তারপর থেকে সেদিন মুহাম্মদ মুস্তফা অনেকবার চিলেকোঠায় এসে জানলার খড়খড়ি দিয়ে সে-বাড়ির উঠানের দিকে তাকিয়ে থাকবে। পরে তবারক ভুইঞাকে দেখে নি, কিন্তু বউটিকে বার বার দেখেছে। মেয়েটির গায়ের রঙ উজ্জ্বল শ্যামল, দূর থেকেও কেমন মনে হয় মুখটা মন-খোলা মুখ। দ্রুতপায়ে হাঁটে, কিন্তু যখন দাঁড়ায় তখন এক পায়ে ভর করে দাঁড়ায় বলে মাজার এক পাশে খাজ পড়ে, দেহটা একটু বেঁকে যায়। তবে সে যেন সদা কর্মব্যস্ত। এই এসে উঠানে দেখা দেয়, এই আবার অদৃশ্য হয়ে যায় রান্নাঘরে বা বাসঘরে, আবার বেরিয়ে এসে কুয়ার ধারে যায়। যেন উদ্দেশ্যহীন ভাবেই ঘুরে বেড়ায়। তবে তেমনটা মনে হয় কারণ মুহাম্মদ মুস্তফা দেখতে পায় না বা বুঝতে পারে না কেন সে ঘোরাঘুরি করে। উদ্দেশ্য থাকলেও সে-উদ্দেশ্য কী তা জানবার জন্যে কোনো কৌতূহল বোধ করে না সে, মেয়েটির আসা-যাওয়াই সে কেবল লক্ষ্য করে দেখে। যখন মেয়েটিকে দেখতে পায় না তখন সে নিরাশ বোধ করে : সে অপেক্ষা করে। তাছাড়া তাকে দেখতে না পেলেও মনে হয় সে যেন অদৃশ্য হয়ে যায় নি, উঠানে, বাড়ির বারান্দায়, কুয়ার পাশে, নিমগাছের তলে-সর্বত্র তার স্পর্শ।
পরে একবার মনে হয়েছিল, পেছনের বাড়ির উঠানে ডোরাকাটা শাড়ি-পরা মেয়েটিকে দেখার পর একবারও সে চিলেকোঠার জানলা থেকে নড়ে নি। হয়তো ধারণাটি ভুল নয়। বউটির আকর্ষণেই সে যে অমনি করে জানলার পাশে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে ছিল তা ঠিক নয়, নিঃসন্দেহে প্রতিবেশীর বাড়ির তক্তকে উঠানে, ছোট কুয়াটিতে, নিমগাছের ছায়ায়, রান্নাঘরের ছাদে, এমনকি বারান্দায় পিড়ি-বদনায় সে এমন কিছু দেখতে পেয়েছিল যা তাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে থাকবে। সে জন্যে জানলা থেকে সে নড়তে পারে নি। হয়তো তাও সত্য নয়। সত্য এই যে, চিলেকোঠার জানলা দিয়ে একবার বাইরের দিকে তাকাবার পর যে-অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে সে দাঁড়িয়েছিল সে-ঘরের দিকে দৃষ্টি দিতে তার মন চায় নি। এবং সে-জন্যে নিদারুণ সিদ্ধান্তটি কার্যকরী করার চেষ্টায় বিলম্বও হয়েছিল।
তারপর কখন উঠানটি সহসা চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার কথা মনে পড়ে। রাত হয়েছে তা প্রথমে সে বুঝতে পারে নি কারণ ধীরে-ধীরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসা, লেপাজোকা তকতকে উঠানে ছায়া জমে ওঠা-এ-সব লক্ষ্য করে নি। বিহ্বলতা কাটলে সে ভাবে, তবে রাত্রি নেবেছে, যে-রাত এমনিভাবে অন্যত্রও নেবেছে : তার দেশের বাড়ির সামনে ধানক্ষেতে, দূরে শান্ত খালটিতে, আরো দূরে চাঁদবরণঘাটের পাশে বড় নদীর বুকে। অকারণে এ-সময়ে মা আমেনা খাতুনের কথাও একবার তার মনে পড়ে, যার কথা কদাচিৎ মনে হয় তার মাতা-পুত্রের মধ্যে যদি স্নেহের ধারা প্রবাহিত হয়ে থাকে সে-ধারা ভূমিগর্ভস্থ ধারা মতোই অদৃশ্য-তা চোখে দেখা যায় না, তার কলতানও কানে পৌঁছায় না। তবে সে-ধারাটি দৃশ্যমান হলেও কয়েক মুহূর্তের জন্যেই হয় কেবল।
