তবে ক-দিন আগে মুহাম্মদ মুস্তফা পথ ভুলে মুক্তাগাছি গ্রামে কালু মিঞার বাড়ির সামনে উপস্থিত হয়ে ভীমরুলের চাকে কাঠি দেয়ার মতো কিছু করেছিল-তা যদি তখন বুঝতে পারতাম তবে প্রবল অনিচ্ছা সত্ত্বেও যে-কাজ করার ভার পড়েছিল আমার ওপর, সে-কাজটি করতাম। কেবল করলে কোনো ফল হত কিনা জানি না। ভীমরুলের চাকে একবার কাঠি দিলে রোষান্বিত ভীমরুলদের বশ মানানো সহজ নয়।
পরদিন দুপুরের দিকে কালু মিঞার জামাই দুটি ষণ্ডাগোছের লোক এবং একটি বারো-তেরো বছরের ছেলে সঙ্গে করে আমাদের বাড়ির সামনে দেখা দেয়। বাপজানই বোধ হয় প্রথম তাদের দেখতে পায়। একটু পরে কেমন বিচলিত হয়ে বাপজান ভেতরে আসে এবং দক্ষিণ-ঘর থেকে মুহাম্মদ মুস্তফাকে ডেকে নিয়ে আবার বাইরে যায়।
সেদিনের কথা মনে পড়লে আকাশের ঘনঘটা, এবং অঝোরে অবিচ্ছিন্ন ধারায় বৃষ্টি পড়ার কথাই মনে পড়ে। সেদিন এক মুহূর্তের জন্যেও যেন বৃষ্টি থামে নি, কখনো কখনো ধারাটা কিছু ক্ষীণ হয়েছে তবে আবার মুষুলধারায় নেবে আসতে দেরি হয় নি। স্তরে-স্তরে সজ্জিত পুঞ্জীভূত মেঘের তলেও দিনটা হয়তো তেমন অন্ধকার ছিল না, কিন্তু স্মৃতিতে কেবল কী একটা বিষাদভরা সুনিবিড় তমসাচ্ছন্ন দিনই দেখতে পাই। যে-বৃষ্টি অঝোরে ঝরেছিল ক্লান্তিহীনভাবে সে-বৃষ্টিতে, যে-ঘনীভূত অন্ধকারে দিনটা সন্ধ্যার মতো হয়ে উঠেছিল সে-অন্ধকারে সব কিছু মুছে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় নি কেন? যে-কথা সত্য নয় কিন্তু অতিশয় জঘন্য, সে-কথাই-বা কেন শুনতে হয়েছিল, অবিশ্রান্ত বৃষ্টির উচ্চ শব্দের তলে তা ঢাকা পড়ে যায় নি কেন?
বাহিরঘরে পৌঁছুতে আমার দেরি হয় নি। আমাদের বাহিরঘরটি নামেই বাহিরঘর, আসলে সেটি গোয়ালঘর। একপাশে শুধু নিচু করে তৈরি বাঁশের মাচার মত; সে-মাচায় রাখাল লোক রাত্রিযাপন করে। সে-ঘরে উপস্থিত হলে দেখতে পাই কালু মিঞার জামাই এবং ষণ্ডাগোছের লোকদুটি মাচার ওপর বসে। দরজার কাছে বাপজান, পাশে দাঁড়িয়ে মুহাম্মদ মুস্তফা। তারপর মাচার পশ্চাতে আবছা অন্ধকারের মধ্যে ছেলেটিকে দেখতে পাই। আবছা অন্ধকারে তার চেহারা ভালো করে দেখতে না পেলেও কেমন চমকে উঠি, কারণ, মনে হয় ছেলেটি যেন খেদমতুল্লার একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ : একই মুখে আকৃতি, একই নাক, একই থুতনি, একই ধরনের কেমন ছড়ানো কান। তারপর ছেলেটি আমার দিকে ক্ষণকালের জন্যে তাকালে তার চোখে যে-রুক্ষতা দেখতে পাই সে-রুক্ষতাও অবিকল মুহাম্মদ মুস্তফার জন্মদাতার চোখেরই রুক্ষতা; খেদমতুল্লার চোখে এমন একটি ভাব ছিল যে মনে হত নিদ্রা বলে কোনো জিনিস সে জানত না।
