এবার আরেকটি বিস্ময়কর কাণ্ড ঘটে। যে-কান্নার শব্দ এক সময়ে তাদের ভয়ানক ভীত করত সে-শব্দেই তারা অপরূপ ভাববেগে অভিভূত হয়ে পড়তে শুরু করে।
একদিন দর্জি করিম বক্স বেশ রাত করে লণ্ঠনের আলোয় পুরাতন সেলাই-এর কলে ঘর ঘর আওয়াজ তুলে সীবনকর্মে নিয়োজিত ছিল এমন সময়ে তার মনে হয় কোথাও যেন একটি বাণবিদ্ধ পাখি তীক্ষ্মস্বরে আর্তনাদ করছে। সেলাই-কাজ বন্ধ করে সে মনোযোগ দিয়ে শোনে, কারণ আওয়াজটি যে পাখির আর্তনাদ নয় তা বুঝতে তার দেরি হয় না। আওয়াজটি অবশেষে থামে, আহত পাখিটি যেন ডানা মেলে উড়ে গিয়ে দূর আকাশে চলে যায়। তার রেশটি কানের মধ্যে মিলিয়ে গিয়েছে কি অমনি অত্যাশ্চর্য ধরনের অনুভূতিতে দর্জি করিম বক্সের মন-প্রাণ আপ্লুত হয়ে পড়ে। তার মনে হয়, দীর্ঘদিনের নির্বষণের ফলে শুষ্ক উত্তপ্ত হয়ে-ওঠা জমির মতো প্রাণে স্নিগ্ধশীতল পানি। এসে পৌঁছেছে যে-পানি ধীরে-ধীরে সমগ্র অন্তরে প্রবাহিত হয়ে তৃষ্ণা তো দূর করছেই, সমস্ত ময়লা-আবর্জনাও ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে কুচিন্তা হিংসাবিদ্বেষ ক্ষোভদুঃখ আফসোস।
যা শুনতে চাইত না, শুনলে ভয় পেত, তা-ই শুনবার জন্যে কুমুরডাঙ্গার অধিবাসীরা অধীর হয়ে ওঠে সহসা। এমনকি, অনেকের কাছে তা শুনতে পাওয়া এটি পরম সৌভাগ্যের বিষয় বলে মনে হয় এবং অধীরচিত্তে শুনবার জন্যে অপেক্ষা করার পরও কিছু শুনতে না পেলে তাদের এই ধারণা হয় যে কোনো অজানা কারণে তা শোনার যোগ্য নয় তারা। অনেকে আবার তা শোনে নি স্বীকার করতে লজ্জা বোধ করে বলে শুনছে বলেই দাবি জানাতে শুরু করে বিবরণে কিছু রঙ লাগিয়ে; তাদের ভয় হয় অলঙ্কারশূন্য সংক্ষিপ্ত বিবরণে দাবিটির সত্যতা সম্বন্ধে শ্রোতার মনে সন্দেহের উদ্রেক হতে পারে। ফলে বিচিত্র কান্নার রূপ যেমন ক্রমশ বিচিত্রতর হয়ে ওঠে। তেমনি কে শুনেছে কে শোনে নি-এ-বিষয়ে আর নিশ্চিত হওয়া যায় না। তবে কারো দাবি সত্য নয় মনে হলেও কেউ প্রশ্ন করে নাঃ কান্নাটি যেন এমনই এক স্তরে উপনীত হয়েছে যেখানে মানুষের বিশ্বাস অসীমের সঙ্গে মিশে যায়, দিকচক্রবাল পেরিয়ে নিয়ে অজানার সন্ধান করে কিন্তু পশ্চাতে দৃষ্টি দেয় না। বস্তুত কান্নাটি এক রকমের বিশ্বাসে পরিণত হয়; বিশ্বাসীর বিশ্বাসে সন্দেহ বা প্রশ্নের অবকাশ থাকে না।
