মারবার অব্যবহিত পরে আদর করলে মারবার ফলনষ্ট হয়। সাধাসাধি দরকার নেই। খাবার জন্য ডাকবে অর্থাৎ গম্ভীরভাবে খেতে বলবে, আর ভোজনটা পরিপাটি করে দেবে।
ছেলেমেয়েকে প্রথমেই যাও না, খাও না, করে কথা বলবে না। প্রথম যেতে বলবে, না শুনলে বলতে পার ‘যাও না’। ‘যাও না’ এরূপ করে হুকুম দিতে নেই। প্রথম কোনো কাজ করতে বলো না, শুনলে, জিজ্ঞাসা করো–তোমাকে অমুক বললাম, না শুনবার কারণ কী? তাতেও যদি ছেলেমেয়ে কথা না শোনে তাহলে আপাতত তখনকার মতো চুপ থাকাই শ্রেয়। যে কাজ করতে ছেলেমেয়ে নিতান্ত নারাজ, তা করবার জন্যে তাকে জোর জবরদস্তি করো না। সব কাজেই চিন্তা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে। ছেলেমেয়ে ছাড়া পরিবারের অন্য কারো দ্বারা কোনো কাজ করাতে ইচ্ছা হলে, নিজের ইচ্ছা জানাবে, না শুনলে রাগারাগি করো না। চিন্তাহীন, পাগল মনের দ্বারা কোনো কাজই হয় না, কাউকে চালানো যায় না।
ছেলেমেয়ে লেখাপড়া শিখল না, সে বদমাইশ ও শয়তান হয়ে উঠেছে, তার জন্য ছেলেমেয়ে অপেক্ষা বাপ-মাই বেশি দায়ী। অনুন্নত ও অশিক্ষিত বাপ-মায়ের ছেলেমেয়ে সাধারণত শিক্ষিত ও বড় হয় না। বাল্যকাল হতেই ছেলেমেয়েগুলি বাপ-মায়ের অদুরদর্শিতা, মানসিক শক্তির অভাবে অবাধ্য ও হীন হয়ে ওঠে। ছেলেমেয়েকে মানুষ ও বড় করে তোলার জন্যে বড় মনের দরকার। মূর্খ বাপ মায়ের ছেলেমেয়েও ভীত হয়।
ছেলেমেয়ের উপর বেশিরকম অত্যাচার করলেই সে মানুষ হয়ে ওঠে না, তার স্বাভাবিক চপলতা দেখে বিশেষ বিরক্ত হবে না। সে হাসুক, খেলা করুক–কী ক্ষতি? দৌড়াক, মাছ ধরুক, গাছে চড়ুক, সে বর্ষাকালে পানির মধ্যে ডুবোডুবি করুক। সে যে খোকা–সে কেবল আনন্দ চিন্তা ও ভাবশূন্য একটা কেমন শক্তি-তার আনন্দ থাকবে না?
অবশ্য বেশি শয়তানি ভালো নয়।
অত্যধিক শাসন-অত্যাচারে ছেলেমেয়ে কালে চরিত্রহীন ও লম্পট হয়ে ওঠে। ছেলেমেয়ের বাপ-মায়ের স্নেহ-মায়া পাপের কথা ভাবতে অবসর পায় না। বাপ-মায়ের কাছে নিরন্তর আঘাত পেলে সে সুখ ও শান্তির জন্য জঘন্য পথের আশ্রয় খোঁজে।
ছেলেমেয়ের বয়স যখন ১৪/১৫ বৎসর তখন তাদের দিয়ে দিবারাত্রি কাজ করাবে, নইলে রক্ষা নেই। এই বয়সে ছেলেমেয়ে গোপন পাপ করতে শেখে। সোনার হৃদয় পাপ কলঙ্কে ছাই হয়ে যায়। তার জীবনীশক্তি নষ্ট হতে থাকে। খবরদার ছেলেমেয়ের সঙ্গে এই সময় কোনো খারাপ ব্যবহার করো না, অশ্রদ্ধা ও উপহাসের সঙ্গে তার দুর্বলতা ও অন্যায় কাজ নিয়ে কোনো আলোচনা বা ভর্ৎসনা করো না। তোমার সহানুভূতি, তোমার গভীর স্নেহ ও পুণ্য শক্তির প্রভাবে সে পাপকে জয় করতে শিখুক।
