কালু মিঞা বলেছিল, সিন্দুরগাঁ-এ নিঃসন্দেহে কোনো নিরাপরাধ পরিবারের ধ্বংসের মতলব এঁটে খেদমতুল্লা যখন কামলাতলা বিলের পাশ দিয়ে চাঁদবরণঘাট অভিমুখে যাচ্ছিল তখন সে-পথ দিয়ে মীরণ শেখও বাড়ি ফিরছিল। সন্ধ্যা হয়-হয়। মীরন শেখ সহসা দেখতে পায় খেদমতুল্লাকে, বগলে ছাতা নিয়ে লুঙ্গিটা একহাত দিয়ে কিছু তুলে ধরে নত মাথায় হনহন করে তীব্র বেগে সে হেঁটে আসছে। খেদমতুল্লা বেশ কাছে এসে পড়েছে এমন সময়ে হঠাৎ সে সচকিত হয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। মীরন। শেখ প্রথমে ভাবে খেদমতুল্লা তাকে দেখেই এমনভাবে দাঁড়িয়ে পড়েছ, কিন্তু শীঘ্র বুঝতে পারে খেদমতুল্লার দৃষ্টি অন্য কোথাও, তাছাড়া তার মুখে বিস্ময়ভিভূত নিথর ভাব। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে এবার মিরন শেখ ভীষণাকার দৈত্যের মতো একটি মূর্তি দেখতে পায়। ভীষণকার হলেও মূর্তিটি যেন রক্তমাংসের নয়, সেটি যেন শূন্যের মধ্যে ধুঁয়ার মতো জেগে উঠেছে। তবে আচম্বিতে খাপ থেকে তলোয়ার খোলার মতো বিদ্যুৎঝলকের মতো হঠাৎ আকস্মিকভাবে। তারপর নিমেষে অত্যাশ্চর্য ঘটনা ঘটে : আবছা মূর্তিটি ঘি-ঢালা আগুনের মতো দপ করে জ্বলে উঠে সন্ধ্যাকাশ আলোকিত করে তোলে, সঙ্গে-সঙ্গে সুগম্ভীর কণ্ঠের গর্জন শোনা যায়, পায়ের তলে জমি কাঁপতে শুরু করে থরথর করে। মীরন শেখের পক্ষে আর তাকানো সম্ভব হয় নি। একটু পরে সে যখন আবার তাকাতে সক্ষম হয় ততক্ষণে চোখ-ধাঁধানো আলোটা নিভে গিয়েছে, পায়ের তলে জমিও স্থির হয়ে পড়েছে, কোথাও দৈত্যের মতো মূর্তিটির খেদমতুল্লার কোনো চিহ্ন নেই। মীরন শেখ প্রায় সজ্ঞাহীন অবস্থায় দৌড়াতে দৌড়াতে কোনোমতে বাড়ি ফিরে আসে।
কথাটি নিঃসন্দেহে অতিশয় বিচিত্র, হয়তো তা তাদের বিশ্বাস হয় নি। কিন্তু কী সে-আগুন যা দপ করে জ্বলে উঠে সন্ধ্যাকাশ আলোকিত করে তুলেছিল, বিদ্যুৎঝলকের মতো আবির্ভূত হওয়া সে-দৈত্যের ছায়া তারাও কি কখনো-কখনো তাদের অন্তরে অনুভব করে না? হয়তো তাই তেমন অবিশ্বাস্য কথাটি আবার বিশ্বাসও হয়েছে। সে জন্যে কালু মিঞাকে মিথ্যাবাদী বলে নি, এবং হয়তো মনে-মনেও তাকে দোষান্বিত করে নি।
দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই বলে কালু মিঞা বসে-বসে নামাজ পড়ে, তারপর নামাজ শেষ হলে উঠবার চেষ্টা না করে পূর্ববৎ নত মাথায় বসে থাকে। হাতটা একটু কাঁপে, যেন তসবি পড়ে, কিন্তু হাতে তসবি নেই।