নদীর দিক থেকে কী-একটা কান্না শুনতে পায়-তা কল্পনা হোক, কোনো প্রকারের ভ্রম হোক, এ-বিষয়ে সন্দেহ নেই যে এ-সময়ে শহরবাসীদের মধ্যে একটি বিষয় পরিবর্তন এসে গিয়েছিল। দারোগা-পুলিশ হাকিম-সুবারা পরিবর্তনটি লক্ষ্য করেছিল, লক্ষ্য করে গভীরভাবে বিস্মিতও হয়েছিল, কারণ এ-সময়ে চুরি-ডাকাতি কমে গিয়েছিল, কাছারি-আদালতের সামনে ঘাঘু মামলাবাজদের ভিড়টাও পাতলা হয়ে উঠেছিল, এমন কি দু-একজন লোক সহসা বিপক্ষদলকে ক্ষমা করে বহুদিনের পুরানো মামলা পর্যন্ত তুলে নিয়েছিল। শত্রুরা তাদের শত্রুতা ভুলে গিয়েছিল, মানুষের মধ্যে অচিন্তনীয় ধরনের স্নেহপ্রীতি উদ্বেলিত হয়ে উঠেছিল বা লম্বট-চরিত্র মানুষের দুরাত্মপনায় ভাটা পড়েছিল-এ-সব সত্য, কল্পনা নয়। এ-সময়ে মানুষেরা সুখের কথাও ভাবতে পারে নি। দু-একটি পরিবার তাদের সন্তানসন্ততির বিয়ের পাকা ব্যবস্থা পর্যন্ত ভেঙ্গে দিয়েছিল এই বিশ্বাসে যে নদীর দুঃখের সময়ে সন্তানসন্তুটির সুখের কথা ভাবা অন্যায়।
এ-সব সত্যিই ঘটেছিল, তবারক ভুইঞা বলে।
মুহাম্মদ মুস্তফার কী হয়েছিল জানি না। হয়তো বাড়ির লোকেরা যা বলেছিল তা বিষের মতো দেহের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে ধীরে-ধীরে তার বুদ্ধিমত্তা, বিবেচনাশক্তি দুর্বল করে ফেলেছিল, হয়তো শত সাক্ষ্যপ্রমাণ সত্ত্বেও কোনো বিষয়ে মানুষ সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত হতে পারে না বলে দশজন যা বলেছিল তাই অবশেষে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল সে। অথবা খোদেজা নয়, অন্য কোনো কারণ ছিল যা তার অতীত জীবনের গহ্বরে লুক্কায়িত ছিল। এবং যা সে-ও বোঝে নি, আমিও বুঝি নি। কারণ যাই হোক, নানা অকাট্য যুক্তি দিয়ে গঠিত সুরক্ষিত যে-বাধের সাহায্যে বাড়ির লোকদের ভিত্তিহীন ধারণাটি ঠেকিয়ে রেখেছিল তা তারই অগোচরে ক্রমশ হীনবল হয়ে উঠে থাকবে এবং তবারক ভুইঞার ন্যায় নেহাৎ পরিচিত একটি লোকও বাড়ির লোকেদের মত পোষণ করে এই ধারণা হলে বালুর তৈরি জিনিসের মতো সেটি অতি সহজে ধসে পড়ে : যা এতদিন একেবারে অসত্য মনে হয়েছিল তাই সহসা মুহাম্মদ মুস্তফার চোখে অবিসংবাদিত সত্যের রূপ গ্রহণ করে।
খোদেজা আত্মহত্যা করেছিল-তা আমি কখনো বিশ্বাস করি নি। এ-কথা সত্য যে মেজো চাচা খেদমতুল্লা একদিন একটি ওয়াদা করেছিল, কিন্তু মানুষ কত সময়ে কত কিছু-না ওয়াদা করে। করে, কারণ সামনের পথ সে দেখতে পায় না, জানে না অদৃশ্য ভবিষ্যতে কার জীবন কী রূপ নেবে, কোন খাতে প্রবাহিত হবে। কল্পনায় সুদূর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল দেখালেও সে-ভবিষ্যতের দিকে বেশিক্ষণ তাকাতে পারে না, খুরধার স্রোতের বিরুদ্ধে যেতে-থাকা নৌকা যেমন হঠাৎ পেছন-মুখো হয়ে ঘুরে যায় তেমনি তার দৃষ্টি পশ্চাতের দিকে ফিরে আসে। ততদিনে খেদমতুল্লার মনে ছেলের বিষয়ে একটি উচ্চাশা দেখা