সে-সন্ধ্যায় হয়তো কান্নাটি আর কেউ শোনে নি। তবে ততক্ষণে দুর্বোধ্য ব্যাখ্যাতীত কান্নাটি কুমুরডাঙ্গার অধিবাসীদের অন্তরে পৌঁছে গিয়েছে, তা আর ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব নয় যেন। ধীরে-ধীরে অনেকে সময়ে-অসময়ে সে-কান্না শুনতে পায়, যে কান্না কখনো বাঁশঝাড়ে হাওয়ার মর্মরের মতো শোনায়, কখনো-বা বাঁশির রব ধরে, কখনো আবার রাতের অন্ধকারে পাখি-শাবকের কাতর আর্তনাদের মতো শুরু হয়ে অবশেষে বিলম্বিত রোদনে পরিণত হয়।
দু-দিন পরে কাছারি-আদালতের নিকটে এক-কামরার বার-লাইব্রেরিতে মধ্যবয়সী উকিল সুরত মিঞা বসেছিল। এ-ঘরে বসে কুমুরডাঙ্গার কতিপয় উকিলের মামলা যুদ্ধের ফন্দি-কাররবাই-এর সন্ধান করে, গল্পগুজব করে, চা-সিগারেট পান করে, গা ঢালা নিস্পন্দতায় চুপ করে থেকে আরাম করে, অথবা চতুষ্পার্শ্বের কলরব বা সামনের মাঠ থেকে জনতার যে-অত্যান্ত গুঞ্জন ভেসে আসে সে-গুঞ্জন অগ্রাহ্য করে নিন্দ্রা দেয়। ঘরের এক কোণে একটি আলমারিতে ঠাসা ইংরেজ-হিন্দুদের আমলের পুরাতন আইনের বই। তবে আলমারির কাঁচের দরজা অনেকদিন হল ভেঙে গিয়েছে বলে সে সব বইতে ধুলার প্রলেপ : সামনের ঘাসশূন্য, শুষ্ক মাঠ থেকে নিরন্তর যে-ধুলা ভেসে আসে সে-ধুলা ছোট ঘরটির সর্বত্র অবাধে বিচরণ করে একটি ঘন আবরণ ছড়িয়ে রাখে। কখনো-কখনো কেউ চৌকিদারকে ডেকে নিজের কুর্সিটা ঝেড়ে নিয়ে ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান করে, ঘরের অন্যত্র দৃষ্টি দেয় না; যে-সমস্যা সর্বব্যাপী তার বিষয়ে উদাসীনতাই হয়তো বুদ্ধিসঙ্গত।
তবে সেদিন সুরত মিঞার দৃষ্টি যেন পড়ে ঘরের ধুলার দিকে। তার চোখ ঘুরতে থাকে চতুর্দিকে : মেঝে, বইঠাসা কাঁচশূন্য আলমারি, বিবর্ণ দেয়াল, কোণে স্থাপিত সুরাহি-কিছুই তার দৃষ্টি এড়ায় না। এ-ধরনের অনুসন্ধান তার চরিত্রবিরুদ্ধ বলে শীঘ্র তা উপস্থিত সহযোগীদের মধ্যে কৌতূহলের সৃষ্টি করে; পারিপার্শ্বিক সম্বন্ধে তো বটেই, জীবন সম্বন্ধেও সুরত মিঞা সম্পূর্ণভাবে নিস্পৃহ-যে-জন্যে কদাচিৎ মক্কেল তার শরণাপন্ন হয়।
কী দেখছেন? কেউ প্রশ্ন করে।
সে উত্তর দেয় না; তার চোখ পূর্ববৎ ঘুরতে থাকে। বস্তুত সে কিছু দেখবার চেষ্টা করে না, শুনবারই চেষ্টা করে; হঠাৎ সে যে-অস্বাভাবিক একটি শব্দ শুনতে পায় তা কোত্থেকে আসছে তাই বুঝবার চেষ্টা করে চতুর্দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। হয়তো ঘরের কোণে একটা ডানা-ভাঙ্গা পাখি এসে পড়েছে। বা ইঁদুর কি? কিন্তু আওয়াজটা যেন কেমন। ক্রমশ সুরত মিঞার চোখে-মুখে বিস্ময়াভিভূত ভাব সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে, তারপর তাতে দেখা দেয় উপলব্ধির স্বচ্ছতা : এবার তার দৃষ্টি ধুলাচ্ছন্ন ছোট ঘরটি ত্যাগ করে খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে ঘাসশূন্য মাঠ অতিক্রম করে নদীর দিকে যায়, কারণ সে দিক থেকেই আওয়াজটি যেন আসে। সে আর দেখে না, শুধু শোনে, কী একটা কান্না শোনে। ঘরময় ততক্ষণে গভীর নীরবতা নেবেছে, যেন অন্যেরাও কান্নাটি শুনতে পেয়েছে।
এ-সময়ে কেউ আবার জিজ্ঞাসা করে, কী হল সুরত মিঞা?
