এবার একটি তীক্ষ্ম আর্তনাদে পথের এ-মাথা ও-মাথা যেন কেঁপে ওঠে।
কী কান্না শোনেন, কোথায় কান্না শোনেন?
মুহাম্মদ মুস্তফা অতিশয় সাবধানী মানুষ; জ্ঞানবুদ্ধি হবার পর থেকে সাবধান হয়ে কখনো কিছু করে নি, অসতর্কভাবে কখনো এক পা-ও নেয় নি। আমার মনে হয়, বাল্যবয়সে তার মধ্যে যে-উচ্চাশা দেখা দিয়েছিল (উচ্চাশা ছাড়া অশিক্ষিত প্রায় দরিদ্র পরিবারের ছেলে অতদূর কি যেতে পারত?) সে-উচ্চাশার বিষয়ে কখনো আপন মনেও স্পষ্টভাবে ভাবতে সাহস করে নি এই ভয়ে যে তা নিয়ে উচ্চবাক্য করলেও কোথাও কোনো হিংসাত্মক শক্তি তাকে ধ্বংস করার জন্যে খড়গহস্ত হবে। তার অগ্রসর হওয়ার পথে কোনো বাধাবিপত্তি দেখলে তার বহর খাটো করে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে নি, মল্লযুদ্ধে আহ্বান করে নি, বরঞ্চ ভুলিয়ে-ভালিয়ে তার সঙ্গে মিলে মিশে থাকবার চেষ্টা করেছে এবং দুর্জয় শত্রু নিঃসন্দিগ্ধচিত্তে নিন্দ্রাভিভূত হলে সুযোগ বুঝে আস্তে সরে পড়েছে। ছুটিছাটাতে দেশের বাড়ির পথ ধরলে তার মনে যে-ভাবটি দেখা দিত তাও তার সাবধানী চরিত্রের পরিচায়ক। চাঁদবরণঘাটে স্টিমার থেকে নেবে খালে পথ ধরলে সহসা তার কেমন মনে হত সে যেন কখনো ইস্কুলে কলেজে পড়ে নি বড়বড় পরীক্ষা পাস দেয় নি, এমন যে-গ্রাম যে-জীবন থেকে নিস্তার পাবার জন্যেই এত শ্রম-অধ্যবসায়, সে-গ্রাম বা জীবন ছেড়েও কখন কোথাও যায় নি। দেশের বাড়ির পথে চৈত্র মাসের বৃক্ষপল্লবের মতো তার সমস্ত তালিম-শিক্ষা নিঃশব্দে ঝরে-পড়া, তারপর গ্রামের সামীপ্যে উপস্থিত হলে পদক্ষেপে জড়তা মুখে-জবানে উনবুদ্ধি ঢিলেমি দেখা দেয়া-এ সবের কারণ এই নয় যে দরিদ্র অশিক্ষিত গ্রাম এত দুর্বল এত অসহায় যে সেখানে শিক্ষাদীক্ষার ঈষৎ চিহ্নপ্রদর্শনও অন্যায়, সাবধানতাই ঐ ভাবটির আসল কারণ : দন্তহীন নিরীহ জন্তুকেও উস্কাতে নেই, কোনো আপদ-বিপদ চোখে দেখা না গেলেও নিরাপদ বোধ করা অনুচিত। এ-ধরনের সাবধানতার আসল উপাদান হল ভীতি এবং সে-কথা নিজে বুঝলেও মুহাম্মদ মুস্তফা কখনো লজ্জা বোধ করে নি, বরঞ্চ নিরাপত্তার জন্যে ভীতি একান্ত আবশ্যকীয়-এমন একটি দৃঢ়বিশ্বাসে সচেতনভাবে সে-ভীতি লালিত-পালিত করে তাকে তার চিন্তাধারা আচরণ-ব্যবহারের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করে নেয়; ভীত মানুষ কখনো বেপরওয়া হয়ে হঠকারী কাজ করে বসে না, তেমন কাজের পরিণামও তাকে ভোগ করতে হয় না। এমন মানুষ কি সজ্ঞানে স্ব-ইচ্ছায় কালু মিরি বাড়ির সামনে উপস্থিত হবে? তবে সজ্ঞানে না হোক, তারই অজানিত কোনো দুর্বোধ্য তাড়নায় সেখানে উপস্থিত হয়ে থাকবে-এমন একটি সন্দেহ মুহাম্মদ মুস্তফার মনে দেখা দিয়েছিল, কিন্তু তা প্রত্যাখ্যান করতে তার দেরি লাগে নি। তাও-বা কী করে সম্ভব? তার বিশ্বাস মানুষ তার নিজের মনের মতিগতি বুঝতে পারবে না তা হতে পারে না। অন্যের কাছে একটি মানুষের মন দুর্বোধ্য বা রহস্যময় মনে হতে পারে যার কারণ শুধুমাত্র এই যে, সমাজে বাস করতে হলে মানুষকে পরের কাছ থেকে অনেক কিছু ঢাকতে হয়, ছলনা-কৌশলের শরণাপন্ন হতে হয়, যে-পথ ধরে সে-পথও সকল সময়ে সোজা চলে না। কিন্তু নিজের কাছে মানুষের মন দিবালোকের মতো সদাস্বচ্ছ সুস্পষ্ট, সেখানে অজানার ছায়া বা গুহাপথের রহস্যের অবকাশ নেই। এ কি সম্ভব যে কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে কালু মিঞার বাড়ির সামনে দেখা দেবে অথচ সে-উদ্দেশ্য তার কাছেই অজ্ঞাত থাকবে?