সে-দিন নামাজিরা অন্যদিনের মতো নামাজের শেষে যে-যার পথে চলে না গিয়ে অপেক্ষা করে, তাদের কৌতূহলী দৃষ্টি কালু মিঞার ওপর নিবদ্ধ। ইমামও ঘুরে বসে। নামাজ-খোতবা শেষ হয়েছে বলে তাকে অসহায় দেখায়; কী করবে বুঝে উঠতে পারে না বলে সে শূন্য চোখে নিঃশব্দে দোয়াদরুদ পড়ে। কে জিজ্ঞাসা করবে কেন কালু মিঞা তার অক্ষম অথর্ব দেহটি মসজিদে টেনে নিয়ে এসেছে? কৌতূহলটা তীক্ষ্ম হয়ে উঠলে নামাজিরা অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করে, তবে কালু মিঞার মুখের দিকে তাকিয়ে কোনো প্রশ্ন করতে তাদের সাহস হয় না। তাদের কেমন মনে হয়, সে যদি কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে মসজিদে এসে থাকে সে-উদ্দেশ্যেরই কোনো বিশেষ আকার নেই: বৃদ্ধ মানুষটি তার জীবনের এমন একটি স্তরে এসে উপনীত হয়েছে যেখানে তার উদ্দেশ্য ইহজগতের মানদণ্ডে মাপা আর সম্ভব নয়। উপরন্তু, তার অন্তরে যেন কারো। বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই, ঘৃণা-বিদ্বেষ নেই, ভয়-আশা-আকাঙ্ক্ষা নেই, নিরাশাও নেই। যদি কিছু থেকে থাকে তা দুঃখ, কারণ সব কিছুর শেষ হলেও দুঃখের শেষ হয় না, অবশেষে দুনিয়ার সব কিছুই অটুট দুঃখে পরিণত হয়; মানুষ যখন তার কবরস্থান অভিমুখে রওনা হয় তখন কেবল দুঃখেই তার প্রাণহীন দেহ জমাট হয়ে থাকে।
অবশেষে ইমাম প্রশ্ন করে। কিছু বলবেন কালু মিঞা?
নিঃশব্দ মসজিদ-ঘরে আকস্মিক প্রশ্নটি বৃদ্ধ কালু মিঞাকে চমকিত করে। হয়তো সে ঘুমিয়ে পড়েছিল, ইমামের প্রশ্নে তার নিদ্রাভঙ্গ হয়। ঈষৎ বিহ্বলভাবে মুখটি কিছু তোলে, কয়েকমুহূর্তের জন্যে তার কোটরাগত চোখের খানিকটা দেখা যায়। তবে শীঘ্র সে-মুখ আবার বুকের ওপর ঝুলে পড়ে, যেন বুকের মধ্যেই তার মুখ আশ্রয় সন্ধান করে; যে-বুকের মধ্যে একদিন কত আশা-নিরাশা আলোছায়ার মতো খেলা করেছে, কত ভালো-মন্দ বাসনা-কামনা ঝড়ঝঞ্ঝার সৃষ্টি করেছে, সে-বুকে এখন নিরবচ্ছিন্ন শান্তি কারণ সেখানে সমস্ত আলোছায়ার খেলা সব ঝড়ঝঞ্ঝার অবসান ঘটেছে। তারপর মনে হয় বৃদ্ধ মানুষটি কাঁদতে শুরু করেছে; তার শীর্ণ দেহটি থরথর করে কাঁপে। কেবল চোখে অশ্রু দেখা দিয়ে থাকলেও সময়কাল-কর্ষিত চিবুকে কোনো সজলতার আভাস দেখা যায় না।
বলেন কালু মিঞা, ইমামটি দরদীকণ্ঠে বৃদ্ধকে আবার বলে।
কালু মিঞা নিজেকে সংযত করে, অথবা যে-ভাবাবেগ তার দেহে সহসা কম্পন সৃষ্টি করেছিল সে-ভাবাবেগ নিঃশেষ হয়ে যায়; তার দেহ ধীরে-ধীরে স্থির হয়ে পড়ে। কেবল হাত-দুটি পূর্ববৎ কেঁপে চলে। এবার সে কী-যেন বলে, কিন্তু তার ক্ষীণকণ্ঠ মুখ হতে বেরিয়ে এসে পিপীলিকার মতো শুভ্র দাড়ি বেয়ে বস্ত্রের অভ্যন্তরে অদৃশ্য হয়ে যায়, সে-কণ্ঠ কারো কান পর্যন্ত পৌঁছায় না।
ইমাম নয়, অন্য কেউ জিজ্ঞাসা করে, কিছু বললেন কালু মিঞা?
