তবে যারা কিছু করতে পারে নি তাদের মনে সে-সময়েই আশাটির জন্ম হয় : বড় হয়ে মুহাম্মদ মুস্তফা কিছু করবে। তাই তার বাপের মৃত্যুর পর সে যখন পড়াশুনা করে যাবে বলে দৃঢ়সংকল্প হয় তখন সে-সংকল্পের মধ্যে একটি অর্থই দেখতে পায় সবাই একদিন কিছু করতে চায় বলে সে পড়াশুনা করে প্রথমে মানুষ হতে চায়। তার চরিত্রগত সাবধানতা-সতর্কতার মধ্যেও তার সেই অনুচ্চারিত উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত দেখতে পায় : একবার মানুষ হয়ে শক্তি-সামর্থের অধিকারী না হওয়া পর্যন্ত হুশিয়ার হয়ে চলা সমীচীন নয় কি? তারা কেউ বিশ্বাস করে নি খেদমতুল্লা অতিশয় দুর্বৃত্ত চরিত্রের লোক ছিল বা নিদারুণ শাস্তিটা তার প্রাপ্য ছিল-এসব মুহাম্মদ মুস্তফা নির্বিবাদে গ্রহণ করে নিয়েছে। তা কী করে সম্ভব? বাপ-মায়ের বিষয়ে কোনো সন্তানের হৃদয় লৌহগঠিত নয়। তাছাড়া তা বিশ্বাস করলে জীবনে আর থাকে কী? এমন একটা ধারণাতেই কোথাও সমস্ত কিছু শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায় না কি?
মুহাম্মদ মুস্তফা যে দৈবক্রমে কালু মিঞার বাড়ির সামনে উপস্থিত হয় নি-তা প্রথমে তার মুখের ওপর বলতে আমাদের সাহস হয় নি; ততদিনে প্রায়-গ্রামছাড়া উচ্চশিক্ষার্থী মুহাম্মদ মুস্তফা সকলের অজান্তেই দূরে, কিছু উর্ধ্বেও চলে গিয়েছে, এবং স্নেহমমতা বা শুভাকাঙ্খার কমতি না হলেও তার এবং বাড়ির মধ্যে ইতিমধ্যে একটি অদৃশ্য প্রাচীর গড়ে উঠেছিল বলে সম্পর্কে পূর্বের সরলতা বা স্বচ্ছন্দতা ছিল না। তবে আমাদের মনে কোনো সন্দেহ থাকে না যে, স্ব-ইচ্ছায় সজ্ঞানেই মুহাম্মদ মুস্তফা কালু মিঞার বাড়ির সামনে উপস্থিত হয়েছিল। শুধু তাই নয়, সেখানে তার আবির্ভাব এবং একদিন কালু মিঞার সম্বন্ধে লোকেরা যা বলাবলি করত এ-দুটির মধ্যে সম্বন্ধ না থেকে পারে না। পথ ভুল হয় কী করে? যারা নিয়মিতভাবে গ্রামে বসবাস করে তাদের মতো সময়-অসময়ের ধুলা উড়িয়ে বা কাদা ভেঙ্গে সে আর সারা অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায় না, হয়তো অঞ্চলটি তেমন আর পুঙ্খানুপঙ্খভাবে জানেও না, কারণ কয়েক বছর যাবৎ। ছুটিছাটাতে বাড়ি এলে সচরাচর বই-খাতাপত্রেই ডুবে থাকে, বাইরে গেলেও সামনের মাঠ ধরে কিছু বেড়িয়ে ফিরে আসে। তবু সে বিদেশী নয়। ভয়ানক ঝড়-বৃষ্টি হোক, চোখে দেখা-যায়-না এমন অন্ধকারে পরিচিত নিশানা সব নিশ্চিহ্ন হয়ে যাক, কোনো কারণে সে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ুক, তবু পথ-হারানো সত্যি অসম্ভব।
প্রথমে বাড়িতে একটা গম্ভীর ভাব নেবে আসে, গোপনে-গোপনে আমরা মুহাম্মদ মুস্তফার আচরণ লক্ষ্য করে দেখতে শুরু করি যদি তার মধ্যে তার পরবর্তী চালের বা তার পরিকল্পনার কোনো ইঙ্গিত দেখতে পাই। তার মা আমেনা খাতুন হঠাৎ তার জন্যে। ভাপা পিঠা বানাতে বসে। সে-পিঠা মুহাম্মদ মুস্তফার বড়ই প্রিয়। উত্তর-বাড়ি থেকে মা জান এবং খোদেজা ছুটে আসে আমেনা খাতুনকে সাহায্য করবার জন্যে। এক সময়ে আমেনা খাতুনের চোখ ছাপিয়ে সহসা অশ্রু দেখা দেয়। তবে তৎক্ষণাৎ নিজেকে সে সংযত করে এই ভয়ে যে কেন কাঁদছে তা কেউ জিজ্ঞাসা করলে কী উত্তর দেবে? হয়তো সবাই যখন উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল এই ভেবে যে মুহাম্মদ মুস্তফা কিছু করবে তখন মায়ের প্রাণেই কেবল একটা আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল : কালু মিঞাই কি তার। বাপকে খুন করে নি?
