তবে মুহাম্মদ মুস্তফা বেরিয়ে আসে নি, তার কোনো সাড়াও পাই নি। আমাদের মনে যদি কিছু সন্দেহ বাকি ছিল সে-সন্দেহ এবার দূর হয়, এবং তখন থেকে বাড়ির সকলে নিতান্ত খোলাখুলিভাবে সেদিনের ঘটনাটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করতে শুরু করে, মুহাম্মদ মুস্তফা নিকটে থাকলেও দমিত হয় না। মুহাম্মদ মুস্তফা নীরব হয়েই থাকে, মুখে আত্মমগ্নভাব, হয়তো ঈষৎ বিহ্বলতা, যেন বাড়ির লোকদের কথায় তার মনে সন্দেহ জেগেছে সে সত্যি দৈবচক্রেই কালু মিঞার বাড়ির সামনে উপস্থিত হয়েছিল কিনা সে-বিষয়ে। এ-সময়ে বাড়ির লোকেরা খেদমতুল্লার স্মৃতি স্মরণ করে নানাভাবে মৃত ব্যক্তিটির গুণ গাইতে শুরু করে। এটা নূতন নয়, তবে এমন উচ্ছ্বসিতভাবে সমস্বরে তার গুণকীর্তন কখনন করে নি। সে নয়, সমাজই অসৎ নির্দয় নির্মম ন্যায়বিচারজ্ঞানশূন্য-যে-সমাজ তাকে সর্বপ্রকারে নিপীড়িত করেছিল। সে যদি অমানুষিক পরিশ্রম করে স্ত্রী-পুত্রের কথা ভেবে সৎ উপায়ে দুটি দানার ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়েছিল, দয়াহীন পাষণ্ড মানুষেরা সে-দুটি দানা থেকে তাকে বঞ্চিত করতে দ্বিধা করে নি। এমন একটি সময় আসে যখন অন্যায়-অবিচার সহ্যাতীত হয়ে পড়ে। যে সাপ কারো কোনো ক্ষতি করতে চায় না তাকে অযথা অকারণ মারতে গেলে সে যেমন ফণা তুলে ফুঁসে দাঁড়ায়, তার মুখে বিষ চড়ে-তেমনি একদিন খেদমতুল্লাও রুখে দাঁড়িয়েছিল, তার মুখে প্রতিহিংসার বিষ এসে গিয়েছিল। তার হৃদয় ছিল মহৎ, উদার, পরার্থপর; সে-হৃদয় হিংসাত্মক লোকেরা পদদলিত করেছিল। সে দুর্বলের রক্ষক ছিল, প্রতারিত উৎপীড়িত অসহায় মানুষের জন্যে তার দরদী মন কাঁদত। অন্যায়ভাবে জোতজমি দখল করে কালু মিঞা যে স্বামীহারা অবলা নারীকে ঠকিয়েছিল সে-নারীকে সে সাহায্য করতে চেয়েছিল যাতে যা তার হক তা সে ফিরে পায়। এবং সেজন্যেই তাকে প্রাণ দিতে হয়।
এ-সবও মুহাম্মদ মুস্তফা নীরবে শোনে।
তারপর চতুর্থ দিনে খবরটি আমাদের গ্রামে এসে পৌঁছায়। খবরটি এই যে, অথর্ব কালু মিঞা মসজিদে গিয়ে ঘোষণা করেছে সে নির্দোষ।
খবরটি বাড়ির সবাইকে স্তম্ভিত করে। বস্তুত কিছু সময়ের জন্যে সকলে কেমন বাকশূন্য হয়ে পড়ে। তাদের মনে হয়, মসজিদ-ঘরে কথাটি বলে ধূর্ত কালু মিঞা আমাদের সঙ্গে বড়ই শয়তানি করেছে, যেন যাকে আমরা প্রায় ধরে ফেলেছিলাম সে হাত থেকে ফস্কে গিয়ে একটি দুর্গের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছে। দুর্গটি সাধারণ দুর্গও নয়, সেটি আকায়িদ-ঈমানে তৈরি দুর্গ।
বাপজান অবশেষে কালু মিঞার কারসাজির বিষয়ে তার মত প্রদান করে। উঠানে দাঁড়িয়ে লুঙ্গির গিট খুলে আবার শক্ত করে বাঁধতে-বাঁধতে (কোনো কারণে ক্রুদ্ধ বা বিচলিত হয়ে পড়লে বাপজান অমনি লুঙ্গির গিট খুলে আবার শক্ত করে বাঁধে) উচ্চস্বরে বলে, যে-মানুষ খোদার বান্দাকে খুন করতে ভয় পায় না সে-মানুষ খোদার ঘরে মিথ্যা বলতে ভয় পাবে কেন?
