ঝোঁকের মাথায়, কী করছি তা না বুঝে খোদেজার সামনে উপস্থিত হলেও কয়েক মুহূর্ত কেমন নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তারপর কিছু বলেছিলাম। কী বলেছিলাম তা মনে নেই। হয়তো বলেছিলাম, আর কেঁদো না, ঘরে চলো। আমার কণ্ঠস্বর শুনে খোদেজা সহসা মাথা তুলে আমার দিকে তাকিয়েছিল।
সে-সময়েই বুঝেছিলাম। কখনো অতি সাধারণ কথা বুঝতে মানুষের কষ্ট হয়, আবার কখনো একটি বেশ দুর্বোধ্য কথা কী-কারণে নিমেষেই বুঝে ফেলে। তার জন্যে এক পলকের দৃষ্টি, ক্ষুদ্র একটি দীর্ঘশ্বাস, ঈষৎ একটি মুখভঙ্গিই যথেষ্ট। হয়তো বুঝতে পেরেছিলাম অন্য একটি কারণে। বাল্যকাল অবধি আমিও কি খোদেজার প্রতি একটা বিশেষ স্নেহমমতা অনুভব করতাম না?
আমরা কখনো অন্যায়জনক কিছু করি নি। বস্তুত, তার দিকে তাকাতে আমার সাহসও হত না। সে উঠান দিয়ে যাচ্ছে বা কিছু করছে-তা কী করে জানতাম, তাকাতাম না। এ-ও জানতাম, না তাকিয়ে খোদেজাও জানে আমি কোথায়, কী করছি। বাড়ি থেকে কোথাও গেলে বুকটা কেমন করত, তবে কী একটা তৃপ্তিই পেতাম এই নিশ্চিত জ্ঞানে যে, আমি বাড়ি নেই বলে সে সুখী নয়। পরে বাড়ি ফেরবার জন্যে অধীর হয়ে পড়তাম এবং বাড়ি ফিরলে কী করে বুঝতে পেতাম সে-ও আমার প্রত্যাবর্তনের জন্যে অধীরভাবে প্রতীক্ষা করেছিল। আমি প্রতিশ্রুতিটির কথাও কখনো ভুলতে পারতাম না; হয়তো প্রতিশ্রুতিটি কেবল আমার মনেই মহাসত্যের রূপে বিরাজ করত। ভাবতাম, মুহাম্মদ মুস্তফা খোদেজার প্রতি উদাসীন হলেও যথাসময়ে তাকে বিয়ে করবে, উপযুক্ত সময়ে যা তার প্রাপ্য তা দাবি করবে। তাদের একদিন বিয়ে হবে না তা যেমন ভাবতাম, তেমন চাইতামও না।
মুহাম্মদ মুস্তফার উদাসীনতার কথা ভালোভাবে জানলেও মধ্যে-মধ্যে খোদেজার বিষয়ে একটি সন্দেহ জাগত মনে। বাগদত্তা মেয়ের মনের কথা কি বলা সহজ? হয়তো সে মুহাম্মদ মুস্তফার প্রতি গোপনে-গোপনে কী একটা ভাব পোষণ করে যা ছেলেখেলার জিনিস নয়, যা অন্তঃসলিলার মতো অদৃশ্য। তবে তার মৃত্যুর মাসকয়েক পূর্বে খোদেজা কিছু বলে যার পর বুঝতে পারি সে-ধারণাটিও অহেতুক।
তখন অগ্রহায়ণ মাস, কাটা-ধান মাড়ানো-ধানের গন্ধে বাড়ি-ঘর মাঠ-ক্ষেত মাতোয়ারা। সেদিন সন্ধ্যায় পেছনের পুকুরের পাড় দিয়ে ঘরে ফিরছিলাম, এমন সময়ে কাঁচের চুড়ির মৃদু ঝঙ্কার শুনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ি। দেখি, খোদেজা। অনুচ্চ, বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করি, কী করছ এখানে?
ততক্ষণে নিজেই বুঝে ফেলেছিলাম যে গতকাল থেকে যে-সাদা মুরগিটি অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে সে-মুরগিটি খুঁজতে এসেছে পুকুরের পাড়ে। সেখানে বুনো ফুলের বন, কিছু ঝোপঝাড়। তার বিশ্বাস বন-ঝোপঝাড়েই মুরগিটি লুকিয়ে রয়েছে কিসের ভয়ে। আমিও একটু খুঁজে দেখি, কিন্তু কোথায় মুরগি? বলি, শেয়ালে খেয়েছে।
হঠাৎ খোদেজা হাতে মুখ ঢেকে একটু শব্দ না-করে কাঁদতে শুরু করে। আমি কয়েক মুহূর্ত অপ্রস্তুতভাবে দাঁড়িয়ে থাকি, তারপর সহসা কী যেন ঘটে। হয়তো শীতের সন্ধ্যার গন্ধ নাকে এসে লাগলে মনে কী-একটা ভাবের সৃষ্টি হয়, হয়তো আবছা অন্ধকারের মধ্যে অদৃশ্য-হয়ে-যাওয়া মুরগির ব্যথায় ব্যথিত মেয়েটির জন্যে বুকে বেদনা বোধ করি বা বাড়ির এত কাছে হলেও নির্জন পুকুরের পাড়ে সহসা মনে হয় খোদেজা এবং আমি ছাড়া সমগ্র দুনিয়ায় কেউ কোথাও নেই। হঠাৎ তার হাত ধরে তাকে প্রবোধ দেবার চেষ্টা করি, কিন্তু নিজেই সহসা কী-একটা উত্তাল ভাবে বিহ্বল হয়ে পড়ি। খোদেজাও এবার অসংযতভাবে কাঁদতে শুরু করে। এবারও কান্নার আওয়াজ শোনা যায় না, তার মুখও দেখা যায় না, কেবল সমগ্র দেহে সে থরথর করে কাঁপতে থাকে।
তারপর কথাটি বলে। প্রথমে বুঝতে পারি নি, তার মুখের শব্দ তার কান্না এবং দেহ-কম্পনের মধ্যে কেমন হারিয়ে গিয়েছিল।
কী বললে?