বাপজান বড় উত্তেজিত হয়ে কথা বলছিল। হয়তো আসলে সে তখন উত্তেজনার চেয়ে ক্রোধ-আক্রোশই বেশি বোধ করছিল, কিন্তু যা সে সবেমাত্র শুনতে পেয়েছে তাতে সে এমনই বিহ্বল হয়ে পড়েছিল যে ক্রোধ-আক্রোশ প্রকাশ করার ক্ষমতা তার ছিল না। বাপজান কী বলছে তা প্রথমে বুঝতে পারি নি; বাপজান বোধগম্য ভাষায় কিছু বলার ক্ষমতাও সাময়িকভাবে হারিয়ে ফেলে থাকবে। থেকে-থেকে একটি মেয়েলোকের নাম শুনতে পাই, কিন্তু বাপজান তার বিষয়ে কিছু জানে বলে মনে হয় না। সে কে, তা আমিও গোড়াতে ধরতে পারি না। তারপর সহসা একটি মুখ ভেসে ওঠে মনশ্চক্ষে। একটু পরে ভালোভাবেই মনে পড়ে তার কথা : খেদমতুল্লা তার জীবনের শেষভাগে কী দুর্বোধ্য তাড়নায় একটি-একটি করে যে-কয়েকজন বাদি ঘরে আমদানি করেছিল সে তাদেরই একজন। গ্রাম্য মেয়ে, নাক ভোতা, চোখ কুতকুতে, রঙ বেশ কালো। তবে মুখে-চোখে আবার কালো মিছরির মিষ্টতা। সুযোগ পেলেই হাতমুখ নেড়ে কাঁচের চুড়িতে ঝঙ্কার তুলে সে সোনাপুর গ্রামের মস্ত বিলের কথা বলত, ছোটবেলায় ভাইবোনে মিলে রাতের অন্ধকারে সে-বিলে নাকি মাছ ধরত। অমনি করে অনেকে মাছ ধরে, পরে ভুলেও যায়, বা সে-বিষয়ে কিছু বলার কোনো কারণ দেখতে পায় না। কিন্তু কোনো কারণে বিলে মাছ-ধরার কথা ভুলতে পারে নি সে। হয়তো মাছ ধরা নয়, যা ভুলতে পারে নি তা বিলের স্মৃতি : যে-বিলের পানি একদিন তার অন্তরে বন্যার মতো ছড়িয়ে পড়েছিল সে-পানি তখনো হয়তো নেবে যায় নি, সে-পানিতে তখনো তার অন্তর মাছের মতো খেলা করত। হয়তো বিলের কথা এমনভাবে তার মনে পড়ত কারণ খেদমতুল্লার সংসারে সে জাওলা মাছের মতোই বোধ করত।
মেয়েটির নাম কেন বারেবারে শুনতে পাই তা এবার বুঝি। এবার ছেলেটির দিকেও আবার তাকাই। সাদৃশ্যটা অত্যাশ্চর্য : মৃতলোকটি যেন বালকরূপে ফিরে এসেছে। তবে মুখটা এবার ভালো করে দেখতে পাই না। কী কারণে হঠাৎ সে লজ্জা বোধ করতে শুরু করেছে বলে তার মাথা ঝুঁকে পড়েছে বুকের ওপর, কাঁধটা উঠে এসেছে। নতমুখে সে পায়ের নখ দিয়ে মাটি আঁচড়াতে থাকে।
তবে বাপজানের কণ্ঠস্বর ততক্ষণে অতিশয় উচ্চ হয়ে উঠেছে, যে-ক্রোধ-আক্রোশ এতক্ষণ প্রকাশের পথ খুঁজে পায় নি তা দুর্বার বেগে ফেটে পড়েছে। জামাইটি একবার এক পলকের জন্যে বাপজানের দিকে তাকায়, ভাবভঙ্গি অবিচল, কেবল মনে হয় সে বাপজানের প্রচণ্ড ক্রোধ-আক্রোশের কোনো কারণ দেখতে পায় না। বস্তুত তখন আমিও ঠিক দেখতে পাই নি।
সে-সময়ে মুহাম্মদ মুস্তফার ওপর আমার দৃষ্টি পড়ে। দেখতে পাই চোখ বুজে সে কেমন নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তারপর আরেকটি জিনিস নজরে পড়ে। তার ঠোঁট কাঁপছে, প্রচণ্ড শীতে ঠিরঠির করে কাঁপার মতো। একটু পরে বুঝতে পারি, ঠোঁট দুটি কাঁপছে না, সে নিঃশব্দে দ্রুতগতিতে কী বলছে, সে যেন দোয়াদুরুদ পড়ছে। হয়তো তার ঠোঁটের নিঃশব্দ কম্পন দেখেই সহসা সব কিছু পরিষ্কার হয়ে ওঠে, বাপজানের কথা যা হেঁয়ালির মতো মনে হয়েছিল তা বোধগম্য হয়ে ওঠে, সঙ্গে-সঙ্গে ভেতরটা