তবারক ভুইঞার মনোভাব তার নিকট সর্বযুক্তিবিরুদ্ধ বলে মনে হয়। বাড়ির লোকেদের নিতান্ত ভিত্তিহীন কথাটি কেন তার বিশ্বাস হবে? অথচ সব কিছুই সে শুনেছে; সে তাকে সব কিছু খুলে বলেছে, কিছু ঢেকে রাখে নি। সে পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে বলেছে কেন বাড়ির লোকেদের ধারণাটি সত্য হতে পারে না, কেন খোদেজার পক্ষে আত্মহত্যা করা সম্ভব নয়। মানুষ কত কথা বলে-দায়িত্বহীন কথা, উদ্ভট অবান্তর কথা। যা প্রথমে সুনিয়ন্ত্রিত ধারার মতো শুরু হয় তা-ও এক সময়ে সহসা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে বন্যার পানির মতো দু-কূল ছাপিয়ে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে, সত্যের ক্ষেত্র ছেড়ে অসত্যের ক্ষেত্রে চলে যায়, বাস্তবের যুক্তিসঙ্গত সীমানা ত্যাগ করে অবাস্তবের উচ্ছল অর্থহীনতার মধ্যে পথ হারিয়ে ফেলে; প্রথমে গুঁড়ি বেয়ে শাখায় ওঠে, তারপর এ-শাখা থেকে সে-শাখা এ-ডাল থেকে সে-ডাল করে আচম্বিতে লাফিয়ে অন্য গাছে চলে যায়। মানষের কথা কোণাকুণিভাবে চলে, ছোটে তির্যকগতিতে, যেহেতু শীঘ্র যাত্রার উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলে বা উদ্দেশ্যটি আর দেখতে পায় না সেহেতু কোথাও পৌঁছুতে পারে না এবং পৌঁছুতে পারে না বলে থামতেও পারে না : মানুষের কথায় যতি নেই। বিষয়বস্তু যা-ই হোক, মানুষ তার নিজের কথার বানে ভেসে যায়, কোনো ঘাটে পৌঁছুলেও কোথাও পৌঁছায় না, কারণ যেখানে থামে সেটি তার গন্তব্যস্থল নয়।
তবারক ভুইঞা কিছু বোঝে নি। কেন বোঝে নি?
তবে শেষরাতের দিকে মুহাম্মদ মুস্তফা তন্দ্রার মতো বোধ করে এবং তার অর্ধঘুমন্ত মনে অকস্মাৎ একটি প্রশ্ন দেখা দেয় : হয়তো তবারক ভুইঞা বাড়ির লোকেদের কথা বিশ্বাস করেছে কারণ সেটিই সত্য, খোদেজা আত্মহত্যাই করেছিল। চমকিত হয়ে জেগে উঠলে সহসা সে শুনতে পায় পাখির কলতান করতে শুরু করেছ। কিন্তু তা যে পাখিরই কলতান তা তার বিস্ময়াভিভূত মনে অনেকক্ষণ বুঝতে পারে নি।
তবারক ভুইঞা তখনো বিচিত্র কান্নার কথাই বলছিল। সে বলছিল, তার মতো অনেকেই ভেবেছিল কান্নাটি কানের ভুল বা কোনোরকমের খেয়াল হবে কিন্তু সে-কান্না যারা শুনতে পায় তাদের সংখ্যা যেমন বাড়তে থাকে তেমনি কান্নার আওয়াজও দিনদিন স্পষ্টতর, উচ্চতর হয়ে ওঠে। একদিন উকিল কফিলউদ্দিন আর চুপ করে থাকতে পারে। প্রথমে কথাটি কানে তোলে নি; আজে-বাজে কথা সহজে সে কানে তোলে না। তাছাড়া স্টিমারের সর্বশেষ চিহ্ন অদৃশ্য হয়ে যাবার পর সহসা সে এমন একটি গভীর নিরাশায় সমাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে যে অন্যান্য কথায় মন দেয়া তার পক্ষে সম্ভব হয় নি; ক দিন সে কেমন নিস্পৃহ নিস্তেজ হয়ে থাকে, মুখে-চোখে বার্ধক্যের এবং পরাজয়ের গভীর শ্রান্তি।