কখন চিলেকোঠা থেকে নেবে এসেছিল মনে নেই, যদিও চিলেকোঠা থেকে অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে নেবে আসতে কিছু কষ্ট হয়ে থাকবে। যা মনে পড়ে তা এই : লণ্ঠনের পলতেটা উঁচিয়ে আলোটা বাড়িয়ে শোবার-ঘর এবং ভেতরের বারান্দার চৌকাঠের পাশে লণ্ঠনটি স্থাপন করে চৌকিতে এসে বসেছে, দৃষ্টি মেঝের দিকে। তবে দৃষ্টি মেঝের দিকে হলেও কলিজাটি সে সুস্পষ্টভাবেই দেখতে পাচ্ছে : কলিজাটি কাঁপছে থরথর করে, আগের মতোই অশান্তভাবে, তবে আগের চেয়ে আরো জোরে। কিছুক্ষণ চৌকির ওপর স্থির হয়ে বসে থাকার পর সে বুঝতে পারে কলিজাটির মতো চৌকিটিও যেন কাঁপতে শুরু করেছে, প্রথমে মৃদুভাবে, তারপর প্রবলভাবে।
চৌকিটা অবশেষে স্থির হয়। এবার সে ঘরের চতুর্দিকে দৃষ্টি দেয়, যেন সে-ঘর এবং সে-ঘরের জিনিসপত্র আগে দেখে নি। ঘরে বিশেষ কিছু নেই। চৌকিটা ছাড়া আসবাবপত্রের মধ্যে একটি ছোট টেবিল, ওধারে একটি আলনা যেখান থেকে কিছু কাপড়চোপড় ঝোলে। আলনার কাছে একজোড়া ইংরেজি জুতা। জুতাজোড়াটি নৃতন, কুমুরডাঙ্গায় আসার কিছুদিন আগে কিনেছিল, এখনো তা পরে হাঁটলে পায়ের গোড়ালির পেছনে ব্যথা করে। জুতাজোড়ার পাশে একটি গাঢ় খয়েরি রঙের চামড়ার সুটকেস। সেটিও নূতন। তার ভেতরে কী, সে জানে। একটি চারখানা নকশার লুঙ্গি, একটি শার্ট, একটি সবুজ রঙের আলোয়ান, এবং দু-একটা পুরাতন বই। একটি বই বেশ পুরাতন। সেটি ইংরেজি অভিধান, অনেকদিনের সম্পত্তি। মলাট ছেঁড়া, প্রথম দু-চারটি পাতা কবে কোথায় হারিয়ে গিয়েছে। তবে এখনো মনে পড়ে, একদিন অভিধানটির প্রথম কি দ্বিতীয় পাতায় সে একটি লম্বা ধরনের নাম সযত্নে বড় বড় অক্ষরে লিখেছিল। তার পিতৃদত্ত নাম মুহাম্মদ মুস্তফা, তবে সে যখন নবম শ্রেণীতে উঠছে তখন ঝোঁকের মাথায় নিজের নামে বাহার তুলে বই-খাতাপত্রে লিখতে শুরু করে : চৌধুরী আবু তালেব মুহাম্মদ মুস্তফা। তারা চৌধুরী নয়, আরবি শব্দ নিয়ে খেলা করার পাণ্ডিত্যও তার নেই, তাছাড়া এ-ও তার অজানা ছিল না যে অনেকে নামের দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে নিজের দাম বৃদ্ধির চেষ্টা করলেও মানুষ আবার যা অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত তা দ্বিরুক্তি না করে প্রত্যাখ্যান করে বলে লম্বা নামধারী লোকেরা অতি সংক্ষিপ্ত, এমনকি দুদু মিঞা সোনা মিঞা এ-সব বাল্যকালের হাস্যকর উপনামেই পরিচিত হয়ে সমস্ত জীবন অতিবাহিত করে। তবে তাতে সে দমিত হয়নি।