সেদিন অপরাহ্নবেলায় মা-জান উত্তর-ঘরের ছায়ায় উঠানে বসে খোদেজার চুলে বেণী বাঁধছিল এমন সময় বাইরে থেকে আমার বাপজানের গলা শোনা যায় : ক-দিন ধরে বিকল-হয়ে-থাকা ঢেঁকিটি সারাবার জন্যে বাপজান ছুতার মিস্তি ডেকে নিয়ে এসেছে এবং মেয়েদের উঠান থেকে সরে যেতে বলছে। মেয়েরা অদৃশ্য হয়ে গেলে ছুতার মিস্ত্রিকে নিয়ে ভেতরে এসে উঠান অতিক্রম করছে এমন সময়ে আমরা শুনতে পাই বাপজান লোকটিকে কালু মিঞার বাড়ির সামনে মুহাম্মদ মুস্তফার আবির্ভাবের কথা বলছে। বাপজানের গলা বেশ চড়া। ছুতার মিস্ত্রির সঙ্গে ঢেঁকির ঘরে ঢোকার পরেও তার উচ্চকণ্ঠ উত্তর-ঘরে দক্ষিণ-ঘরে, হয়তো বেড়ার ওপাশে ছোট চাচার ঘরেও ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। তার কণ্ঠে গর্বের ভাব, যেন মুহাম্মদ মুস্তফা এমন একটি কাজ করেছে যার দরুন লজ্জিত অপমানিত পরিবারের সম্মান রক্ষা হয়েছে বা হতে যাচ্ছে। বিবরণে কিছু অতিরঞ্জনও। নিঃসন্দেহে ছুতার মিস্ত্রির এই ধারণা হয় যে মুহাম্মদ মুস্তফা কালু মিঞার সঙ্গে দেখা করেছিল, তাকে শাসিয়েছিলও, না হলে গৃহস্বামীর মুখ ভয়ে এমন সাদা হয়ে উঠেছিল তা মুহাম্মদ মুস্তফা কী করে জানবে?
এ-সময়ে আমার বুকটা দুরুদুরু করে ওঠে। আমি জানতাম, দক্ষিণ-ঘরে চৌকিতে হাঁটু তুলে ঝুঁকে বসে মুহাম্মদ মুস্তফা পড়ছিল; বাপজানের উচ্চকণ্ঠ তার কর্ণগোচর হয়ে থাকবে। ছুতার মিস্ত্রি ঢেঁকিঘরে বলে এবার মা-জান এবং খোদেজা বেরিয়ে আসে, চুলবিনুনির বাকি কাজ ঘরেই শেষ হয়েছে। খোদেজা কলসি হাতে বাড়ির পেছনে পুকুরের দিকে রওনা হয়, তবে মা-জান উঠানে দাঁড়িয়ে থাকে-কানটা চেঁকিঘরে কিন্তু চোখ দক্ষিণ-ঘরে অদৃশ্য মুহাম্মদ মুস্তফার দিকে। তখনো ঢেঁকিঘরে বাপজান মুহাম্মদ মুস্তফার কথা বারবার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলছিল, এবং একই কথার পুনরাবৃত্তিতে অতিরঞ্জণটাও বৃদ্ধি পাচ্ছিল। হয়তো আমার মতো মা-জানের মনেও এই ভয় দেখা দেয় যে মুহাম্মদ মুস্তফা সহসা দক্ষিণ-ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বাপজানের কথা মিথ্যা বলে ঘোষণা করে আমাদের আশা-উত্তেজনার সমাপ্তি ঘটাবে।