তবে মুহাম্মদ মুস্তফা যে পথভ্রষ্ট হয়ে কালু মিয়ার বাড়ির সামনে প্রাচীন বটগাছটির নিকট হাজির হয়েছিল এবং বাল্যকালের স্মৃতি স্মরণ করেই তার তলায় একটু দাঁড়িয়ে পড়েছিল-এসব কথা বাড়ির লোকদের বিশ্বাস হয়নি। সে-অবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে একটি আশা, কেমন একটা উত্তেজনাও, ধীরে-ধীরে তাদের গ্রাস করে, এবং সত্য বলতে কী, আমিও কিছু আশান্বিত কিছু উত্তেজিত হয়ে উঠি। সবারই মনে হয়, এবার মুহাম্মদ মুস্তফা কিছু করবে। তার বাপের মৃত্যুর পর অলসপ্রকৃতির ছোট চাচা হঠাৎ কী কারণে অনুপ্রাণিত হয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল এই মর্মে যে এখন মুহাম্মদ মুস্তফা নাবালক, কিন্তু তাকে বড় হতে দাও, তখন দেখবে। সহসা সেই ভবিষ্যদ্বাণীটি সকলের মনে পড়ে। মুহাম্মদ মুস্তফা আর নাবালক নয়, ইতিমধ্যে অনেক পাস-পরীক্ষাও দিয়েছে, যে-দিনের জন্যে ছোট চাচা অপেক্ষা করতে বলেছিল সেদিন হয়তো এসেছে।
আমরা যে আমাদের আশা-উত্তেজনার কারণ বা স্বরূপ ঠিক বুঝতে পারি তা নয়। দিনটা এসে থাকলেও কিসের জন্যে সেদিন এসেছে, কীই-বা করবে মুহাম্মদ মুস্তফা? তবু আশাটি একবার দেখা দিলে সেটা নূতনও মনে হয় নি; একদিন মুহাম্মদ মুস্তফা কিছু করবে সে-বিশ্বাস খেদমতুল্লার মৃত্যুর পরেই কি আমাদের মনে দেখা দেয় নি?
খেদমতুল্লার মৃত্যুর পর তার প্রতি আমাদের মনোভাবের বিষম পরিবর্তন ঘটে। তার জীবনের শেষ দিকে সে আর বাড়ির লোকদের স্নেহমমতার পাত্র ছিল না। বলতে গেলে, খেদমতুল্লাই সমস্ত স্নেহের বন্ধন নিজ হাতে ছিন্ন করেছিল। ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের প্রতি তার উদাসীনতা স্বার্থপরতা অবিবেচনার ফলে সকলের মনে গভীর বিরূপ ভাবের সৃষ্টি হয়েছিল। তার অবিরেচনা সহ্য করতে না পেরে ছোট চাচা তার নাম মুখে নেয়া বন্ধ করেছিল, বাপজান একবার বড় অর্থকষ্টে পড়লে তার কাছে সামান্য সাহায্য চেয়ে সাহায্য না পেলে স্থির করেছিল হৃদয়হীন ভাই-এর মুখ কখনো দেখবে না। দেখাদেখির অবকাশও ছিল না। চাঁদবরণঘাটে বসবাস শুরু করার পর খেদমতুল্লা দেশের বাড়িতে আসা ছেড়ে দিয়েছিল, এমনকি ঈদের দিনে কম ভাগ্যবান ভাইবোনের ছেলেমেয়েদের স্মরণ করে কখনো একটা ছিটের জামাও পাঠিয়ে দিত না। তবু তার অপঘাতে মৃত্যুর পর ভাইদের মন থেকে সমস্ত বিরূপতা অদৃশ্য হয়ে যায়, তার বিধবা স্ত্রী এবং পিতৃহারা অল্পবয়স্ক ছেলেকেও তারা সাদরে বাড়িতে গ্রহণ করে। খেদমতুল্লা নিষ্ঠুরপ্ৰাণ দুর্বৃত্ত লোক ছিল, ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের দিকে মুখ ফিরেও তাকাত না, তবু সে এ-বাড়িরই কারো ভাই কারো চাচা-জেঠা ছিল, তাদের সবাইকে উপেক্ষা করে অন্যত্র চলে গেলেও এ-বাড়িতেই তার জন্ম হয়েছিল। তবে কে জানে, যদি স্বাভাবিক কোনো কারণে খেদমতুল্লার মৃত্যু ঘটত তবে হয়তো এমন ভাবান্তর ঘটত না। হয়তো খেমতুল্লার অস্বাভাবিক মৃত্যুতে জবাই-করা গরুর নিথর নিস্তেজ দেহের মতো যে-অসহায়তা প্রকাশ পায় সে-অসহায়তা, তারপর অন্যায়ের বিচার দেখার যে-বাসনা স্বভাবতই জেগে ওঠে তাদের মনে সে-বাসনা-এ সবের তলে মৃত লোকটির দোষঘাট নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। তবে তখন তারা কিছু করতে পারে নি, সামান্য আস্ফালন করে নিরস্ত হয়। তারা জানত, সরকার বা পুলিশ কিছু করবে না, সুবিচারের আশা দুরাশা মাত্র। কালু মিঞার তখন সমগ্র অঞ্চলে প্রচণ্ড প্রভাব প্রতিপত্তি; কালু মিঞাই যে খেদমতুল্লার হত্যার জন্যে দায়ী সে-বিষয়ে কারো কাছে জলজ্যান্ত সাক্ষি-প্রমাণ থাকলেও সে-সাক্ষি-প্রমাণ নিয়ে এগিয়ে আসবে না-তাও জানত। বস্তুত, কেউ একবার বেফাসে একটি কথা বলে ফেলে মুখে যে খিল দিয়েছিল আর টুশব্দ পর্যন্ত করে নি; একটি মানুষের ঘাড়ে কটাই-বা মাথা?
