অনেক কথা সহজে সে বুঝতে সক্ষম হয়। বাড়ির লোকেরা যা লক্ষ্য করেছিল বা জানতে পেরেছিল-তা সে লক্ষ্য করে নি কেন, জানতে পারে নি কেন? কারণটা আর কিছু নয় : সে লক্ষ্য করতে চায় নি, জানতে চায় নি, ইচ্ছা করেই চোখ বুজেছিল সে। মেয়েটির দিকে কখনো তাকায় নি এই ভয়ে যে তার চোখে অনুচ্চারিত বিশ্বাসটি দেখতে পাবে, স্নেহমমতার আভাস নজরে পড়বে। প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করতে সাহস পায় নি এই কারণে যে সে জানত প্রতিশ্রুতিটি কখনো রক্ষা করবে না। তবে হয়তো সে-বিষয়ে একেবারে নিশ্চিন্ত হতে পারে নি। সেজন্যে বাড়ি আসবার সময় প্রতিবার খোদেজার জন্যে সে টুকিটাকি জিনিস নিয়ে আসত যেন প্রতিশ্রুতির কথা সে ভোলে নি, যথাসময়ে তা রক্ষা করবে। তাই প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করত না-তা সত্য নয়। তবে স্মরণ করত এ-জন্যে যে কীভাবে তা ভাঙ্গতে পারে, কী করে তার হাত থেকে নিস্তার পেতে পারে-এসব নিয়ে তার চিন্তার অবধি ছিল না। তেমনি খোদেজার দিকে কখনো তাকাত না-তা-ও সত্য নয়। সে তাকাত, তবে তাকাত স্নেহমমতা নিয়ে নয়, কোনো আকাক্ষা নিয়ে নয়, শুধু এ-বিষয়ে নিশ্চিন্ত হবার জন্যে যে অশিক্ষিতা গ্রাম্য মেয়েটি সত্যি তার জীবন-সঙ্গিনী হবার যোগ্য নয়; তার অযোগ্যতা সমন্ধে দৃঢ়নিশ্চয় হবার জন্যেই মধ্যে-মধ্যে চকিতে আড়চোখে তার দিকে দৃষ্টি দিত, এবং অযোগ্যতা সন্ধান করত বলে তার অগোচরেই সর্বপ্রকার দোষঘাট দেখতে পেত হয়তো খোদেজার মধ্যে।
মুহাম্মদ মুস্তফার মনে হয়, সবকিছুই সে সহসা বুঝতে পেরেছে।
শ্রোতাদের মধ্যে কেউ সহসা জিজ্ঞাসা করে, আপনি নিজের কানে কিছু শুনেছিলেন?
তবারক ভুইঞা উত্তর দিতে ঈষৎ দ্বিধা করে, তারপর বলে, না, আমি নিজে কিছু শুনি নি। তবে অনেকের সত্যিই মনে হয়েছিল তারা কিছু শুনতে পায়। একটু থেমে সে আবার বলে, কিন্তু কানে শোনাই কি বড় কথা?
তারপর কী হয়েছিল? লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করে।
উকিল কফিলউদ্দিনই গোলমাল বাধায়।
একদিন উকিল কফিলউদ্দিন স্থির করে, তার পক্ষে কুমুরডাঙ্গায় বাস করা আর সম্ভব নয়। তার মনে হয়, যে-শহরে আজীবন বসবাস করেছে সে-শহরই যেন তার সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। অথচ একদিন কত-না আশা-ভরসা নিয়ে এই শহরে ওকালতি শুরু করেছিল। তারপর কঠিন শ্রম-অধ্যবসায়ের ফলে ধীরে-ধীরে পেশায় নাম-যশ করতে সক্ষম হয়, সমাজের শীষেও একটি বিশেষ স্থান দখল করে। সে-সময়ে এই আশাটিও দেখা দেয় যে একদিন কুমুরডাঙ্গারও উন্নতি হবে, সুনাম হবে। হয়তো আশাটি একেবারে নিঃস্বার্থ ছিল তা নয়, কিন্তু একটি মানুষ যে-স্থান তার কৃতকার্যতার পটভূমি বলে গ্রহণ করে নেয় তার জন্যে সে-স্থান