মুস্তফা ভাইকে বড় ভয় করে।
আমি বড় বিস্মিত হই : সাদা রঙের অদৃশ্য-হয়ে-যাওয়া মুরগি এবং মুহাম্মদ মুস্তফা তার মনে যে-ভাব জাগায়, এ-দুটির মধ্যে কী সম্বন্ধ? তারপর মনে হয়, যা বলেছে তা নয়, অন্য কোনো কথা আমাকে জানানো তার উদ্দেশ্য, কারণ মুহাম্মদ মুস্তফাকে ভয় করার কোনো কারণ নেই। ধরা গরায় জিজ্ঞাসা করি,
আমাকে ভয় করে না?
সজোরে মাথা নেড়ে সে উত্তর দেয়, না।
অনেক কথা হয়তো তাকে জিজ্ঞাসা করার বা বলার বাসনা জেগেছিল তখন, তবে আমি নির্বাকভাবে প্রস্তরবৎ মূর্তির মতো নিথর হয়ে থাকি, শুধু কোথাও কিছু ভয়ানকভাবে বাড়ি খেতে থাকে। হয়তো বুকচাপা কথা, হয়তো হৃৎপিণ্ড-কে জানে। গভীর নীরবতার মধ্যে পুকুরে কী-একটা শ্রান্ত মাছ ঘাই দেয়।
তারপর বলি, যাও। ভয় হয়, কখন কেউ এসে পড়বে।
খোদেজা চলে গেলে বাড়িতে না-ঢুকে পুকুরের ওপারে গিয়ে অনেকক্ষণ তেঁতুল গাছের নিচে বসে থাকি। যখন উঠি তখন টুপটুপ করে শিশির ঝরতে শুরু করেছে।
খোদেজা মুহাম্মদ মুস্তফার জন্যে আত্মহত্যা করেছে-তেমন কথা কী করে আমি বিশ্বাস করি?
অথচ সে-কথাই মুহাম্মদ মুস্তফার সহসা সত্য বলে মনে হয়, বিদ্রি চোখে রাত কাটাবার পর সকালের দিকে তাতেই তার বিশ্বাস জন্মে।
পরদিন সে বড় বিষণ্ণ বোধ করে, কী-একটা অস্থিরতাও তাকে থেকে-থেকে নিপীড়িত করে। তার মনে হয়, বাড়ির লোকদের কথাটি অস্বীকার করার সত্যি আর কোনো উপায় নেই। কী করে অস্বীকার করে তাদের কথা প্রথমত, একজোট হয়ে সকলে একটি সম্পূর্ণভাবে মিথ্যা কাহিনী রচনা করেছে তা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, এও সম্ভব নয় যে মেয়েটি যতই গোপনকারী হোক না কেন, যারা রাতদিন তার সঙ্গে বসবাস করেছে তারা তার মনের কথা ঘুর্ণাক্ষরেও জানতে পারে নি। বস্তুত মুহাম্মদ মুস্তফা কিছু লক্ষ্য না করলেও তারা সব লক্ষ্য করেছিল, সব জানতে পেরেছিল। মেয়েটি যে প্রতিশ্রুতির কথা ভোলে নি শুধু তাই নয়, তাতে সমস্ত আস্থা-ভরসা স্থাপন করেছিল। মানুষের মন অবুঝ। পিতৃহীনা, আশ্রিতা মেয়েটির সমস্ত আশা আকাঙ্ক্ষা, সব স্বপ্ন স্নেহমমতা পরজীবী উদ্ভিদের মতো মুহাম্মদ মুস্তফাকে ঘিরে গজিয়ে উঠেছিল, তাকে জড়িয়েই বেঁচেছিল, সে মুহাম্মদ মুস্তফার যোগ্য কিনা বা মুহাম্মদ মুস্তফার মনে তার প্রতি কোন স্নেহমমতা ছিল কিনা-সে-সব প্রশ্ন একবারও তার মনে জাগে নি। সরলমনা মানুষ কিছুতে একবার বিশ্বাস করলে সে-বিশ্বাসে কোনো প্রশ্নের ক্ষীণতম তরঙ্গও জাগে না; সে-বিশাস নিরেট, নিশ্চিদ্র।
