কালু মিঞার কণ্ঠ দ্বিতীয় বার শোনা যায় না। একটু অপেক্ষার পর কালু মিঞার। জামাই শ্বশুরের পক্ষে বলে, তিনি বললেন-খেদমতুল্লাহকে খুন করেন নাই, করানও নাই।
তবে, এ-কথা বলবার জন্যেই বৃদ্ধ কালু মিঞা দুটি মানুষের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে মসজিদে এসেছে। মসজিদে কেউ মিথ্যা বলে না; সেখানে মিথ্যা বললে যে-গুনাহ্ হয় সে-গুনাহর মাফ নেই।
ঘরময় সহসা গভীর নীরবতা নাবে, সবাই শাসরুদ্ধ করে অপেক্ষা করে। হয়তো তাদের মনে হয় হঠাৎ অতি অত্যাশ্চর্য কিছু ঘটবে, কোথাও একটি বিশাল হাওয়াই তারাবাজি সমগ্র দুনিয়া আলোকিত করে বিকট আওয়াজে ফেটে পড়বে, পায়ের তলে অতল গহ্বর সৃষ্টি করে ধরণী দ্বিধাকৃত হয়ে পড়বে। তারা রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করে। এমন সময়ে মানুষের কিছু করতে নেই : নাইওরে যেতে নেই, বরাতে শরিক হতে নেই, কাস্তে-কোদাল হাতে নিতে নেই, খাজনা-খেসারত দিতে নেই, দাখিলি জমা করতে নেই, গঞ্জে গিয়ে দাদন দিতে নেই, প্রসূতির স্তনে ঠোকা জাগলে অধীর হতে নেই।
তবে কিছুই ঘটে না। এক সময়ে তারা দেখতে পায় জামাই আর ভৃত্যটি হাতে হাতে মিলিয়ে যে-আসন তৈরি করেছে, সে-আসনে বসে বৃদ্ধ কালু মিঞা মসজিদ ত্যাগ করছে। মসজিদ-ঘরের অন্ধকারাচ্ছন্ন অংশটি অতিক্রম করে দরজার নিকটে পৌঁছুলে আকস্মিক আলোতে বৃদ্ধের চোখ দুটি মিটমিট করে ওঠে, অন্ধের চোখে যেন প্রাণ সঞ্চার হয়, এবং সে-আলোয় তার শুভ্র দাড়ি তার মুখমণ্ডল শীতল তারার শুদ্ধ নির্মল রূপ ধারণ করে।
কালু মিঞা নিরাপদে মসজিদ ত্যাগ করে।
তবারক ভুইঞা বাজারে সাইকেলের দোকানের মালিক ছলিম মিঞার কথা বলছিল। ছলিম মিঞা জনপ্রিয় মানুষ নয়। বরঞ্চ বদমেজাজি জন্তু-জানোয়ারকে মানুষ যেমন এড়িয়ে চলে তেমিন লোকেরা তাকে এড়িয়ে চলে, অকারণে বড় একটা তার নিকটে আসে না। তবু সকলে গোপনে-গোপনে তাকে সমীহ না করে পারে না। মানুষের তুচ্ছতম দোষ-ত্রুটিও তার সহ্য হয় না, কিছু পছন্দ না হলে পরিষ্কারভাবে বলে ফেলে, তবে নীচমনা কুৎসা-পরনিন্দায় তার প্রবৃত্তি নেই। এবং দুনিয়ায় কোথাও সে ভালো কিছু দেখতে না পেলে মনে হয় সত্যিই কোথাও ভালো কিছু নেই। মানুষের চরিত্র-আচরণ-ব্যবহারে অনেক কিছু সে দেখতে পায় যা অন্যদের চোখে ধরা পড়ে না। অনেকদিন আগে স্টিমারঘাটের বাদশা মিঞা যখন প্রথমবার খৈনিমুখে বাজারের পথে দেখা দিয়েছিল তখন সে-ই তার চোয়ালের অস্ফুট সঞ্চালন লক্ষ করেছিল। কায়েক মুহূর্ত তার দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে গভীর বিতৃষ্ণায় মুখ ফিরিয়ে বলেছিল : কাকের ময়ূর হবার সখ, কুচকাঁটার কদলীগাছ হবার সাধ। তবু লোকটি নির্দয় নয়। ঘাট বন্ধ হবার পর যখন জানা যায় বাদশা মিঞা চাকুরি হারিয়েছে তখন উদ্বিগ্নকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করেছিল, ঐ যে ব্যাটাটা খৈনি খায়, উড়ে-বিহারি ভাব দেখায় এবার কী হবে তার? ছলিম মিঞার খিটখিটে মেজাজের পশ্চাতে কোথায় যেন ন্যায় অন্যায়ের বিষয়ে গভীর সচেতনতা।
