তবে সন্দেহটি কেন আবার দেখা দিয়েছে, তা বুঝতে পারি। চেহারা বা চরিত্রের জন্যে নয়, সন্দেহ জাগে এই কারণে যে, সে এখনো একবারও মুহাম্মদ মুস্তফার নাম নেয় নি। তবে সে কি তবারক ভুইঞা নয়?
অল্পক্ষণ সন্দেহের দোলায় দুলে সে যে তবারক ভুইঞাই হবে-সে-বিশ্বাসটি আবার দৃঢ়বদ্ধ হয় আমার মনে। সঙ্গে-সঙ্গে বিস্ময়টিও বাড়ে। কেন তবারক ভুইঞা মুহাম্মদ মুস্তফার নাম নেবে না তা আমার বোধগম্য হয় না। অথচ যখন কুমুরাঙ্গার অধিবাসীদের মনে এই ধারণা জন্মেছিল যে চরা পড়ে থাকলেও স্টিমার-চলাচল বন্ধ হবার কারণ নেই এবং শীঘ্র স্টিমার ফিরে আসবে, তখন শহরবাসীদের নির্বুদ্ধিতার সম্বন্ধে আলাপ আলোচনা করতে প্রায়ই মুহাম্মদ মুস্তফার সঙ্গে সে দেখা করতে আসত। স্টিমারঘাট বন্ধ বলে তখন সে বেকার। তার বাড়িটা ছিল মুহাম্মদ মুস্তফার সরকারি বাংলোর পশ্চাতে, সুযোগ পেলে কারণে-অকারণে এসে হাজির হত। তারপর শহরবাসীরা কী একটা বিচিত্র কান্না শুনতে শুরু করার পর তার আসা-যাওয়াটা যেন বেড়ে যায়। ততদিনে সে মুহাম্মদ মুস্তফার চিত্ত জয় করে নিয়েছে; হাসি-খুশি সরলচিত্ত সশ্রদ্ধ, তার সুখসুবিধার বিষয়ে সদা সজাগ লোকটির প্রতি মুহাম্মদ মুস্তফার মনে কেমন একটা স্নেহভাব জেগে উঠেছিল। মনে হত তার খেদমত করার শখের অন্ত নেই যেন তবারক ভুইঞার। বস্তুত, একটি ইচ্ছা প্রকাশ করেছে কি অমনি তা পূর্ণ করার জন্যে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে যেত, কোনো-কোনো সময়ে তার কী দরকার তো নিজেই লক্ষ্য করে দেখে যথাবিধি ব্যবস্থা করত।
এ-সময়ে শ্যাওলা-আবৃত ক্ষুদ্র পুকুরে খোদেজার মৃত্যুর কথা কেউ উল্লেখ করত–না তবারক ভুইঞা না মুহাম্মদ মুস্তফা। মুহাম্মদ মুস্তফা ধরে নিয়েছিল যে খোদেজার মৃত্যু সম্বন্ধে বাড়ির লোকেদের আজগুবি কথাটা তবারক ভুইঞা বিশ্বাস করে না। তেমন কথা বিশ্বাস করা কি সহজ? কে না জানে আপন হাতে নিজের প্রাণ নেওয়া কত কঠিন। একমাত্র সন্তান হারালেও অত্যন্ত স্নেহশীলা মাতা আত্মহত্যা করে না, জীবনের শ্বাসপ্রশ্বাসের মধ্যে দিয়ে মর্মান্তিক শোক সহ্য করে নেয় কারণ জীবনের মায়ার চেয়ে বড় মায়া নেই, যতক্ষণ শ্বাস থাকে ততক্ষণ প্রতিকার বা ক্ষতিপূরণের আশারও শেষ নেই। সে যদি বিশ্বাস করে খোদেজা আত্মহত্যা করেছিল-তাতেই-বা আপত্তি করা যায় কি? বাড়ির লোকেরাও কি তেমন একটি কথা বিশ্বাস করে না? তাছাড়া, বিশ্বাস করলেও অবাক হবার কিছু নেই। আত্মহত্যার চেয়ে অপঘাতে মৃত্যুর কথা গ্রহণ করা অপেক্ষাকৃত সহজ হলেও মানুষের পক্ষে আপন প্রাণ নেয়া অত্যন্ত কঠিন বলে তা দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর চেয়ে অনেক বেশি চমকপ্রদ, অনেক বেশি চাঞ্চল্যকর। আত্মহত্যার মধ্যে মানুষ সর্বপ্রধান, কিন্তু দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর মধ্যে সে কোরবানির গরু-ছাগলের মতো অসহায়। বিকৃত কোনো মানসিক অবস্থার সাহায্যে হলেও কেউ সেই চরম নিঃসহায়তার ঊর্ধ্বে উঠেছে-এমন কথা মনে আঘাত করলেও আবার চিত্তাকর্ষক। খোদেজা আত্মহত্যা করেছে তা যদি সে বিশ্বাস করে, তবে সে-জন্যেই করে।
