এমনিতে দরিদ্র নিঃস্ব মানুষেরা দু-দিনে আরো দরিদ্র নিঃস্ব হয়ে পড়ে, তাদের নানা প্রকারের মূল্যবান অমূল্যবান দরকারি-বেদরকারি জিনিস মুরণোন্মুখ নদীর বুকে আশ্রয় গ্রহণ করে চিরতরে, অর্থহীনভাবে।
সহসা মুহাম্মদ মুস্তফার মনে এই বিশ্বাস জন্মে যে খোদেজা একটি প্রতিহিংসা পরায়ণ আত্মায় পরিণিত হয়েছে যে-আত্মা সারা জীবন তাকে পদে-পদে অনুসরণ করবে, অদৃশ্যভাবে, ছায়ার মধ্যে মিশে থেকে, হয়তো-বা তাকে এক সময়ে ধ্বংসও করবে। সেদিন রাতে সে যখন তন্দ্রাহীন চোখে বারান্দায় বসে ছিল তখন খোদেজারই উপস্থিতি অনুভব করেছিল। ভয়টাও তখন জেগেছিল-এমন ভয় যা মানুষের চোখের সামনে থেকে অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ সমস্ত কিছু নিমেষে নিশ্চিহ্ন করে দেয়।
প্রথমে মুহাম্মদ মুস্তফা বুঝে উঠতে পারে না কী করবে সে। প্রতিহিংসাপরায়ণ আত্মার বিরুদ্ধে কীই-বা করতে পারে মানুষ? জীবিত মানুষকে বোঝানো যায়, অন্যায় অবিচার করলে তার কাছে মাফ চাওয়া যায়, ক্ষতিপূরণ খেসারত দেয়া যায় তাকে, কিন্তু যে কায়াহীন আত্মায় পরিণত হয়েছে তার কাছে কী করে মাফ চাওয়া যায়, কী করেই বা ক্ষতিপূরণ-খেসারত পৌঁছানো যায়? জীবন্ত মানুষের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করাও সম্ভব কারণ তার শক্তি যতই দুর্দান্ত হোক-না কেন সে-শক্তি তার দেহের মধ্যে সীমাবদ্ধ, কিন্তু দেহহীন আত্মার শক্তির সীমা নেই। তার হাত থেকে নিস্তার পাওয়া দুষ্কর।
দু-দিন পরে মুহাম্মদ মুস্তফা একটি ভয়ানক সিদ্ধান্ত নেয়। সেদিন হয়তো রবিবার ছিল, হয়তো সে আপিসে যায় নি। সেদিনের কথা কিছু কিছু তার মনে পড়ে, কিছু কিছু একেবারেই মনে পড়ে না। এ-কথা বেশ মনে পড়ে, তবারক ভুইঞা বার বার এসেছিল সেদিন। হয়তো তার মনে কেমন একটা সন্দেহ দেখা দিয়েছিল, এবং সে-জন্যে তার কৌতূহলও অদম্য হয়ে উঠেছিল। তবে তার কৌতূহল মুহাম্মদ মুস্তফাকে আর বিচলিত করত না। অন্য একটি অদৃশ্য দৃষ্টি কি সর্বক্ষণ তার ওপর নিবদ্ধ নয়, তার পদক্ষেপ কেই কি লক্ষ্য করে দেখে না প্রতিমূহুর্তে? শুধু তার প্রত্যেক বাহ্যিক আচরণ কার্যকলাপ নয়, মনের ক্ষীণতম আন্দোলন অস্কুট বাসনা-কামনাও সেই নিরন্তর দৃষ্টির হাত থেকে নিস্তর পায় না। সে-দৃষ্টির তুলনায় তবারক ভুইঞার দৃষ্টি তেমন কিছু নয়। তাছাড়া কতখানিই-বা সে দেখতে পায়? তার কৌতূহল অস্বাভাবিকও মনে হয় না। অপরাধী তার অপরাধ স্বীকার করবে কিনা এবং স্বীকার করবার পর তার মনে অনুতাপ অনুশোচনা বা ভীতি দেখা দেবে কিনা-এ-সব বিসয়ে কৌতূহল স্বাভাবিক। সাক্ষ্য প্রমাণের সাহায্যে বিচারক অপরাধীর অপরাধ সাব্যস্ত করে কেবল, অপরাধী তার মনের নিভৃতে অপরাধ স্বীকার করেছে কিনা, তার জন্যে অনুতপ্ত বা ভীত হয়েছে কিনা-সে জন্যে তার কৌতূহল নেই কারণ সে-সবের ওপর অপরাধ বা শাস্তির কমতি-বাড়তি নির্ভর করে না। কিন্তু সে-সবে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। বস্তুত সে আরো কিছু জানতে চায়। অনুতাপ, অনুশোচনা বা ভীতির কি একটি পরিণতি নেই? মেঘ জমলে বর্ষণ হয়, বীজ রোপণ করলে গাছ হয়, বাঁধ ভাঙ্গলে ধরে-রাখা পানি নিঃসৃত হয়; অনুতাপ অনুশোচনা ভীতিরও পরিণতি থাকে। তবারক ভুইঞা জানতে চায় এবার মুহাম্মদ মুস্তফা কী করবে, তার অনুতাপ অনুশোচনা বা ভীতি তাকে কোথায় নিয়ে যাবে। কিন্তু শুধু সে নয়, অদৃশ্য দৃষ্টিও সে-সব জানতে চায়। তবারক ভুইঞা তাকে বিচলিত করবে কেন? তাছাড়া একবার রঙ্গমঞ্চে নাবলে দর্শক সম্বন্ধে অভিনেতা আর তেমন সচেতন থাকে না : দর্শক তখন ছায়ার মতো অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবারক ভুইঞা ছায়ার মতো কোথাও দেখা দিলেও তার বিষয়ে সে আর তেমন সচেতন হত না।
এক সময়ে মুহাম্মদ মুস্তফা বোধ হয় ঘুরঘুর করতে শুরু করে-এ-ঘরে, সে-ঘরে বারান্দায়। যে-কাজ করবার জন্যে মনস্থির করেছে তার জন্যে উপযুক্ত একটি জায়গা খুঁজছিল নিশ্চয়। এ-জীবনে সব কিছুর জন্যেই প্রথমে উপযুক্ত জায়গা ঠিক করতে হয় : কোথায় পুকুর খনন করতে হবে, কোথায় চারা লাগাতে হবে, কোথায় একটি শিশুর জন্ম হবে, কোথায় ঘর-সংসার পাতবে, কোথায় অন্তিম শয্যায় শায়িত হবে। তবে নিচের কোনো ঘর হয়তো পছন্দ হয় নি, কারণ সিঁড়ি ভেঙ্গে সে ওপরে চিলেকোঠায় উঠে আসে। খড়খড়ি-দেয়া অন্ধকারাচ্ছন্ন চিলেকোঠায় সে কতক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে চতুর্দিকে দৃষ্টি দেয়। ঘরটি নোংরা। মেঝেতে ছড়ানো কাগজপত্র, অনেকদিনের সঞ্চিত ধুলা, পাখির বিষ্ঠা বা পরিত্যক্ত পালক, এক কোণে কবে কার ছেড়ে যাওয়া অতিশয় পুরাতন ছেঁড়া জীর্ণ একটি তোশক। দেয়ালে দরজায় আগের বাসিন্দাদের ছেলে মেয়েদের কাঁচাহাতের হিজিবিজি লিখন, একটি মানুষের নকশা: গোলাকার মুখে মস্ত দুটি চোখ, নাকের দুটি ছিদ্র চোখের চেয়েও বড়, হাত-পা কিন্তু চারটি রেখা টেনে কোনো মতে শেষ করা। ঘরের অন্ধকারে চোখ অভ্যস্ত হলে এ-সব সে ধীরে-ধীরে দেখতে পায়।
চিলেকোঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে এমন সময়ে মুহাম্মদ মুস্তফা সহসা খোদেজার উপস্থিতি সম্বন্ধে সচেতন হয়। রাতদিনই সে তাকে অনুসরণ করে। এবারও তাকে অনুসরণ করে ওপরে উঠে এসেছে এবং পেছনে কোথাও ছায়ার মতো নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে তাকে চেয়ে-চেয়ে দেখছে। একটু পরে সে চুড়ির ঝঙ্কারও শুনতে পায়, এবং সে আওয়াজ তেমন সুস্পষ্ট না হলেও তার শিরদাঁড়া শীতল হয়ে ওঠে। একবার ইচ্ছা হয় পেছনে তাকিয়ে দেখে, কিন্তু না-নড়ে সে পূর্ববৎ স্থির হয়ে থাকে। তবে না-তাকালেও সে খোদেজাকে যেন দেখতে পায়, যদিও তেমন পরিষ্কারভাবে নয়। তাছাড়া তার মুখটি যেন মোক্তার মোছলেহউদ্দিনের মেয়ের মতো-যাকে সেদিন পথে দেখেছিল। হয়তো সে-জন্যে সহসা ক্ষণকালের জন্যে কী-একটা ভাবে সে অভিভূত হয়ে পড়ে, কারণ তার মনে হয় খোদেজার মৃত্যু হয় নি, পথে-দেখা মেয়েটির মতোই সে জীবিত। তারপর ভাবে : খোদেজা তাকে দেখছে দেখুক। সে কি একটি ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত নেয় নি? একসময়ে খোদেজা দেখতে পাবে, মনভরে প্রাণভরে দেখতে পাবে। সে সুস্থির হয়।