ছেলেকে ১৪/১৫ বৎসরের সময় কোনো জ্ঞানী মানসিক শক্তিশালী পণ্ডিতের কাছে রাখা ভালো। এই সময় অনবরত দেহ ও মনে কাজ হওয়া দরকার। পড়বে এবং সঙ্গে কাজ করবে, মায়ের সঙ্গে সাংসারিক কাজ করলেও তার সময় কাটে, বাপের সঙ্গে সঙ্গে থাকাও উত্তম।
ছেলে যদি বদনায় করে শিক্ষকের পায়খানার পানি দিয়ে আসে, কোনো ক্ষতি নেই। কাঠ ফাড়া ও মাটি টানা অর্থাৎ কঠিন কাজ করা বড়ই ভালো। বাড়ির পার্শ্বে একটা বাগান থাকা উচিত, যেখানে ছেলেমেয়েরা কাজ করতে পারে। নিজের তৈরি কাজের প্রতি তাদের। মমতা হয়; বাজে পাপ কথা ভাববার সময় পায় না।
পাড়ার কোনো কোনো বদমাইশ ছেলে ছোট শিশুকে কু-পথে নেবার চেষ্টা করে। এমনকি অনেক অবিবাহিত যুবক শিক্ষকেরও এই দোষ থাকতে পারে। যাদের সঙ্গে বয়সের বিশেষ তারতম্য আছে তাদের সঙ্গে ছেলে মেয়েকে মিশতে দেবে না বা একসঙ্গে শুতে দেবে না। এমন কি দুই ভাইকে এক সঙ্গে শুতে দেওয়া ঠিক নয়।
সন্ধ্যার পর ছেলে যেন বাইরে না থাকে, সেজন্যে তাম্বি চাই। সর্বদা ছেলেমেয়েকে চোখে চোখে রাখা দরকার। তবে ছেলেমেয়ে যেন না বুঝতে পারে, তার উপর কড়া পাহারা চলছে, তাকে সন্দেহ করা হচ্ছে, এতে তার বেশি রকম অধঃপতন হতে পারে।
যে জিনিসই ছেলে বাইরে হতে ঘরে আনে, যে বয়সেই হোক, মায়ের হাতে তুলে দিতে তাকে শিক্ষা দেবে। কোনো জিনিস নিয়ে ছেলেমেয়েরা যেন নিজে নিজে কামড়া কামড়ি না করে। সামান্য জিনিস হলেও মাতা ছেলে মেয়ের মধ্যে বণ্টন করে দেবেন।
চিনি, মিছরি, আম, এসব ছেলেমেয়েরা নিজ হাতে নিয়ে যেন না খায়। সব জিনিস মা দেবেন। সামান্য জিনিস বলে অবহেলা করা ঠিক নয়। এর মধ্যে শিক্ষা আছে।
ছেলেমেয়ের সামনে স্বামী স্ত্রীতে ঝগড়া করো না। বাপ ছেলেমেয়েকে কোনো হুকুম দিলে ভালো হোক মন্দ হোক মায়ের চুপ থাকাই উচিত। যখন তখন একটা বিরুদ্ধ কথা বলবে না। এতে ছেলেমেয়ের বাপ-মা কারও উপর শ্রদ্ধা থাকে না। পরী ছেলেমেয়েকে কোনো কথা বললে স্বামীরও কোনো কথা বলা ঠিক নয়।
ছোট শিশুদের হাত-পা ধুয়ে না শোবার, আর মুখ না ধুয়ে খাবার অভ্যাস আছে। পা ধুয়ে বিছানায় যেন তারা না চড়ে। ছেলেমেয়েরা ছোটকালে যার তার কাছে ইচ্ছামতো বেয়ারিং পত্র লেখে। টের পেলেই বকুনি দেবে। বেয়ারিং পত্র লেখা অভদ্রতা। চিঠি-পত্র লেখা দোষের নয় বরং ছেলেমেয়েকে ছোট-বড় আত্মীয়-স্বজনের সংবাদ রাখতে চিঠি লিখে তাদের খোঁজ নিতে উৎসাহ দেওয়া উচিত।
ছেলেমেয়েকে মাঝে মাঝে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে পাঠানো দরকার। নইলে বড় হলে সে প্রাণহীন হয়ে ওঠে। আত্মীয়-বন্ধুর জন্যে তার মনে বেদনা জাগে না।
