মিহির মণ্ডল বলে একটি লোক একদিন সকালে বলে, গভীর রাতে কী কারণে ঘুম ভেঙ্গেছে এমন সময়ে সে শুনতে পায় নদীর দিকে একটি মেয়েলোক যেন আর্তস্বর কাঁদছে। মিহির মণ্ডল কাপড়ের ব্যবসায়ী মোহনচাঁদের গদিতে কাজ করে; সাবধানী হুঁশিয়ার লোক, সত্যবাদী বলেও সুনাম। তবে মোহনচাঁদ তার স্বাভাবিক শ্লেষ্মঘন কণ্ঠে হাপর-হাসি হেসে-বক্তব্যের বিষয় যাই হোক, হাসিছাড়া মোহনচাঁদকে কল্পনা করা যায় না-বলে, মানুষের জীবনে আপদ-বিপদ অসময়েই আসে, অসময়েও তাকে পথ ধরতে হয়। কে জানে, কোনো মর্মান্তিক দুঃসংবাদ শুনে একটি মেয়েলোক নিশীথ রাতে নৌকায় সওয়ার হয়ে কোথাও যাচ্ছিল। সে-মেয়েলোকের বুকফাটা কান্নাই তার কর্মচারীটি শুনে থাকবে।
কথাটা যুক্তিসঙ্গত, নিতান্ত বিশ্বাসযোগ্যও বটে, কিন্তু কদিন ধরে মোজার মোছলেহউদ্দিনের মেয়ে সকিনা খাতুনও কি তেমন একটা কান্না শুনতে পায় বলে দাবি করে না?
পরদিন আরেকটি খবর শোনা যায়। সেটি এই যে, পক্ষাঘাতগ্রস্ত অশীতিপর বৃদ্ধ ঈমান মিঞা যে অন্ততপক্ষে পাঁচ বছর ঘর থেকে বের হয় নি, সে-ও একটি বিচিত্র কান্না শুনতে পেয়েছে। এত বয়সেও কানে তার দোষ-দুর্বলতা নেই, বরঞ্চ নড়াচড়া করার ক্ষমতা নেই বলে তার শ্রবণশক্তিটা অতি প্রখর হয়ে উঠেছে, বিড়ালের পদধ্বনিও সে শুনতে পায়। তাছাড়া, তার বাড়ি নদীর ধারে; বাড়ি এবং নদীর মধ্যে কেবল একটি কাঁঠালগাছ এবং সরু একটি পথ। নদীর কলতান, ঝড়ের সময়ে তার বিক্ষুব্ধ তরঙ্গের আর্তনাদ, কখনো-কখনো তার নীরবতাও সে শুনতে পায়; মধ্যে-মধ্যে নদীও জম্ভর মতো নিথর হয়ে ঘুমায়। তারপর নদীর বুক থেকে মাঝিদের কণ্ঠধ্বনি শোনে, যে কণ্ঠধ্বনি স্থলের মানুষের কণ্ঠধ্বনির মতো নয় : দুটি কণ্ঠ ভিন্ন ধরনের। তবে নদী থেকে কখনো কোনো কান্না শোনে নি, এবং সে-জন্যে সেদিক থেকে কান্নার শব্দটি শুনতে পেলে সে বড় বিস্মিত হয়েছিল। কেউ জিজ্ঞাসা করে, কান্নাটি কেমন? কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বৃদ্ধ ঈমান মিঞার পক্ষে সহজ নয়। উত্তর দেবার চেষ্টায় তার ঠোঁট কিছুক্ষণ নড়ে, হয়তো অন্য বৃদ্ধ মানুষের মতো বর্তমান সময়ের কোনো ঘটনার বিষয়ে উত্তর দিতে গিয়ে তার মন সুদূর অতীতে উপনীত হয় বলে চোখে দূরত্বের ভাব জাগে, কিন্তু প্রশ্নটির উত্তর দিতে পারে না। অবশেষে ঈমান মিঞা বলে, না, কান্নাটি কী রকম সে জানে না, কেবল জানে কণ্ঠটা কোনো মেয়েমানুষের, এবং আওয়াজটা নদীর দিকে থেকেই এসেছিল।
কান্নার কথাটি অবিশ্বাস করার আর যেন উপায় থাকে না; একজন নয়, দুজন নয়, তিন-তিনটে লোক শহরের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তা শুনতে পেয়েছে। সহসা কুমুরডাঙ্গার অনেকে এবার ঘোরতরভাবে শঙ্কাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কে কাঁদে, কেন কাঁদে, এ কান্নার অর্থই-বা কী? এ-সময়ে কান্নাটি শুনবার জন্যে কারো-কারো মনে একটি প্রবল কৌতূহলও দেখা দেয়। হয়তো তারা ভাবে, কোথাও যদি সত্যিই কিছু শোনা যায় তবে তা নিজের কানে শুনতে পেলে তার রহস্যভেদ করতে সক্ষম হবে। অন্যের অগোচরে তারা কান্নাটি শোনার জন্যে অপেক্ষা করতে শুরু করে, একা হলে একামনা সকর্ণতার মধ্যে দিয়ে, মানুষের কণ্ঠস্বর-মুখরিত স্থানে কাজে-কর্মে ব্যস্ত থাকলে থেকে-থেকে সমগ্র অন্তরে নিথর-নীরব হয়ে পড়ে, রাতে শুতে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ঘুম ঠেকিয়ে নিশ্চলভাবে জেগে থাকে।