কেমন শীতল হয়ে পড়ে। তখন মেঘের ভারে নুয়ে-পড়া আকাশ থেকে উচ্চ শব্দে ঝরঝর করে বৃষ্টি পড়ছিল, কিন্তু হয়তো কিছুক্ষণ সে-শব্দ কানে পৌঁছায় নি, হয়তোবা কিছুক্ষণ কিছু দেখতেও পায় নি। মনে বারবার একটি প্রশ্নই জাগে : এ কী-ধরনের কথা বলতে এসেছে লোকটি? তারপর সহসা বৃষ্টির শব্দ শুনতে পাই। মনে হয় মুষলধারে ঝরতে-থাকা বৃষ্টির শব্দ নয়, মহাপ্লাবনের গর্জন শুনছি, কোথাও মহাপ্লাবন শুরু হয়েছে যে-মহাপ্লাবনে ষণ্ডগোছের লোকটি সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে ভেসে যাবে। তারপর তাদের দেখতে পাই : প্রথমে ষণ্ডাগোছের লোক দুটিকে। তারা কেমন নিশ্চল ভঙ্গিতে বসে। তারপর দৃষ্টি যায় কালু মিঞার জামাই-এর দিকে। এবার তার মুখে হয়তো অস্বাভাবিক কিছু দেখতে পাব ভেবেছিলাম কিন্তু তাতে অস্বাভাবিক কিছু নজরে না পড়লে বিস্মিত হই : অতি সাধারণ মধ্যবয়সী একটি চেহারা, চ্যাপটা ধরনের মাথা, ঈষৎ ভারী চোয়াল, কানের প্রান্তে মোটা কর্কশ লোম। মুখে কেমন বেজার ভাব, যেন কারো অন্যায় আচরণে সে অসন্তুষ্ট, তাছাড়া সে-মুখে কোনো অস্বাভাবিকতার বিন্দুমাত্র স্পর্শ নেই। তবু সে-ই কথাটি বলেছে, সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে দুটি ষণ্ডাগোছের লোক এবং বারো তেরো বছরের একটি ছেলে যে খেদমতুল্লার একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ। ছেলেটি হয়তো খেদমতুল্লারই ঔরসজাত সন্তান, তারই রক্তমাংস এবং লালসায় সৃষ্ট : তা বিশ্বাস্য। কিন্তু তা না বলে এমন একটি অবিশ্বাস্য কথা বলছে কেন? ছেলেটির মা যদি বলেই থাকে খেদমতুল্লা নয় মুহাম্মদ মুস্তফাই তার বাপ-তা কেউ বিশ্বাস করবে কেন? সে কথাই বাপজান বারবার চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করছিল। একটু পরে জামাইটির মুখের অসন্তুষ্টির ভাবটি একটু গাঢ় হয়েছিল কেবল, তার আত্মসংযমে টোল পড়ে নি। সে শান্ত অনুচ্চ গলায় বলেছিল, সে কেবল একটি অসহায়া অবলা নারীর কথা বহন করে এনেছে। সে-ই বলে খেদমতুল্লা নয়, মুহাম্মদ মুস্তফা ছেলেটির জন্মদাতা। সত্যাসত্য বিচারালয়ে নির্ধারিত হবে, কারণ ছেলেটির মা মনস্থির করেছে ছেলেটির জন্মদাতা সন্তানের ভরণপোষণের ব্যবস্থা না করলে উকিল সঙ্গে নিয়ে আদালতে হাজির হবে। অনেক ন্যায়পরায়ণ দরদবান লোক তাকে সাহায্য করতে প্রস্তুত। কিন্তু এতদিন পরে কেন, কোথায়-বা ছেলেটিকে লুকিয়ে রেখেছিল এতদিন, লোকটি উত্তরে বলেছিল, এতদিন ছেলেটির এক মামা দয়াপরবশ হয়ে তার দেখাশুনা করছিল, কিন্তু কিছুদিন হল রক্তবমি করে সে ইহলোক ত্যাগ করে চলে গেছে, তার দেখাশুনা করার আর কেউ নেই। তাছাড়া এতদিন কারো রক্ষনাবেক্ষণের ভার নেবার ক্ষমতা ছিল না মুহাম্মদ মুস্তফার, এখন সেয়ানা হয়েছে, অনেক পড়াশুনা করে লায়েক হয়েছে।
