মনের অসন্তুষ্টি চেপে ছলিম মিঞা আপন ভাবনায় মগ্ন হয়ে পড়েছে এমন সময়ে সহসা সকর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ সে শুনতে পায় মোক্তার মোছলেহউদ্দিনের মেয়ের কথা বলতে-বলতে তার স্ত্রী অন্য কোথাও চলে গিয়েছে। পনেরো-বিশ বছর আগে একবার কুমুরডাঙ্গায় যে-বসন্ত রোগের মহামারী লেগেছিল, কোনো কারণে সে-মহামারীর কথাই তুলেছে। প্রথমে ছলিম মিঞা ভাবে, অবশেষে তার স্ত্রী সকিনা খাতুনের কথা ভুলেছে। কিন্তু শীঘ্র তার ভ্রান্তি দূর হয়।
করিমন বলে, তখনো মড়ক লাগে নি, সহসা আমি কী একটা কান্না শুনতে শুরু করি সকিনা খাতুনের মতোই। একে-ওকে জিজ্ঞাসা করি, কোনো কান্না শুনতে পাও? সবাই আমার দিকে অবাক হয়ে তাকায় যেন, আমার মাথা খারাপ হয়েছে। আমি অবশেষে বুঝতে পারি কোথাও কেউ যদি কেঁদে থাকে সে-কান্না আমিই কেবল শুনতে পাই। তারপর মড়ক লাগে। কত লোক মারা গেল সেবার! একটু থেমে আবার বলে, মড়ক লাগবে বলেই অন্তরে কান্নাটি শুনতে পেতাম। অন্তর অনেক সময়ে অনেক কিছু জানতে পায়।
কথাটি শোনামাত্র ছলিম মিঞা বুঝতে পারে তাতে একরত্তি সত্য নেই, এবং খুব সম্ভব পূর্বে তেমন কথা তার স্ত্রীর মনে কখনো দেখা দেয় নি কী-করে মোক্তার মোছলেহউদ্দিনের মেয়ের কথায় তেমন একটি ধারণা মাথায় এসে সহসা সত্যের রূপ ধারণ করেছে।
এবার ভাত-মাখা হাতে প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে ছলিম মিঞা ব্যগ্রকণ্ঠে বলে, চুপ করো, চুপ করো বলছি।
শীঘ্র খাওয়া শেষ করে নিত্যকার মতো ভেতরের উঠানের পাশে হুঁকা নিয়ে সে বসে, তবে হুঁকায় স্বাদ পায় না। তার মনে হয় বিষম ক্রোধে তার সমস্ত অন্তর যেন কুঁকড়ে রয়েছে।
পরদিন ছলিম মিঞা যখন দোকানে যাবার আগে অন্যদিনের মতো বাড়ির পেছনে আতাফলের গাছগুলি দেখতে যায় তখনো তার রাগ পড়ে নি, মুখে থমথমে ভাব। আতাফলের গাছগুলির দিকে দৃষ্টি দিয়ে সেদিন তার আনন্দ হয় না যদিও নিত্য এ সময়ে গাছগুলির ওপর চোখ পড়তেই তার চোখ তৃপ্তিতে নরম হয়ে ওঠে। গাছগুলি শ্রমের ফল, বড় শখের জিনিস। চার বছর আগে বৈশাখ মাসে চারা লাগানোর পর থেকে স্নেহভরে তাদের বৃদ্ধি লক্ষ্য করে এসেছে, নিচে জমিতে যাতে অতিরিক্ত পানি জমে না যায় আবার শুষ্কতাও দেখা না দেয় বা গোড়াতে আগাছা না জন্মায়-এসব বিষয়ে সতর্কতারও সীমা থাকে নি। চার বছরের যত্ন-সতর্কতার ফলে গাছগুলি বড় হয়ে উঠেছে, কিছুফলও ধরেছে। তবে প্রথম ফল কখনো ভাল হয় না। তার বিশ্বাস দু-এক মাসের মধ্যে বর্ষাটা ভালো করে নাবলে বেশ উত্তম ফল ধরবে এবং এক-গাছ থেকে দুই-শ আড়াইশ ফলও পাবে। ফলমূলের গাছ করার ব্যাপারে তার বড় উৎসাহ এবং নিজের হাতে যা লাগায় তা ভালোও হয়। কেবল বেশি কিছু করার সুযোগ নেই। ঐ তো ছোট জমিটা, বাড়ির পেছনে। তবু সেখানে কত কিছুই না করে : আলু পটল মটর হতে শুরু করে লেবু লিচু, এবং এখন আতাফল। বাল্যকালে ছলিম মিঞা এতিম হবার পর লোকেরা বলত বড় হয়ে সে ভাগ্যবান হবে। ভাগ্যের নমুনা এখনো দেখে নি, তবে কখনো-কখনো তার মনে হয় অল্প বয়সে পিতা-মাতার স্নেহ থেকে বঞ্চিত মানুষটির প্রতি গাছ-লতাপাতা যেন কিছু করুণা বোধ করে।
প্রিয় গাছগুলির দিকে প্রায় না তাকিয়েই ছলিম মিঞা দোকান অভিমুখে রওনা হয়। দোকানে পৌঁছে ঝাঁপ তুলে নির্দিষ্ট স্থানে বসে, মুখের থমথমে ভাব তখনো কাটে নি। শেষরাতে এক পশলা বৃষ্টি হয়েছিল। সামনের সাদা মাটির পথটি এখনো সিক্ত, এখানে-সেখানে জমা পানি। সে-পথের দিকে নিপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছলিম মিঞা যেন পারিপার্শ্বিক সম্বন্ধে বিস্মৃত হয়ে স্থির হয়ে থাকে, ঠোঁটের প্রান্তে বক্র রেখায় মানুষের নির্বুদ্ধিতার প্রতি গভীর বিতৃষ্ণার ভাব। একটু পরে একটা খরিদ্দার আসে। সাইকেলের খরিদ্দার নয়; সাইকেলের খরিদ্দার কালেভদ্রে আসে। ছলিম মিঞা তার দোকানে অন্যান্য জিনিসও মজুত রাখে : পেরেক বন্টু লোহা-লক্কড় সুঁচ-সুতা-এই ধরনের নানাপ্রকারের চুটিচাটি জিনিস।-খরিদ্দারটি কিছু বলে, কিন্তু তার কথা ঠিক তার কর্ণগোচর হয় না, কারণ সহসা পথে একটি ছায়া জেগে উঠলে সেদিকে তার দৃষ্টি ছুটে যায়। ছায়াটি মোক্তার মোছলেউদ্দিনের মেয়ে সকিনা খাতুনের রূপ ধারণ করে : অন্যদিনের মতো কালো ছাতা মাথায় সকিনা খাতুন বাজারের পথ দিয়ে স্কুল অভিমুখে চলেছে। নুয়ে থাকা ছাতার জন্যে মুখের নিম্নাংশ শুধু চোখে পড়ে, এবং সে-অংশটিও ছায়াচ্ছন্ন বলে তেমন পরিষ্কারভাবে দেখা যায় না। অন্যদিনের মতো ঈষৎ মাজা-ভাঙ্গা ভঙ্গিতে ধীর-মন্থর গতিতে সে হাঁটে, তবে পথের এখানে-সেখানে জমে-থাকা পানির জন্যে আজ তাকে এঁকেবেঁকে চলতে হয়।
ছলিম মিঞা প্রথমে নিথর দৃষ্টিতে সকিনা খাতুনের দিকে তাকিয়ে থাকে। কয়েক মুহূর্ত এমনি কাটে। তারপর কী যেন ঘটে, সহসা কোথায় যেন একটি শিরা ফেটে যায়, তার চোখ দুটি নিমেষে রক্তাপ্লুত হয়ে পড়ে, কী একটা দুর্বোধ্য ক্রোধে তার নাসারন্ধ্র কাঁপতে শুরু করে। এবার ক্ষিপ্রবেগে উঠে দাঁড়িয়ে উন্মত্ত পশুর মতো দোকান থেকে পথে নেবে সকিনা খাতুনের পথরুদ্ধ করে দাঁড়ায়, আসবার সময়ে পানি জমা স্থানে পা পড়লে ছলাৎকরে কিছু পানি যে তার লুঙ্গি ভিজিয়ে দেয় তা লক্ষ্য করে না।
