বাপজান আইনকানুনের কথা বিশেষ জানত না, তবু প্রথমে আইনকানুনের কথাই সে ভাবে। যা জলজ্যান্ত মিথ্যা তা মিথ্যাই, সে-বিষয়ে কোনো তর্কের অবকাশ নেই-তা বুঝতে পারলেও আদালতের কথা বারবার তার মনে আসে যেন লোকটি ইতিমধ্যে মুহাম্মদ মুস্তফাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সে ভালোভাবে বুঝে নিয়েছিল যে সেদিন মুহাম্মদ মুস্তফা মুক্তাগাছি গ্রামে প্রাচীন বটগাছটির তলে দেখা দিয়েছিল বলেই ছেলেটিকে খুঁজে বের করে কালু মিঞার জামাই আমাদের বাড়ি উপস্থিত হয়েছে, কিন্তু খেদমতুল্লাকে নয় তার সন্তানকে কেন ছেলেটির জন্মদাতায় পরিণত করার চেষ্টা করছে। তা বুঝতে পারে নি। সে ভাবে, বাপ বেঁচে নেই বলে সৎভাইকে জন্মদাতায় রূপান্তরিত করলে ভরণপোষণ আদায় করা হয়তো সহজ এবং এমন ধরনের রূপান্তর যে অতিশয় জঘন্য তা হয়তো নীচ প্রকৃতির লোকেদের পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। তবে সহসা সে বুঝতে পারে। সে বুঝতে পারে, কথাটি আদৌ ভরণপোষণের কথা নয়, যুক্তিতর্ক নিয়েও তারা আসে নি।
বজ্রাহত মানুষের মতো বাপজান কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে থাকে, তারপর তার দৃষ্টি যায় মুহাম্মদ মুস্তফার দিকে। ততক্ষণে বাপজানের চোখে খুন চড়েছে। উন্মাদের মত চিৎকার করে সে বলে, চুপ করে দাঁড়িয়ে আছ কেন? তুমি মরদ না মাগী, বুকে একটু হিম্মত নাই?
হয়তো কালু মিঞার জামাই এসে আমাদের যা বলে তা মুহাম্মদ মুস্তফাও প্রথমে সম্যকভাবে বোঝে নি; এমন কথা ছেলে কী করে বোঝে? তবে বাপজানের উক্তির পর না বুঝে উপায় থাকে না। কয়েক মুহূর্ত সে পূর্ববৎ নিমীলিত চোখে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, পূর্ববৎ দোয়াদরুদ পড়ে চলে, যেন বাপজানের কথা শোনে নি। তারপর সহসা সে চোখ খুলে লোকটির দিকে তাকায়। এ-সময়ে ষণ্ডাগোছের দুটি সঙ্গী থাকা সত্ত্বেও লোকটি ঈষৎ ভীত হয়ে থাকবে, কারণ আড়চোখে সে মুহাম্মদ মুস্তফার দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে থাকে। কয়েক মুহূর্ত কাটে।
তারপর মুহাম্মদ মুস্তফা বমি করতে শুরু করে। যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখানেই সে, বসে পড়ে দেহের অভ্যন্তরে কী-একটা ভীষণ শব্দ করে-করে বমি করতে থাকে। দুপুরের আগে যা খেয়েছিল তা তখনো হজম হয় নি, সে-সব খণ্ড-খণ্ড হয়ে বেরিয়ে আসে, ন্যাক্কারজনক একটি দুর্গন্ধ ঘরে ভারি-হয়ে-থাকা গো-দেহ এবং গোবরের গন্ধের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে পড়ে। আমার মনে হয়, এতক্ষণ নিঃশব্দে সে যে-সব দোয়াদরুদ পড়ছিল সে-সব দোয়াদরুদ বেরিয়ে আসছে। সে-সব কোথাও পৌঁছায় নি।
এর কিছুক্ষণ পরে ষণ্ডাগোছের দুটি লোক এবং ছেলেটিকে নিয়ে কালু মিঞার জামাই বমি-ছড়ানো স্থানটি এড়িয়ে ঘরত্যাগ করে বাড়িমুখো হয়। তখন বৃষ্টি কিছু ধরেছে।
তারপর বাপজান কিছু বলে নি। বস্তুত সহসা তার মুখের কথা শুকিয়ে যায় যেন কিছুই আর বলার নেই। এ-ও মনে হয় হঠাৎ তার মধ্যে সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে পড়েছে। সন্ধ্যার কিছু আগে মুহাম্মদ মুস্তফা প্রবল বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে গেলে সে কোনো কৌতূহলও দেখায় নি।
অনেক রাত পর্যন্ত আমরা মুহাম্মদ মুস্তফার জন্যে অপেক্ষা করি, কোথায় গিয়েছে। কেন গিয়েছে কী করছে-এ-সব বিষয়ে কোনো কৌতূহল প্রকাশ করতে সাহস হয় নি। বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ে। দক্ষিণ-ঘরে উত্তর-ঘরে যে যার বিছানায় আশ্রয় গ্রহণ করে, কেবল মুহাম্মদ মুস্তফার মা আমেনা খাতুন উত্তর-ঘরে এসে খোদেজাকে নিয়ে টিপটিপ করে জ্বলতে থাকা একটি পিদিমের আলোয় কাঁথা সেলাই করতে বসে। একসময়ে : তাদের দিকে দৃষ্টি গিয়েছে এমন সময়ে দেখতে পাই আমেনা খাতুন তার বুক উন্মুক্ত করে খোদেজাকে নিম্নকণ্ঠে বলছে, সে-বুকের দুধ দিয়েই সে একদিন শিশু মুহাম্মদ মুস্তফার ক্ষুধা-তৃষ্ণা দূর করত। খোদেজা ঘুম জড়ানো চোখে অনেকটা নির্বোধের মতো আমেনা খাতুনের বুকের দিকে নয়, মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে কয়েক মুহূর্ত।
মুহাম্মদ মুস্তফা যখন ফিরে আসে তখনো বৃষ্টি থামে নি। তবে সে-সময়ে তাকে দেখি নি; দক্ষিণ-ঘরে কে যেন অনুচ্চ স্বরে কথা বলে উঠলে বুঝতে পারি সে ফিরে এসেছে। ততক্ষণে আমেনা খাতুন দক্ষিণ-ঘরে ফিরে গিয়েছিল।
সে-রাতে মুহাম্মদ মুস্তফা কোথায় গিয়েছিল, কার সঙ্গে দেখা করেছিল, দেখা করে কী বলেছিল-এ-সব কথা কখনো সে না বললেও আমরা ঠিক অনুমান করতে পেরেছিলাম। তারপর মুক্তাগাছি গ্রামের কালু মিঞার বাড়ির দিকে থেকে আর কোনো সাড়া পাওয়া না গেলে, এবং বাপজান তার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করলে অনুমানটি নিশ্চিত জ্ঞানে পরিণত হয়।
তবারক ভুইঞার মুখে একটি হাসির আভাস দেখা দিয়েছে যেন। হয়তো এতদিন পর কুমুরডাঙ্গা নামক মহকুমা শহরের মোক্তার মোছলেহউদ্দিনের মাস্টারনি মেয়ে সকিনা খাতুনের অদ্ভুত ধারণাটির কথা মনে পড়ায় তার একটু হাসি পেয়েছে। শ্রোতাদের মধ্যে সহসা কেউ সশব্দে হেসে ওঠে। হাসি ঠিক নয়, নাকে একটা আওয়াজ হয়, যে-আওয়াজ নাকে জেগে-উঠে নাকেই থেমে যায়। ততক্ষণে তবারক ভুইঞার মুখের হাসি মিলিয়ে গিয়েছে।
অদ্ভুত ধারণা, তবু তা শোনার পর কী যেন হয়, যাদের মনে মেয়েটির প্রতি ধিকিধিকি করে একটা রাগ জ্বলতে শুরু করেছিল, তাদেরই কেউ-কেউ এবার কী-যেন শুনতে শুরু করে, তবারক ভুইঞা বলে।