সুরত মিঞার চমক ভাঙে। কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে থেকে সজোরে মাথা নেড়ে বলে, কিছু না।
ডাক্তার বোরহানউদ্দিন নদীর তীরে বাস করলেও কান্নাটি নিজের কানে শোনে নি, তবে একদিন রাতের বেলায় তারই সামনে স্থানীয় স্কুলের হেডমাষ্টার তা বেশ স্পষ্টভাবে শুনতে পায়। স্বাস্থ্য সম্বন্ধে হেডমাষ্টারের উকট চিন্তা এবং প্রয়াশ নানাপ্রকার কল্পিত বা কিছু সত্য ব্যাধির দরুন গভীর মানসিক অশান্তিতে ভুগে থাকে। সে-রাতে ডাক্তার বোরহানউদ্দিনের বাড়িতে উপস্থিত হয়ে তার দুর্বোধ্য ব্যাধির বিভিন্ন লক্ষণের সুদীর্ঘ বিবরণ দিচ্ছে-এমন সময়ে সহসা অস্বাভাবিকভাবে সে নীরব হয়ে পড়ে। প্রথমে তার মনে হয় কানে বুঝি ঝা-ঝা ধরেছে সেটি তার রোগের একটি নূতন লক্ষণ হবে। একটু অপেক্ষা করে কানে আঙ্গুল দিয়ে সে-আঙ্গুল ভীষণভাবে ঝাকে, কিন্তু তাতে কোনো ফল হয় না, ঝাঁ-ঝাঁ রবটি থামে না।
তারপর সহসা সে বুঝতে পারে।
এ কি সম্ভব? তারও কি মস্তিষ্কবিকৃতি ঘটেছে? ঘোর অবিশ্বাস সত্ত্বেও সে কিন্তু নিশ্চল হয়ে থাকে, ক্ষীণদেহ মানুষটির বড় ধরনের চোখ বিস্ফারিত হয়ে আরো বড় হয়ে ওঠে। তবে বিস্ময়ে নয়, ক্রোধে, কারণ সে-ও কান্নাটি শুনতে পেয়েছে মনে হলে নিজের ওপর তার ভয়ানক ক্রোধ হয়।
বোরহানউদ্দিনের দৃষ্টি লক্ষ্য করে অবশেষে ঈষৎ লজ্জা-লাল মুখে বলে, কানেও ঝাঁ-ঝাঁ ধরে মধ্যে-মধ্যে।
একদিন তবারক ভুইঞা বিস্মিত হয়ে তার স্ত্রী আমিরুনকে জিজ্ঞাসা করে, কী শুনছ?