বিচিত্র কথাটি সম্যকভাবে বুঝতে পারলে সে প্রচণ্ড ক্রোধে ফেটে পড়ে। শহরের লোকেরা কি মতিচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। তারপর হঠাৎ তার মনে একটা সন্দেহ দেখা দেয়। ওটা স্টিমারের লোকেদের কারসাজি নয় তো? যতই ভেবে দেখে ততই সন্দেহটা ঘনীভূত হয়। হয়তো তারা ধ্বনি-বিবর্ধক যন্ত্রের সাহায্যে কোনো গুপ্তস্থান থেকে একটা কান্নার শব্দ চতুর্দিকে ব্যাপ্ত করার ব্যবস্থা করেছে। যন্ত্রট না হলেও হয়তো ঘুষ দিয়ে কাউকে সে-কাজে লাগিয়েছে। তারা কুমুরডাঙ্গার অধিবাসীদের বিশ্বাস করাতে চায় যে বাকাল নদীটি সত্যই মরতে বসেছে এবং সে-জন্যে ঘাট তুলতে তারা বাধ্য হয়েছে, তারা নির্দোষ।
গম্ভীর কণ্ঠে উকিল কফিলউদ্দিন বার-লাইব্রেরিতে ঘোষণা করে, ওদেরই কাজ হবে। তারা হাড়ে-হাড়ে শয়তান, নেমকহারামের দল।
স্টিমারের লোকেরা কান্নার জন্যে দায়ী তা কেউ বিশ্বাস করেছিল কিনা কে জানে, তবে সেটা যে কোনো মানষের দুষ্টামি নয় সে-বিষয়ে নিশ্চিত হবার জন্য স্বয়ং দারোগার নেতৃত্বে একদল লোক শহরের অলিগলি ঝোপঝাপ তন্ন তন্ন করে তালাশ করে দেখেছিল, কিন্তু কোথাও কিছু খুঁজে পায় নি।
এবার শহরের মোল্লা-মৌলভিরাও কান্নার বিষয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতে শুরু করে। আজগুবি কথাটি যেন সর্বমাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছে। খোদার দুনিয়ায় নানা প্রকারের শব্দ হয়, কিন্তু সে-সব শব্দ কারো অজানা নেই, কেয়ামতের সময় যে-ভীষণ আওয়াজ একদিন সবাই শুনতে পাবে তা তাদের ভয়ানকভাবে ভীত করলেও বিস্মিত করবে না কারণ তার কথাও কেতাবে লিখিত। বস্তুত, খোদার দুনিয়ায় রহস্যের অন্ত না থাকলেও সে-রহস্যের আবার সীমা রয়েছে এবং যেখানে সে-সীমারেখা অতিক্রান্ত হয় সেখানে যা ন্যায্য বা সঙ্গত, জায়েজ বা অনুমোদিত-সে-সবেরও শেষ হয়। মানুষ যে-কান্নার সাহায্যে তার শোক-দুঃখ প্রকাশ করে থাকে, সে-কান্নার অনুরূপ যে-শব্দ শোনা যায় তার অর্থ কী, কোত্থেকেই-বা তা আসে? কিছু সভা-মজলিস আলাপ-আলোচনার পর তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে কান্নাটি শয়তানের কারসাজি হবে : শয়তান বহুরূপী। তারা স্থির করে কিছু একটা করতেই হবে যাতে কান্নাটির হাত থেকে কুমুরডাঙ্গার অধিবাসীরা মুক্তি পায়। তাদের কর্তব্য সম্বন্ধে ক্ষীণতম দ্বিধাও দূর হয় তাদের মন থেকে যখন তোবারক আলী মুন্সীর ঘোর পর্দানশীন স্ত্রী জয়নাব খাতুনের বিস্ময়কর আচরণের খবর শুনতে পায়। যে-জয়নাব খাতুন জীবনে কখনো বাইরের দরজার চৌকাঠ অতিক্রম করে নি সে-ই নাকি মধ্যরাতে বিচিত্র কান্নার আওয়াজ শুনতে পেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে মন্ত্রমুগ্ধ মানুষের মতো নদীর দিকে হাঁটতে শুরু করেছিল। মোল্লা-মৌলভিরা এবার রীতিমতো শঙ্কিত হয়ে পড়ে, আর বিলম্ব করে না। তারা শহরের বিভিন্ন স্থানে আজানের ব্যবস্থা করে যাতে তার আওয়াজ শহরের সর্বত্র পৌঁছায়, প্রত্যেক শহরবাসীর কর্ণগোচর হয়। সঙ্গে-সঙ্গে মিলাদ পড়ানো বা ছদকা শিরনি দেয়ার ব্যবস্থা করে। একদিন রাতে মসজিদে অনেক রাত পর্যন্ত বিশেষ নামাজেরও আয়োজন করে। তাতে শরিক হলে বিচিত্র কান্নার আওয়াজ বন্ধ হবে-এই বিশ্বাসে অসংখ্য লোক জড়ো হয় মসজিদে, অনেক রাত পর্যন্ত নামাজিদের সমবেত বলিষ্ঠ কণ্ঠধ্বনিতে রাতের আকাশ খণ্ডবিখণ্ড হয়।
