মুহাম্মদ মুস্তফা নিজেকে সংযত করে। তবে তার মনে হয় সহসা তার তন্দ্রাভঙ্গ হয়েছে। সে কি তার অগোচরে ঘুমিয়ে পড়েছিল? রাত্রি পূর্ববৎ নীরব, কেউ কোথাও নেই, সিঁড়ির ধাপে পা রেখে যে-লোকটি বসে-সে-ও যেন নেই। সচকিত হয়ে সিঁড়ির দিকে তাকালে সে তাকে দেখতে পায়। সেখানে শুধু যে বসে তা নয়, কেমন একটা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে সে। সহসা মুহাম্মদ মুস্তফা অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করে।
যাই, শুয়ে পড়ি গিয়ে। আড়মোড়া ভেঙ্গে মুহাম্মদ মুস্তফা বলে, তৎক্ষণাৎ উঠেও পড়ে। তবে সে-রাতে ঘুমোতে গিয়েও মুহাম্মদ মুস্তফা সহজে ঘুমাতে পারে না। বার বার তবারক ভুইঞার কথাই তার মনে আসে। সে যে-কথা বলেছিল তা যে সত্য নয় তা বলামাত্রই বুঝেছিল, তা অপ্রত্যাশিতও মনে হয় নি। তবু সে-কথা তাকে কেমন নিপীড়িত করে যেন।
৮. অনেকক্ষণ ঘুমের প্রতীক্ষায় নিশ্চল
অনেকক্ষণ ঘুমের প্রতীক্ষায় নিশ্চল হয়ে-থাকার পর মুহাম্মদ মুস্তফা উঠে পড়ে। ঘরের কোণে সুরাহি থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে ঢক্ করে তা নিঃশেষ করে গ্লাসটি দেয়ালের পাশে ছোট একটি টেবিলে রেখে তার ওপর অকারণে তবারক ভুইঞার স্ত্রীর হাতে তৈরি পুঁতি ঝোলানো জালিটি রাখে, পুঁতিগুলি গ্লাসের গায়ে বাড়ি খেয়ে একটু বেজে ওঠে। হয়তো সে-অস্কুট ঝঙ্কার তাকে কী একটি কথা মনে করিয়ে দেয় সহসা। আলোর তেজ বাড়িয়ে সে বিছানায় ফিরে আসে এবং মশারির ভেতর থেকে পুঁতি ঝোলানো জালিটির দিকে তাকিয়ে থাকে। জালিটির প্রান্তদেশ ঢেউ-খেলানো, যার ধার দিয়ে সবুজ সুতার রেখা; সেখান থেকে পুঁতিগুলি ঝোলে। জালিটি যে সযত্নে তৈরি করেছে তার কথা মুহাম্মদ মুস্তফা ভাবতে চেষ্টা করে, তবে যাকে দেখে নি তার বিষয়ে বেশি ভাবা সম্ভব হয় না। হয়তো একজোড়া কার্যনিযুক্ত হাত দেখতে পায় যে-হাত কোনো নির্দিষ্ট মানুষের নয়, হয়তো একটা ইচ্ছা বা একাগ্রতাও অনুভব করে কিন্তু সে ইচ্ছা বা একাগ্রতা কোনো বিশেষ আকার ধারণ করে না। তাছাড়া জালিটি যে তৈরি করেছিল তার মুখ নয়, আরেকজনের মুখই সে দেখতে পায়। মুখটি তবারক ভুইঞার; তবারক ভুইঞাই জালিটি বহন করে এনে তাকে দিয়েছিল। তেমন কিছু না, ক্ষুদ্র একটি উপহার, শ্রদ্ধা-সম্মানের যৎকিঞ্চিৎ নিদর্শন, সহৃদয়তার প্রমাণ। তাছাড়া তখন মুহাম্মদ মুস্তফা বেশ জ্বরে পড়েছে। আত্মীয়-বন্ধুবান্ধবহীন অবিবাহিত নিঃসঙ্গ প্রতিবেশী অসুস্থ হয়ে পড়লে তার সেবাযত্বের ইচ্ছাটি স্বাভাবিকভাবেই জাগে। বিছানার পাশে পানি থাকলে রোগীর সুবিধা হয়, জালি ঢাকা পাত্রে কীটপতঙ্গ পড়ে না-এই মনে করে সেটি সে এনে দিয়েছিল। জিনিসটাই-বা কী! মণিমুক্তা নয়, পুঁতির