালীরাও চিরদিনের দুঃখী নয়! কৈশোরটা মাসীর বাড়িতে কষ্টে কাটলেও, বাপের কাছে নানারকম দেখেছে।
তার ছিল দশ দশা।
কখনো হাতী, কখনো মশা।
কিন্তু এখন?
দীনহীন একটা দাঁতব্য হাসপাতালে পড়ে আছে বাবা, ইনজেকশনের ওষুধ জুটছে না। অথচ এদের যে বৌ চলে ফিরে বেড়াচ্ছে, তার জন্যে বড় ডাক্তার এল, ইনজেকশন পড়ল।
নিজের মনে ভয়ানক একটা দুঃখ অনুভব করল চৈতালী।
সকাল থেকে কাজ দেখিয়ে দেবার উৎসাহে এবং মনের মত মাছ তরকারির উপচার নিয়ে রাঁধতে বসতে পাওয়ার আনন্দে যেন স্থান কাল পাত্র বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল চৈতালী। হঠাৎ এখন বাবার কথা মনে পড়ে যাওয়ায় সমস্ত শরীরের মধ্যে মস্ত একটা আলোড়ন উঠে চোখে জল এল।
.
সুদক্ষিণা কলেজ থেকে ফেরার পর সুলক্ষণা একটা ঠিকানা লেখা কাগজ এনে ওর সামনে ধরে বললেন, জায়গাটা জানিস ক্ষে?
সুদক্ষিণা তাতে চোখটা বুলিয়ে নিয়ে বলে, বাঃ এ তো দেখছি একটা হাসপাতাল! আমি কি করে জানব?
কী মুশকিল, তুই জানবিই এমন কথা তো বলিনি রে বাপু। জানিস কি না তাই বলছি। জায়গাটার আন্দাজ হচ্ছে?
মনে হচ্ছে তো বড়বাজারের দিকে কেন কি হবে সেখানে?
না, হবে না কিছু সুলক্ষণা বলেন, তুই যখন পারবিই না। ভাবছিলাম মেয়েটাকে একটু সঙ্গে করে নিয়ে যেতিস–
সুদক্ষিণা চমকে ওঠে, বলে, কেন, কি হল ওর? হাসপাতালে কেন?
ভাবনা ধরে যায় তার।
একদিনেই আস্বাদ পেয়েছে সংসারের শৃঙ্খলার, কাজের কর্মের, ভাল রান্নার। তাই একেবারে ঘৃণিত অসহ্যকেই দামী মনে হচ্ছে। কিন্তু এখন আবার কি হল তার?
সুলক্ষণা খুলে বলেন।
ওর কিছু না, ওর বাবার।
হাসপাতালে আছে ওর বাপ, ও শুধু ঠিকানাটা জানে, যায়নি একদিনের জন্যে। নিয়ে যায়নি কেউ। নিয়ে যাবার লোকই ছিল না
সুদক্ষিণা নাক কুঁচকে হেসে বলে, এখন বুঝি হয়েছে ভাবছে?
ও হয়তো কিছুই ভাবেনি, আমি ওর প্রাণটার দিকে তাকিয়ে দেখছি–
তা আমি তো ওদিকে জীবনেও একা যাইনি। তা ছাড়া আবার হাসপাতাল-ফাসপাতাল!
থাক তবে।
বলে চলে গেলেন সুলক্ষণা।
.
কিন্তু ছেড়ে দিলেন কি?
না। গৃহীত সংকল্প ত্যাগ করা সুলক্ষণার প্রকৃতি নয়।
কৌশিকের কাছে গেলেন।
কৌশিক দুহাত জোড় করে হাসে, মা, তুমি কি মহিমাময়ী মা! নিত্য তোমার পদধূলি সেবন করলে যদি কিছু হয় আমাদের। সেই অজ্ঞাত অপরিচিত মহাচোর ভদ্রলোকটির জন্যে তুমি তোমার ছেলেকে দিয়ে কমলা আপেল বিস্কুট মিছরি পাঠাবে? পাঠাবে ওষুধের টাকা? তদুপরি তোমার এই নিরীহ বালকের মাথায় চাপাবে সেই মহান ব্যক্তির কন্যাটিকে?
সুলক্ষণা বলেন, বুঝলাম তোর অসুবিধে হবে। কিন্তু দেখ, মেয়েটার জন্যে কষ্ট হচ্ছে। সারাদিন কাঁদছে।
