তবে সে-সময়ে আরেকটি কথাও বুঝতে পারি যা আমাকে বড় বিস্মিত করে। হয়তো আসলে সে জন্যেই খোদেজা যে মুহাম্মদ মুস্তফার জন্যে আত্মহত্যা করেছিল তা কখনো বিশ্বাস করতে পারি নি।
তখন ভরা গ্রীষ্ম, মুহাম্মদ মুস্তফা ছুটি উপলক্ষে বাড়ি এসেছে। সে-সময়ে আর্থিক সমস্যায় বাপজান বড় ব্ৰিত, তার ওপর গ্রামের ছদ্র শেখ নামক সমবয়সী একটি লোক বেশ পয়সার গরম দেখাতে শুরু করলে হিংসা বা ব্যর্থতাবোধের দরুন তার মনে সুখ ছিল না। কোনো প্রকারের সমস্যা-বিপত্তির সম্মুখীন হলে বাপজানের মেজাজ তিরিক্ষি ধরনের হয়ে ওঠে, খেদমতুল্লার মৃত্যুর পূর্বে কয়েক বছর ধরে যে নিদারুণ মেজাজ তার চরিত্রগত হয়ে পড়েছিল অনেকটা সে-রকম হয়ে ওঠে বাপজানের মেজাজ। তখন পান থেকে চুন খসলে সে খড়গহস্ত হয়ে ওঠে, নির্দোষীর সরল চেহারাও তার সহ্য হয় না, কেউ সামনে এলে ধমক খায়, আড়ালে গেলেও রেহাই পায় না। বস্তুত তার দাপটে হুঙ্কারে-তর্জনে বাড়ির সকলের শ্বাসরোধ হবার উপক্রম ঘটে। কী কারণে, খুব সম্ভব অকারণেই, একদিন দ্বিপ্রহরে বাপজান সর্বসমক্ষে খোদেজাকে ভয়ানক বকাবকি করে অবশেষে তার চুল ধরে টেনে দু-চারটে চড়-থাপড়ও লাগায়, এবং তারপর ভরা দুপুরে রোদ-মাথায় কোথাও বেরিয়ে যায়। প্রথমে খোদেজা টু শব্দ করে নি, তবে বাপজান বেরিয়ে গেলে বাড়ির পশ্চাতে লেবুগাছটার তলে বসে কাঁদতে শুরু করে চিকন কণ্ঠে, কী-একটা নিঃসঙ্গ ব্যথায়। তখন খোদেজার বয়স পনেরো কি ষোলো। গায়ের রঙ গাঢ় শ্যামল, মাথাভরা চুল। মুখটা যেন কদাচিৎই দেখা যেত, কারণ সব সময়ে সে এ-কাজে সে-কাজে নুয়ে থাকত। যা চোখে পড়ত তা তার সিঁথি যা কখনো ভাঙ্গত না অসংযত হত না যদিও তাতে চিরুনির স্পর্শ লাগত না তেমন; লম্বা ধরনের মাথায় পেছন থেকে শুরু হয়ে সে-সিথি নৌকার ছই-এর মতো বাঁকা হাল্কা কেশগুচ্ছবেষ্টিত ছোট কপালে এসে শেষ হত। কথাও তেমন বলত না। শুধু সে-সময়ে তার কণ্ঠের আওয়াজ শোনা যেত যখন সে উঠানের প্রান্তে দাঁড়িয়ে অদৃশ্য-হয়ে-যাওয়া হাঁস-মোরগ-মুরগিদের ডাকত, তাঁর মিহি গলায় স্নেহমিশ্ৰিত অন্তরঙ্গতার ভাব; হাঁস-মোরগ-মুরগির সঙ্গে সে একটি গভীর মিতালি বোধ করত। ক্বচিৎ কখনো পিতৃহীনা মেয়েটি মুখ তুলে তাকালে তার ঈষৎ অসমান চোখদুটির বিষাদছায়া নজরে পড়ত; দুঃখের কোনো প্রতিকার নেই আপনা থেকে জেগে ওঠা এমন একটি জ্ঞান থেকে সৃষ্টি সে-বিষাদ অল্পবয়সেই তার চোখে স্থায়ীভাবে বাসা বেঁধেছিল।