সে-রাতে বাপজান মুহাম্মদ মুস্তফাকে সরাসরি প্রশ্ন করে, কী করতে চাও, বাবা?
মুহাম্মদ মুস্তফা কোন উত্তর দেয় নি। সেদিন তাকে সত্যি বড় বিহ্বল মনে হয়, যেন যে-মানুষ কোনো প্রকারের দ্বিধা-সংশয় পছন্দ করে না সে-ই নিদারুন একটি দ্বিধা-সংশয়ের কবলে পড়ে প্রায় দিশেহারা হয়ে উঠেছে।
তার মানসিক অবস্থার কারণ পরদিন জানতে পাই।
মুহাম্মদ মুস্তফা কিছু করবে-এমন একটা আশায় আমরা যখন উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলাম সে-সময়ে অন্য একটি কথায় সে ভাবিত হয়ে পড়ে। সেটি এই যে, কালু মিঞার বাড়ির সামনে তার আবির্ভাব গৃহস্বামীকে সন্দিগ্ধ, হয়তো-বা সন্ত্রস্তই করে থাকবে। তারপর বৃদ্ধ লোকটি মসজিদে গিয়েছে সে নির্দোষ সে-কথা বলতে-তা জানার পর মুহাম্মদ মুস্তফা দেখতে পায় তার সন্দেহটি অযথা ছিল না : সত্যি, অথর্ব অক্ষম রোগব্যাধি জর্জরিত লোকটি ভয়ানকভাবেই ভীত হয়ে পড়েছে। কালু মিঞা দোষী হোক নির্দোষ হোক, মুহাম্মদ মুস্তফা সেদিন কোনো দুরভিসন্ধি নিয়ে তার বাড়ির সামনে দেখা দেয় নি। সে-কথা তাকে জানানো এবার তার কর্তব্য বলে মনে হয়।
কালু মিঞাকে কথাটি জানানোর দায়িত্ব আমার ওপর পড়ে। আমি একটু বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকালে সে আমার দৃষ্টি এড়িয়ে বাপজানের কথা যেন শোনে নি এমনিভাবে শুধু বলে, মসজিদে কেউ মিথ্যা কথা বলে না।
অল্পক্ষণের মধ্যে খালি পায়ে ছাতাবগলে আমি মুক্তাগাছি গ্রাম অভিমুখে রওনা হয়ে পড়ি এবং বাড়ির গভীরভাবে নিরাশ হওয়া ক্ষুদ্ধ প্রবঞ্চিত লোকদের বিষয়ে না ভেবে বা মুহাম্মদ মুস্তফার আচরণের অর্থ বুঝবার চেষ্টা না করে সজোরে পদসঞ্চালন করে এগিয়ে চলি। যে-কথা দুর্বোধ্য মনে হয় সে-বিষয়ে ভাবতে আমার ভালো লাগে না।
কী কারণে তবারক ভুইঞা থামে। বাইরে, রাতের ঘনীভূত অন্ধকারের মধ্যে নদীর বিক্ষুব্ধ অশ্রান্ত পানি আর্তনাদ করে। সে-আওয়াজই সহসা কানে এসে লাগে। শ্রোতাদের মধ্যে একজনের চোখ নিমীলিত হয়ে পড়েছে, মুখটা ঈষৎ খুলে সোজা হয়ে বসে সে ঘুমায়। শান্ত মুখ, তাতে ঘুমের কোনো ছায়া নেই। তাই মনে হয় সে বুঝি। জেগেই চোখ বুজে রয়েছে, অথবা সে অন্ধ।
তারপর আবার তবারক ভুইঞার কণ্ঠস্বর শোনা যায়।
সে বলে: সেদিন সকালে ক্রোধোন্মত্ত পশুর মতো ছুটে গিয়ে সকিনা খাতুনের পথ রুদ্ধ করে দাঁড়িয়ে ভীষণ কণ্ঠে আর্তনাদ করে উঠলেও সম্বিৎ ফিরে পেতে ছলিম মিঞার দেরি হয় নি। তারপর মেয়েটির ভীতবিহ্বল মুখ দেখতে পেলে সে গভীরভাবে লজ্জিত বোধ করে এবং এ-সময়ে কেউ এসে তার হাত ধরলে সে বশীভূত পশুর মতো মেয়েটির পথ ছেড়ে দোকানে ফিরে আসে, তার রাগের কারণটি সহসা নিজেই যেন বুঝতে পারে না।