কি অনেকটা আত্মীয়স্বজনের মতো নয়? একটি মানুষের কৃতকার্যতা যতই চমকপ্রদ হোক-না কেন, আত্মীয় স্বজন দারিদ্র বা বিফলতার মধ্য নিমজ্জিত হয়ে থাকলে তার কৃতকার্যতা সম্পূর্ণ হয় না, বরঞ্চ তা তাদের অসার্থকতায় নিয়ত ছায়াচ্ছন্ন হয়ে থাকে। অকৃতকার্য আত্মীয় স্বজন কৃতকার্য মানুষের সম্মান রক্ষা করতে পারে না। যেমন মাটির ভোজনপাত্র মোঘলাই খানার মর্যাদা দিতে পারে না। তবে কারণ যাই হোক, কুমুরডাঙ্গা শহরের উন্নতির জন্যে আগ্রহ-উদ্যম-সহকারে সে কত কিছু-না করেছে। তারই উদ্যোগে শহরে মিনারগম্বুজ শোভিত সুদৃশ্য একটি মসজিদ উঠেছে, মেয়েদের জন্যে একটি মাইনর স্কুল বসেছে, কাছারি-আদালতের সামনে একটি ক্লাব-ঘরের পত্তন হয়েছে যেখানে শহরের শিক্ষিত সম্প্রদায় সন্ধ্যার পর তাস দাবা খেলে গল্পগুজব করে সংবাদপত্র-মাসিকপত্র নেড়েচেড়ে সময় কাটাতে পারে। সে-ই খেলাধুলার প্রতি শহরবাসীদের মন আকৃষ্ট করেছে এবং মরহুম ওয়ালেদের নামে যে-ফুটবল টুর্নামেন্টের প্রচলন করেছে তাতে প্রতিবছর আশেপাশের নানা জায়গা থেকে বিভিন্ন খেলোয়াড় দল এসে সোৎসাহে যোগদান করে। এ-অঞ্চলে প্রতি বছর মড়ক লেগে গৃহপালিত জীবজন্তু পালে-পালে ধ্বংস হত। সে-ই সরকারের কাছে জোরদার দাবি জানিয়ে কুমুরডাঙ্গায় পুশু-ডাক্তারের ব্যবস্থা করেছে। তবে এ-সব নয়, যা নিয়ে সত্যি সে গর্ব করতে পারে তা এই যে, তারই কড়া দৃষ্টির জন্যে শহরের নৈতিক চরিত্রের যেমন উন্নতি হয়েছে তেমনি সর্বপ্রকারের অনাচার-অনিয়ম শাসনে থেকেছে। কোনো সরকারি ডাক্তার বা দারোগা উৎকোচ-গ্রহণের ঈষৎ দুর্বলতা দেখাবামাত্র সে কুমুরডাঙ্গা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে, কোনো হাকিম-মুনসেফের ন্যায়জ্ঞান বা নিরপেক্ষতা আদর্শনীয় মনে না-হলে সে-ও এ শহরে বেশিদিন টিকতে পারে নি। তবে এত কিছু করেও একটি জিনিস উকিল কফিলউদ্দিন ঠেকিয়ে রাখতে সক্ষম হয় নিঃ কুমুরডাঙ্গার অবনতি। তার চোখের সামনে ধীরে-ধীরে অনিবার্যভাবে শহরটি কেমন নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। হয়তো একবার কোনো শহরের ভিতে ঘুণ ধরলে ফুটবল খেলে স্কুল-ক্লাব বসিয়ে অবনতির মারাত্মক কীটের ক্রম-অগ্রসর ঠেকিয়ে রাখা যায় না। তবু সে কখনো আশা ছাড়ে নি, চতুর্দিকে অবনতির স্পষ্ট প্রমাণ দেখতে পেলেও এই দৃঢ়বিশ্বাসে দিন কাটিয়েছে যে কোনো অত্যাশ্চর্য উপায়ে শহরটি সহসা জীবিত হয়ে উঠবে, তার ভাটা-পড়া স্রোতে জোয়ার আসবে, কোনো যাদু-যষ্টির স্পর্শে রূপকথার ঘুমন্তপুরীর মতো অকস্মাৎ জেগে উঠবে। সে-সব কিছু হয় নি, বরঞ্চ যে-টুকু অবশিষ্ট ছিল তা-ও শেষ হয়েছে এবং কুমুরডাঙ্গা এবার যেন মধ্যযুগে প্রত্যাবর্তন করেছে। এমন শহরে যশ-সুনামের মূল্য কী, সার্থকতারই-বা অর্থ কী?