মোক্তার মোছলেহউদ্দিনের মেয়ে সকিনা খাতুন যে একটি বিচিত্র কান্না শুনতে পায় সে-খবর শোনার পর ছলিম মিঞা প্রথমে কিছু বলে নি, কেউ প্রশ্ন করলে সবেগে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নীরব হয়ে থেকেছে যেন অবান্তর কথার ওপর কোনো উক্তি করা নিতান্ত নিষ্প্রয়োজনীয় মনে হয় তার কাছে। তবে সেদিন রাতে স্ত্রীর মুখে কথাটি শুনলে সহসা রাগান্বিত হয়ে পড়ে।
বেশ রাত করে দোকানে ঝাঁপ দিয়ে বাড়ি প্রত্যাবর্তন করে হাত-মুখ ধুয়ে খেতে বসেছে এমন সময়ে তার স্ত্রী করিমন কথাটি তোলে। করিমন বলে, আমার কেমন মনে হয় কিছু একটা হবে। সেদিন থেকে মধ্যে-মধ্যে কেমন একটা। অস্বস্তির ভাব যেন বুকের ভিতর।
ছলিম মিঞা নীরবেই শোনে, কিন্তু অবান্তর কথাটির উত্থাপনে অসন্তুষ্ট হয় বলে খাওয়ার ভঙ্গিতে ক্ষিপ্রতা এসে পড়ে। বস্তুত, কথাটি কখনো তাকে প্রীত করে নি। মেয়েটি কী শোনে কে জানে। তাছাড়া কিছু শুনতে পায় তাই-বা কী করে বলা যায়। হয়তো সেটি তার কল্পনা, বা কানের ভুল। যা ছলিম মিঞাকে আরো অসন্তুষ্ট করে তা এই যে, মেয়েটি কিছু শুনে থাকলেও লোকেরা এমন শঙ্কাগ্রস্ত হয়ে পড়বে কেন? জীবনে কখনো কান্না শোনে নি তারা?
তবু ছলিম মিঞা রাগান্বিত হত না যদি তার স্ত্রী সহসা একটি অদ্ভুত কথা না বলত। স্বামীর অসন্তুষ্টি লক্ষ্য করলেও করিমন নিরস্ত হয় না। করিমন সাদাসিধে মানুষ, কথাও তেমন বলে না, তবে ক্বচিৎ কখনো কিসে তাকে যেন পেয়ে বসে, অকস্মাৎ কথা বলতে শুরু করে। তখন তার শ্রোতার প্রয়োজন হয় না, অনেক সময়ে শ্রোতা থাকেও না। এ-সময়ে তার মুখে-চোখে কেমন একটা ভাব জেগে ওঠে, যেন বুকের মধ্যে থেকে যে-সব কথা উদ্বেলিত হয়ে শব্দাকারে দেখা দিয়েছে তারই আওয়াজে সে সম্মোহিত হয়ে পড়েছে। জীবনের দুঃখ-দুর্দশা নিয়েই সে কথা বলে এবং কোনো ঘটনা অনেকদিন আগে ঘটে থাকলেও এমনভাবে তার অবতারণা করে যে মনে হয় তা সম্প্রতি ঘটেছে, এবং তা তার বুকে যে আঘাতের সৃষ্টি করেছিল সে-আঘাত সবেমাত্র কাটিয়ে উঠেছে। কখনো-কখনো তার কথায় ছলিম মিঞা বিস্মিত হয়, কারণ তার স্ত্রী অকস্মাৎ এমন কথা পাড়ে যা আগে কখনো শোনে নি। কোত্থেকে আসে, কোথাই-বা দীর্ঘদিন ধরে লুকিয়ে রাখে সে-সব কথা? তবে ছলিম মিঞার বিশ্বাস, যা তার স্ত্রী বলে তার অধিকাংশই অসত্য। সে যে সজ্ঞানে মিথ্যা বলে তা নয়; তার মস্তিষ্কটি এমনই যে সেখানে সময়কাল, সত্য-অসত্য, আশা-আকাক্ষা, ভীতি আশা–এসব কী করে গোলতাল পাকিয়ে যায়। এজন্যে সচরাচর স্ত্রীর কথায় বড় একটা কান দেয় না, কেবল তা অসহ্য রকমের ঘ্যানঘ্যানানিতে পরিণত হলে বা অসম্ভবের সীমানা ছাড়িয়ে গেলে ধমকে বলে, চুপ করো। ধমক খেয়ে করিমন চুপ করে, সঙ্গে-সঙ্গে বাস্তব জগতেও প্রত্যাবর্তন করে।