তারপর একদিন সহসা মুহাম্মদ মুস্তফা নিজেই কথাটি তোলে কোনো কারণ ছাড়া। সে বলে, বাড়ির লোকেদের কথাটি ভাবছিলাম। কী করে তারা তেমন একটা কথা ভাবতে পারে বুঝি না।
তখন বেশ রাত হয়েছে। নিত্যকার মতো শুতে যাওয়ার আগে তবারক ভুইঞা নদীর ধারে একটু হাওয়া খেতে বেরিয়েছিল, এমন সময়ে মুহাম্মদ মুস্তফাকে দেখতে পেয়ে দু-দণ্ড আলাপ করবার জন্যে বারান্দার প্রান্তে এসে বসেছে, সিঁড়ির ধাপে পা। সহসা উত্তর না পেলে মুহাম্মদ মুস্তফা তার দিকে দৃষ্টি দেয়। অন্ধকারে তার চেহারা স্পষ্ট দেখা যায় না, তবু মনে হয় উক্তিটি তার চোখে কী-একটা চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে, যেন পানির গভীরে একটা বড় গোছর মাছ সন্ত্রস্তভাবে লেজ সঞ্চালন করাতে তার সামান্য আভাস দেখা দিয়েছে পানির বুকে।
তারপর হঠাৎ তবারক ভুইঞা মাথা নিচু করে, তার চোখ অদৃশ্য হয়ে যায়।
আমিও তাই ভাবি।
এবার দু-জনেই নীরব হয়ে থাকে। একবার অল্প সময়ের জন্যে একটু হাওয়া ভেসে আসে নিঃস্পন্দ রাতের বুক থেকে, তার পালক-হাল্কা স্পর্শ লাগে মুখে-চোখে, রাস্তার পাশে নিমগাছের পাতায় মর্মরধ্বনি জাগে; সে-মর্মরধ্বনি যেন কিসের। প্রতিধ্বনি। একটু পরে মুহাম্মদ মুস্তফা অন্ধকারের মধ্যে আবার তবারক ভুইঞার দিকে তাকায়। লোকটি তখন দূরে কোথাও দৃষ্টি নিবদ্ধ করে নিথর হয়ে বসে। তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে এমন সময় মুহাম্মদ মুস্তফার মনে একটি বিচিত্র কথা দেখা দেয়। তার মনে হয়, সে জানে তবারক ভুইঞার দৃষ্টি কোথায়, জানে সে-দৃষ্টি কী দেখছে তাকিয়ে তাকিয়ে। তার দৃষ্টি একটি পুকুরের ওপর নিবদ্ধ। পুকুরটি শ্যাওলা-আবৃত বদ্ধ ডোবার মতো, যে-পুকুরে একটি মেয়ে ধীরে-ধীরে নাবছে। পাড় থেকে ধাপ-কাটা একটি নারকেলগাছের গুঁড়ির যে-সিঁড়ি পানির দিকে চলে গিয়েছে, সেটা বেয়ে নাবছে। এক ধাপ, দুই ধাপ-পাশাপাশি করে রাখা দুটি পায়ে সন্তর্পণে কিন্তু অনায়াসে সে নেবে যাচ্ছে। অনেকদিনের অভ্যাসের ফলে। এবার তৃতীয় ধাপ। সে-ধাপের পরে কালো পানি, নিস্তরঙ্গ বদ্ধ পানি। মেয়েটি নেবেই চলে। প্রথমে হাঁটুপানি-তারপর কোমরপানি, অবশেষে বুক পর্যন্ত ওঠে সে-পানি। এবার মেয়েটি আর না নড়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে, দৃষ্টি কালো পানির দিকে। যেন তার মধ্যে দ্বিধা-সংশয় দেখা দিয়েছে, যেন এবার কী করবে তা সে ঠিক বুঝতে পারছে না, তার গাঢ় শ্যামল ক্ষুদ্র মুখাবয়বে নিথর ভাব। তারপর হঠাৎ সে এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে যেন পেছন থেকে কেউ তাকে ধাক্কা দিয়েছে, মুখ দিয়ে অস্ফুট আর্তনাদ নিঃসৃত হয়। শীঘ্র তার মাথা, মাথার উপরাংশ, তারপর মাথার যে-চুল পানিতে ছড়িয়ে পড়েছিল সে-চুল অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু আবার তাকে দেখা যায়, কারণ সে ভেসে ওঠে। হয়তো অল্পক্ষণ সে ভয়ানকভাবে হাত-পা নাড়ে, ভেসে থাকার চেষ্টা করে, কিন্তু ক্রমশ তার দেহ স্তব্ধ হয়ে পড়ে, কাঠের মতো, তারপর পাথরের মতো। এবং একবার তার দেহ পাথরে পরিণত হলে চোখের পলকে সে শ্যাওলা-আবৃত বদ্ধ পানিতে অদৃশ্য হয়ে যায়। এভাবেই কি মানুষ পানিতে ডুবে মরে?
