সে-বার হয়তো বেশিক্ষণ চিলেকোঠায় থাকে নি। হঠাৎ তার মনে হয়, তবারক ভুইঞা এসেছে। তখন সে দড়িটা লুকিয়ে ফেলে; সেটি ব্যবহার করবার সময় এখনো আসে নি। তবে তাড়াতাড়ি করে লুকিয়ে ফেলেছিল বলে খুঁজে বের করতে পরে কষ্টই হয়েছিল।
হয়তো দড়িটা যখন লুকাবার চেষ্টা করছিল তখনই নেহাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে কলিজাটির কথা মনে পড়েছিল। না, তখন নয়। যখন কলিজাটির চিত্র চোখের সামনে ভেসে ওঠে তখন সে শোবার ঘরে চৌকির ওপর চুপচাপ করে বসে, দৃষ্টি মেঝের। দিকে। বহুদিন আগে গ্রামের একটি মেয়েলোকের কাছে কলিজাটির কথা প্রথম শুনেছিল। মেয়েলোকটি বলত, খোদা কলিজার মতো দেখতে, কলিজার মতোই অবিরত থরথর করে কাঁপে। একবার তার কথা শুনে বড় চাচা বা বাপ খেদমতুল্লা আহত পশুর মতো হুঙ্কার দিয়ে উঠেছিল। তারপর থেকে মেয়েলোকটি গোপনে-গোপনে। তাকে কলিজার কথা বলত, কারণ সে জানত ভয় পেলেও মুহাম্মদ মুস্তফা কলিজাটির কথা অনেক দিন ভুলতে পারে নি এবং কখনো-কখনো সেটি আপনা থেকেই কোত্থেকে। সহসা তার মনশ্চতে এসে দেখা দিয়ে থরথর করে কাঁপত। রঙটা লাল। তবে টাটকা লাল নয়; তাতে যেন কালচে ধরেছে। মানুষের মনে সত্য এবং অসত্য নির্বিবাদে পাশাপাশি বাস করতে পারে একবার যদি উভয়ের অস্তিত্ব গোপন করার কৌশলটা করায়ত্ত করে নেয়া যায়।
কলিজাটি বহুদিন পরে তার মনশ্চক্ষুতে ভেসে ওঠে বলে সে গভীর কৌতূহল বোধ করে, একটু ভয়-ভয়ও করে, এবং শীঘ্র এমনও মনে হয় সেটি যেন বাস্তবরূপ ধারণ করেছে, যেন সত্যি তা দেখতে পাচ্ছে : তার চোখের সামনে শূন্যে ঝুলে থাকা কলিজাটি কাঁপতে থাকে থরথর করে, অশ্রান্তভাবে, নির্দয়ভাবে। নির্দয়ভাবে কারণ সে কলিজার কম্পন কখনো যেন থামবে না, কখনো শান্ত হবে না; সেটি এমনই কিছু যার শেষ নেই, যা অমর।
সে যেন আবার সিঁড়ি ভেঙ্গে চিলেকোঠায় উঠে এসেছে। সে-বারই কি জানালার খড়খড়ি দিয়ে পেছনের বাড়ির উঠানের দিকে তাকিয়েছিল? ঠিক মনে নেই। প্রথমবার যখন সে-বাড়ির উঠানের দিকে তাকায় তখন রোদটা যেন পড়ে এসেছে। হয়তো সে বার দড়ির সন্ধানে ওপরে উঠে এসেছিল। তখনো খাওয়াদাওয়া করে নি, দ্বিপ্রহরের প্রখর রোদ নির্মমভাবে খাঁ খাঁ করছে। দড়িটা খুঁজে পায় নি। পরে একটু বিরক্ত হয়ে খেতে বসে পেছনের বারান্দায়, পাটির ওপর। ঝুঁকে পড়ে দ্রুতভাবে খায়, যেন খাওয়া শেষ হলে দূরে কোথাও যাবে। তাই অন্য দিনের তুলনায় গোগ্রাসে অনেক খায়। প্রথমে পুঁটিমাছগুলি মস্ত মস্ত লোকমার সঙ্গে গলাধঃকরণ করে, তারপর গোস্তের ছালন এবং ডালের সাহায্যে দু-তিন বাসন ভাত খতম করে। খাওয়া শেষ হলে ভরা পেটে বারান্দার প্রান্তে হাতমুখ ধুতে বসে অনেকক্ষণ সে স্তব্ধ হয়ে থাকে, কারণ সহসা বন্ধু তসলিমের চিঠির কথা তার মনে পড়ে। সে-চিঠির জবাব দেয় নি। চিঠির পর একটি তারও এসেছে; তার নীরবতায় বন্ধু তসলিম দু-চার দিনের মধ্যে খবরটা পাবে, তখন সব বুঝতে পারবে সে। হয়তো প্রথমে সে বড় দুঃখত হবে, আফসোসও হবে তার। সে ভাববে, এতদিন এত কষ্ট করে সে পড়াশুনা করেছিল এই জন্যেই কি? পরে সে বুঝবে। তবে তার চিঠি বা টেলিগ্রাম, তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব, এমনকি দেশের বাড়ি আপনজন সবই বহুদূরে মনে হয়; সে যেন কোথায় একটি নদী পেরিয়ে চলে এসেছে সে-সব পেছনে ফেলে।
না, অপরাহ্নের দিকেই চিলেকোঠার জানলার খড়খড়ি দিয়ে পেছনের বাড়ির উঠানের দিকে তাকিয়ে থাকবে। মনে পড়ে, সে-বাড়ির উঠানে তবারক ভুইঞাকে দেখতে পেলে সে ভয়ানকভাবে চমকে উঠেছিল। সে জানত পেছনে কোথাও তবারক ভূইঞা থাকে, কিন্তু তার বাড়ি যে সরকারি বাংলোর পেছনের দেয়াল ঘেঁষেই-তা কখনো ভাবে নি।
উঠানের একধারে নিমগাছের তলে খালি গায়ে হাঁটু পর্যন্ত লুঙ্গি তুলে পায়ের গোড়ালিতে ভর দিয়ে বসে তবারক ভুইঞা কাঠি জাতীয় কিছু দিয়ে নতমাথায় মাটি খুঁড়ছিল। লেপ-জোপা তক্তকে পরিচ্ছন্ন উঠান। ছোটখাটো বাড়িটির ভেতরের বারান্দাও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। বারান্দার প্রান্তে একটি সিঁড়ি, সিঁড়ির পাশে পেতলের বদনা। বদনাটাও মাজাঘষা, ঝকঝকে। ভেতরটা নজরে পড়ে না ঠিক, তবু মনে হয় সেটি স্বচ্ছ পানিতে ভরা। নিঃসন্দেহে সে-পানি উঠানের অন্যধারে কুয়াটি থেকেই এসেছে। কুয়াটি তেমন উঁচু নয়, তবু একপাশে একটা ধাপের মতো। কুয়ার ওপরে একটা বালতি। বালতিটিও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।
পরে সে বাড়ির উঠানে বউটিকে দেখতে পায়। তাকে প্রথমে দেখে নি, তাই বুঝতে পারেনি কোত্থেকে সে এসেছে। মুহাম্মদ মুস্তফার বাড়ির দেয়ালের দিকে আরেকটা ছোট-খাটো ঘর, যার ছাদটাই কেবল নজরে পড়ে। বোধহয় রান্নাঘর। হয়তো সেই রান্নাঘর থেকে বউটা বেরিয়ে এসেছে। সে কি তবারক ভুইঞার স্ত্রী উঠানের মধ্যখানে এসে দাঁড়িয়ে সে থামে, তারপর এধার-ওধারে কিছু যেন খুঁজে হাত তুলে একবার ভোলা চুল ঝাড়ে। পিঠভরা চুল, ভেজা, রোদে তাই চিকচিক করে। এদিকে পেছন দিয়ে দাঁড়িয়ে বলে মুখটা দেখা যায় না, তবে মেয়েটি স্বাস্থ্যবতী, নিটোল দেহের গঠনটা ভালো। পরনে ডোরাকাটা শাড়ি, পা খালি। কী কারণে নিস্পলক দৃষ্টিতে বউটির দিকে মুহাম্মদ মুস্তফা তাকিয়ে থাকে। তারপর ভেতর থেকে একটি বৃদ্ধ মানুষ ধীর পায়ে বেরিয়ে এসে পিড়িতে বসে। তবারক ভুইঞা নড়ে না, কিন্তু মাথায় ঘোমটা টেনে বউটি কোথাও অদৃশ্য হয়ে যায়।