খোদেজা কাঁদতেই থাকে : অনুচ্চকণ্ঠের কান্নার আওয়াজ দ্বিপ্রহরের স্তব্ধতার মধ্যে একটি বিষণ্ণ সুরের সৃষ্টি করে। আমি কিছুটা বিস্মিত হই, কারণ বাড়ির মেয়েরা যেমন গোদা-আহ্লাদ করে না তেমনি এমনভাবে কাঁদেও না। এ-সব কেউ সহ্য করে না, এ সবের সময়ও নেই। দুনিয়া বড় কঠিন জায়গা। নানা প্রকারের দায়িত্ব এবং দুঃখকষ্টে নিপীড়িত বিড়ম্বিত মুরুব্বিরা কখনো হঠাৎ রাগের মাথায় বকাবকি বা মারধর করে কারো মনে যদি দুঃখের সৃষ্টি করে তা গাছের পাতার ওপর বৃষ্টির ফোঁটার মতোই ক্ষণস্থায়ী হয়; সে-সব কেউ মনে ধরে রাখে না, অন্তর্বেদনার বিষয়ে বিস্মৃত হয়ে অন্তহীন সাংসারিক কাজকর্মে পুনরায় মনোনিবেশ করতে দেরিও করে না। তবে সহসা আমার মনে হয়, খোদেজার অস্বাভাবিক আচরণের কারণ বুঝতে পেরেছি। মুহাম্মদ মুস্তফার জন্যেই আড়ালে গিয়ে অমনভাবে কাঁদছে সে, তাকেই তার ব্যথা-অপমানের কথা জানাচ্ছে। তাকে না জানিয়ে কাকে জানাবে, কেই-বা তাকে সান্ত্বনা দেবে, তার চোখের পানি মুছে দেবে?
মানুষের কল্পনা বিচিত্র জিনিস, একবার তা লাগাম হারালে পথে-বিপথে কোথায় যে চলে যায় তার ঠিক নেই। আমার এবার মনে হয় : খোদেজার প্রতি যতই উদাসীন হোক না কেন, বাগদত্তা মেয়েটির কান্নায় তার অন্তরে কোথাও সুপ্ত স্নেহমমতা নিশ্চয়ই উথলে উঠেছে, এবং শীঘ্র সে বেরিয়ে আসবে, তারপর উঠান অতিক্রম করে বাড়ির পেছনে গিয়ে স্নেহভরে খোদেজাকে অবোধ দেবে, মিষ্টি কথা বলে ব্যথা-বেদনা দূর করবে। মুহাম্মদ মুস্তফা ততক্ষণে দক্ষিণ-ঘরে গিয়ে কঞ্চি দিয়ে ঠেলে অর্ধউন্মুক্ত করে রাখা জানালার পাশে তার বিছানার ওপর বই-খাতাপত্র নিয়ে বসেছে। সে-ঘরের জানালার দিকে নয়, দরজার দিকে তাকিয়ে আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, বুকটা কেমন। দুরুদুরু করে কাঁপে। আমার আরো মনে হয়, বাড়ির সবাই আমারই মতো অপেক্ষা করছে, তারাও জানে মুহাম্মদ মুস্তফা চুপ করে খোদেজার কান্না শুনে যাবে না। মুহাম্মদ মুস্তফা বেরিয়ে আসছে না কেন? বাড়ির সবাই যে রুদ্ধশ্বাসে চোখ খুলে কান পেতে অপেক্ষা করছে-তা বুঝতে পেরে হয়তো সে সঙ্কোচবোধ করতে শুরু করেছে। কিন্তু তবু সে বেরিয়ে আসবে, তার অন্তরে খোদেজার জন্যে যে-স্নেহমমতা উথলে উঠেছে তাতে সে-সামান্য সঙ্কোচ ভেসে যাবে।
মুহাম্মদ মুস্তফা বেরিয়ে আসে নি।
তারপর কী কারণে জানি না আমিই সহসা যন্ত্রচালিতের মতো হাঁটতে শুরু করি এবং শীঘ্র উঠান অতিক্রম করে বাড়ির পশ্চাতে গিয়ে হাজির হই। বাড়ির পশ্চাদেশ স্পর্শ করে দাঁড়িয়ে থাকা বাতাবি লেবুগাছটির তলে হাঁটুতে মাথা গুঁজে খোদেজা তখনো কাঁদছিল। বালিকা বয়সে সে-গাছের তলে বসে খোদেজা একা-একা খেলত। হয়তো সেখানে কল্পনার প্রাসাদ তৈরি করত, যে-প্রাসাদের কক্ষে-কক্ষে কত রাজপুত্র সখা-সখী এসে ভিড় করত। লেবুগাছের তলে ক্ষুদ্র একটি স্থান লেপেমুছে সাফ করে নিয়েছিল। স্থানটি এখনো যেন তকতক করে।