তাদের এই শোনার চেষ্টা বা তাদের এই অপেক্ষা ব্যর্থ হয় না, কারণ শীঘ্র একে একে তাদের মধ্যে অনেকেরই মনে হয় তারাও কান্নাটি শুনতে পেয়েছে।
ওষুধের দোকানের রুকুনুদ্দিন বাড়ি থেকে বের হচ্ছিল এমন সময়ে তার স্ত্রী সচকিতকণ্ঠে তার স্বামীকে জিজ্ঞাসা করে সে কিছু শুনতে পাচ্ছে কিনা। তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। পেছরেন দেয়ালের পাশে কাঁঠালগাছে অসংখ্য পাখি কলরব তুলে হয়তো সারাদিনের খবরাখবর আদান-প্রদান করতে শুরু করেছে, দূরে রাস্তায় কোনো
গরুগাড়ি চাকায় ক্যাচর-ক্যাচর শব্দ করে বাড়ির পথ ধরেছে, তাছাড়া চতুর্দিকে গভীর নীরবতা, কোথাও কোনো শব্দ নেই। রুকুনুদ্দিন কিছু শুনতে না পেলেও তার স্ত্রী গভীর বিস্ময়ে কী যেন শুনে চলে। তারপর আওয়াজটি আর শুনতে না পেলে স্বামীর দিকে তাকিয়ে কেমন এক গলায় বলে, সে যেন কী-একটা কান্নার আওয়াজ শুনতে পেয়েছিল।
বাজারের পথে তার দোকানে বসে মুদিখানার মালিক ফনু মিঞা ছাদ থেকে ঝোলানো লণ্ঠনের পতেটা একটু উঁকিয়ে দিতে যাবে এমন সময়ে সহসা সে চমকে ওঠে। প্রথমে তার মনে হয়, কোথাও একটা–সাঁ আওয়াজ উঠেছে। কিন্তু একটু কান পেতে শোনার পর বুঝতে পারে, আওয়াজটি যেন তীক্ষ্ম বিলম্বিত নারীকণ্ঠের কান্নার মতো যে-আওয়াজ ক্রমশ নিকটে আসছে বা হয়তো কেবল উচ্চতর হয়ে উঠছে। অবশেষে আওয়াজটি থামলে মুদিখানার মালিক লণ্ঠনের কথা ভুলে অনেকক্ষণ নিথর হয়ে থাকে।
শহরের অন্য পাড়ায় হবু মিঞা মুহুরির স্ত্রী জয়তুনবিবি কঙ্কালসার অসুস্থ ছেলের মুখে দাওয়াই দেবার চেষ্টা করছিল। ছেলের মুখে দাওয়াই দেয়া সহজ নয়; চামচ-ভরা ওষুধ নিয়ে অনুনয়-মিনতি করছে এমন সময়ে মুহুরির স্ত্রী হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে পড়ে, কারণ হঠাৎ সে শুনতে পায় অদূরে কে যেন বাঁশি বাজাতে শুরু করেছে : কেমন মন উদাস করা করুণ সুর, তেমন উঁচু নয়। মধ্যে-মধ্যে দূরে কেউ বাঁশি বাজায়, তবে বেশ রাত হলেই বাজায়, তাও সচরাচর চাঁদনি-রাতে। মহুরির স্ত্রী শীঘ্র বুঝতে পারে আওয়াজটা ঠিক বাঁশির মতো নয়, তাতে সপ্তস্বরের খেলা নেই, কোনো সুর নেই, বাঁশি হলেও উচ্চ একটি সরে যেন থেমে রয়েছে। তারপর সে চমকে ওঠে, বুকের ভেতরটা সহসা থরথর করে কাঁপতে শুরু করে। তবে সে কি বিচিত্র কান্নাটি শুনছে? হৃদপিণ্ডের স্পন্দন আরো দ্রুততর হয়ে উঠে তারপর সমস্ত দেহে ছড়িয়ে পড়ে, মনে কী-যেন একটা দুর্বোধ্য আলোড়ন উপস্থিত হয়। তবু যা সে শুনতে পায় তা স্পষ্টভাবেই শুনতে পায়, যা বাঁশির আওয়াজ নয় নারীর-কণ্ঠের কান্নার ধ্বনিঃ তীক্ষ্ম কিন্তু করুণ স্বর, গলাছাড়া আর্তনাদের মতো হলেও আবার গোপন-কান্নার মতো সংযত, অশ্রুহীন হাহাকার হলেও আবার বর্ষাসিঞ্চিত হাওয়ার মতো সজল।