দিয়ে থাকলেও তার পক্ষে ভবিষ্যৎটি পরিষ্কারভাবে দেখা সম্ভব ছিল না, সে ভাবতে পারে নি যে বাড়ির অন্যান্য ছেলেদের মতো মুহাম্মদ মুস্তফা গ্রাম্যজীবনের ক্ষুদ্র গণ্ডিতে সত্যিই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে না। তেমনটা কি অসম্ভব ছিল? আমার বড় ভাই সোনা মিঞা কী করেছে? চাঁদবরণঘাটে গিয়ে মুড়িমুড়কির দোকান দিয়েছে। সে মুহাম্মদ মুস্তফারই সমবয়সী। ছোট চাচার একমাত্র সন্তান এবং নয়নের মণি হাতেম অলস বাপের পদাঙ্কনুসরণ করে জাত-আসেতে পরিণত হয়েছে, অন্নচিন্তাও তার কাছে শ্রমবাধ্য মনে হয়। আমিও অসময়ে পড়াশুনা বন্ধ করতে বাধ্য হই, যদিও দুই ক্রোশ হেঁটে পুকুরের ধারে দি মোসলেম খান হাই স্কুল নামক বিদ্যালয়ে বেশ কয়েক বছর যাতায়াত করেছিলাম এবং আরেকবার চেষ্টা করলে হয়তো ম্যাট্রিক পাস দিতে পারতাম। ইচ্ছা ছিল, হয়ে ওঠে নি। মনে হয় দরিদ্র পরিবারে যাদের জন্ম তাদের জন্যে আর্থিক বিপত্তির চেয়ে আরেকটি জিনিস বিষম অন্তরায় সৃষ্টি করে। সেটি ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনকে পশ্চাতে ফেলে যাওয়ার বিষয়ে দ্বিধা। জন্মদাতা যা পড়ে নি বা দেখে শোনে নি তা পড়তে বা দেখতে-শুনতে দ্বিধাই হয় এবং একদিন ঘরে ফিরে দেখবে জন্মদাতা একটি নেহাৎ অজ্ঞমুখ মানুষ-তা ভাবতেই কোথাও যাবার সাধ নিমিষে স্তিমিত হয়। হয়তো মুহাম্মদ মুস্তফাও তেমন একটি বাধা বোধ করেছিল। যদি সে সে-বাধা অতিক্রম করতে সক্ষম হয় এবং একমনা দৃঢ়সংকল্প নিয়ে পায়ে-পায়ে এগিয়ে বহুদূরে চলে গিয়ে থাকে, তার কারণ ছিল; দলবদ্ধ নক্ষত্রমণ্ডলীর মধ্যে থেকে সহসা একটি নক্ষত্র যদি ছিটকে অন্য কোথাও চলে যায় তার পশ্চাতে কোনো একটা কারণ থাকেই। তার ক্ষেত্রে কারণটি ছিল তার বাপ খেদমতুল্লা যার অস্বাভাবিক মৃত্যুর ছায়া থেকে আত্মরক্ষা করবার জন্যেই এমন করে সে ধেয়ে চলে গিয়েছিল। হয়তো সে কোনো একটা পণও করেছিল-যে-পণ এমনভাবে তার সমস্ত চিন্তাধারা সমস্ত জীবন গ্রাস করেছিল যে একদিন তার বাপ সদ্য স্বামীহারা বোনের দুঃখে দুঃখিত হয়ে কী বলেছিল তা স্মরণ করে রাখা তার পক্ষে সম্ভব হয় নি। এবং সঙ্কল্প-দৃঢ় একাগ্রচিত্ত অনন্যমনা মুহাম্মদ মুস্তফার মুখের দিকে তাকিয়ে এক সময় অন্যেরা, এমনকি খোদেজাও সে বিষয়ে আর ভাবতে সাহস পায় নি। একসময়ে আমারও মনে হত, বাইরে দেখা না গেলেও হয়তো মুহাম্মদ মুস্তফা এবং খোদেজার মধ্যে বুঝি একটি স্নেহমমতার বন্ধন সৃষ্টি হয়েছে, হয়তো তারা কী-একটা অদৃশ্য কিন্তু গভীর যোগাযোগ বোধ করে। কিন্তু একদিন নিজেই বুঝতে পারি ধারণাটি সত্য নয়।