মালা দিয়ে ঘেরা হাতের তালুর আকারের একটি জালি যা তৈরি করতে আধমণ সুতার প্রয়োজন হয় নি। ইতিমধ্যে মুহাম্মদ মুস্তফা এ-কথাও বুঝে নিয়েছিল যে একটি শহরের হাকিম হলে তাকে অনেক লোক অনেক কিছু দিতে চায়। এ-সবের পেছনে কখনো মোসাহেবি তোষামুদির ভাব বা মতলব-দুরভিসন্ধি থাকে, কখনো থাকে না : কেউ সরলচিত্তে নিঃস্বার্থভাবে পদমর্যাদার প্রতি সম্মান দেখায়, কেউ-বা শুধুমাত্র সামাজিক প্রথা পালন করে; হাকিম হলেও বর্তমানে সে কুমুরডাঙ্গার সমাজের একজন। কারো বাড়িতে গ্রাম থেকে ঝুড়িভরা আম লিচু এসেছে, কারো ঘরে ছেলের খাত্না উপলক্ষে মিঠাই-মণ্ডা তৈরি হয়েছে, কেউ আবার বিশেষ কোনো কারণে গরু-বকরি জবাই করেছ-এ-সব বাড়ি-বাড়ি বিতরণ করা সামাজিক প্রথা। সুখে-দুঃখে একটি মানুষ আরেকটি মানুষকে স্মরণ করে-এই তো সমাজ। তাই ক্ষুদ্র জালিটির মধ্যে সে অন্যায়জনক কিছু দেখতে পায় নি। তবে এখন পুঁতির মালা দিয়ে ঘেরা জালিটির দিকে তাকাবার সঙ্গে সঙ্গে মুহাম্মদ মুস্তফার মনশ্চক্ষে যে-মুখটি জেগে ওঠে সে-মুখটি হাসিখুশি সলচিত্ত সহৃদয় তবারক ভুইঞার হলেও সহসা একটি কথা তার মনে আসে : তার সুখ-সুবিধার জন্যে লোকটির এত উদ্বিগ্নতা সেবা-যত্নের জন্যে এত তৎপরতা-এ-সবের পশ্চাতে যেন গূঢ় অভিসন্ধি। সে যেন কিছু জানতে চায়, সরলতা সহৃদয়তার মধ্যেও কোথাও এক জোড়া চোখ সর্বক্ষণ তার ওপর নিবদ্ধ যে-চোখ তার অন্তরটা তছনছ করে খুঁজে দেখে। তার মধ্যে কী সে সন্ধান করে এমন করে? নিঃসন্দেহে সে দেখতে চায় মুহাম্মদ মুস্তফা বাড়ির লোকেদের কথা বিশ্বাস করেছে কিনা, এ-কথা মেনে নিয়েছে কিনা যে খোদেজা আত্মহত্যাই করেছিল, তারপর তার মনে অনুতাপ-অনুশোচনা দেখা দিয়েছে কিনা।
সে-রাতে সর্বপ্রথম তবারক ভুইঞার মনোভাব তাকে ভয়ানকভাবে ভাবিত করে, একটি অনাত্মীয় মানুষকে ঘরের কথা বলেছে বলে নিজের ওপর রাগও হয় তার। কেন বলেছিল কথাটি, বললার দরকারই-বা কী ছিল? মনে হয় মুখ থেকে এমনিই বেরিয়ে এসেছিল, পশ্চাতে কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। তবে সেটি সত্য নয়, ঠিক এমনিতে বেরিয়ে আসে নি, জ্বরঘোরে বলে থাকলেও বিলাপ বকেছিল তা নয়, যদিও জ্বরে না পড়লে হয়তো বলতে পারত না। বলেছিল এই জন্যে যে সমস্ত ব্যাপার শোনার পর তবারক ভুইঞা কী বলে তা জানার ইচ্ছা হয়েছিল হঠাৎ। সে বাড়ির লোক নয়, এ ধারে ও-ধারে কোনোদিকে তার টান নেই, নিঃসন্দেহে সে নিরপেক্ষ মত দেবে। মতটি যে কী হবে-সে-বিষয়েও তার সন্দেহ ছিল না, কারণ তার মনে হয়েছিল নিমেষের মধ্যেই কী সত্য কী অসত্য তা সে স্পষ্টভাবে দেখতে পাবে। কিন্তু তা হয় নি, সব শুনেও সে বাড়ির লোকেদের পক্ষ নিয়েছে। কেন? সত্যের চেয়ে অসত্যের শক্তি কি বেশি?