আমিরুন মাথা হেলিয়ে শোনার ভঙ্গিতে স্থির হয়ে ছিল, সচকিত হয়ে বলে, না, কিছু শুনছি না। তবে লোকেরা যে কী কান্না শুনতে পায়, সে-কথা ভাবছিলাম।
ওসব বাজে কথায় কান দিয়ো না। স্ত্রী আমিরুনকে সে ভর্ৎসনার কণ্ঠে বলে।
কিন্তু এত লোক শুনতে পায় যে।
কোনো রকমের কানের ভুল বা খেয়াল হবে।
কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে আমিরুন উত্তর দেয়, তবু কথাটায় মনটা কেমন-কেমন করে যেন।
লোকটির দিকে একবার আড়চোখে তাকাই এবং একদা তার চেহারার যে-বর্ণনা শুনেছিলাম সে-বর্ণনার সঙ্গে তার মুখটি মিলিয়ে দেখবার চেষ্টা করি। তবে বহুদিন আগে শোনা বর্ণনা থেকে একটি মানুষকে চেনা সহজ নয় : কারো চরিত্র বা মুখের চেহারা বহুদিন এক থাকে না, কালের স্পর্শ পড়ে দুটিতেই। তাছাড়া একদিন তার চেহারা-চরিত্রের যে-বর্ণনা শুনেছিলাম সে-সবের সঙ্গে সে-দিনই আসল লোকটির তেমন সাদৃশ্য ছিল কিনা কে জানে। যাকে কখনো দেখি নি যার কণ্ঠস্বর শুনি নি যার চলনভঙ্গি মুখভঙ্গি বা মুদ্রাদোষ লক্ষ্য করার সুযোগও পাই নি, পরের মুখে তার কথা শুনলে আমরা তাকে সাধারণত মনে সদা-মওজুদ মানুষ-চরিত্র সম্বন্ধে ছাঁচে-ঢালা নির্দিষ্ট কতকগুলি নকশার একটির সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে লোকটি কেমন তা বুঝবার চেষ্টা করি। আমাদের সকলের মনে এমন কতকগুলি নকশা থাকে-মানুষ-চরিত্রের বিভিন্ন নিদর্শন। নানাপ্রকার দোষ-গুণের প্রতীক, যা আসলে মানবজাতি সম্বন্ধে আমাদের ব্যক্তিগত ধারণা-মতামত ছাড়া আর কিছু নয় : আমরা কেউ মানবজাতির দিকে তাকাই আশার চোখে, কেউ নিরাশার, কেউ বিশ্বাসের চোখে, কেউ অবিশ্বাসের, কেউ প্রেমের চোখে, কেউ ঘৃণা-বিদ্বেষের; আমরা কখনো তাতে সর্বপ্রকারের দুই প্রবৃত্তি, কখনো আবার নিষ্কলঙ্ক ফেরেশতার গুণাবলি আরোপ করি। অতএব যার কথা শুনি ঠিক তাকে নয়, তার নামে আমাদের নিজস্ব মতামতই বলিষ্ঠ করি, মুষ্টিমেয় কয়েকটি নিদর্শনের মধ্যে যে সর্বচরিত্র সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে তা ভুলে গিয়ে মানুষ-চরিত্র সম্বন্ধে আমাদের কিছু অনবগত নেই-সে-গর্বকে তুষ্ট করে আত্মতৃপ্তি লাভ করি। অজানা-অপরিচিত লোকটির কথা যে বলে তার বর্ণনাও দোষমুক্ত নয়, কারণ যে-মানুষ তার অন্তরপথে ঘুরে আবার বাইরে প্রকাশ পায় সে-মানুষ তার দৃষ্টিরঙে রঞ্জিত হয়ে পড়ে, নিঃস্বার্থ নিরপেক্ষ সততাও সে-রঞ্জন ঠেকিয়ে রাখতে পারে না। কেউ যখন কারো কথা বলে তখন সে কেবল তার কথাই বলে না, দশজনের কথা এবং নিজের কথাও বলে; কাউকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা করে বিচার করা সম্ভব নয়। বিস্ময় কী যে, যার বিষয়ে পরের মুখে শুনেছি তাকে যখন স্বচক্ষে দেখার সুযোগ হয় তখন দেখতে পাই কল্পনার লোকটির সঙ্গে তার সাদৃশ্য তেমন নেই, দুজন যেন ভিন্ন মানুষ।
