সকিনা খাতুন উত্তর দিতে একটু দেরি করে। অবশেষে শুষ্ককণ্ঠে আস্তে বলে, হ্যাঁ।
তারপর তাদের দিকে তাকাতে সাহস হয় না বলে সে নতদৃষ্টিতে পাশ কাটিয়ে চলে যায়।
বৃহৎ বটগাছটির পাশে কালু মিঞার বাড়ির সামনে যেদিন মুহাম্মদ মুস্তফা দেখা দিয়েছিল তার দু-দিন পরে জুমার নামাজের সময় একজন মধ্যবয়সী জামাই আর একজন চাকরের কোলে চড়ে কালু মিঞা গ্রামের মসজিদে হাজির হয়। বৃদ্ধ কালু মিঞাকে বছর কয়েক যাবৎ বাইরে কেউ দেখে নি; অগ্রহায়ণ মাসের এক ভরা দুপুরে কী একটা নিদারুণ রোগে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লে তার বাইরে আসা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে পড়ে।
কালু মিঞার চেহারা দেখে মসজিদে সমবেত গ্রামবাসীরা বিস্মিত হয়। একদিন যে। দরাজগলা কর্মব্যস্ত স্বাস্থ্যবান লোক ছিল, বলবতী ধারার মতো যার মধ্য দিয়ে অফুরন্ত জীবনশক্তি প্রবাহিত হত, তাকে চেনাই দুষ্কর। ভ্রূ-দাড়ি সাদা হয়ে গিয়েছে, কোটরাগত চোখ অন্ধের চোখের মতো জ্যোতিহীন, অস্বচ্ছ, অস্থিচর্মাবিশেষ মুখ শত বলিরেখায় কুঞ্চিত। জামাই এবং ভৃত্যটি তার অর্থব, হাড়সম্বল হাল্কা দেহটি সামনের সারিতে বসিয়ে দিলে দুর্বল মেরুদণ্ডের ধনুকসম বক্রতা নিমেষে সুস্পষ্টভাবে আত্মপ্রকাশ করে, মুখটাও এমনভাবে বুকের ওপর ঝুলে পড়ে যে মনে হয় তা তুলে রাখার ক্ষমতা তার নেই, এবং শীঘ্র আরো মনে হয় দেয়াল-ফুটে-গজানো গাছের মতো সেটি যেন তার ধসে-পড়া বুক ভেদ করেই উঠেছে। তার কোটরাগত চোখ এ সময়ে অদৃশ্য হয়ে পড়ে। হয়তো সে-চোখ শান্তিতে নিমীলিত হয়ে পড়ে, হয়তো তাতে তন্দ্রা নেবে আসে; বর্ষার দিনে মেঘের মতো অতি অনায়াসে বৃদ্ধ মানুষের চোখে ঘুমতন্দ্রা আসা-যাওয়া করে।
কাল মিঞার চেহারা নামাজিদের মনে একটি বিচিত্র ভাবের সৃষ্টি করে, তাদের আকস্মিক দীর্ঘশ্বাসে ছোট মসজিদ-ঘর বার-বার প্রতিধ্বনিত হয়; তার চেহারা নিঃসন্দেহে কালের নির্দয়তার কথাই তাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। একদা আপন চেষ্টায় কত কিছু না করেছে লোকটি : বিস্তর জোতজমি বিষয়আশয়, পুকুরের ধারে মস্ত আটচালা বাড়ি, ফলমূলের বাগান। ধীরে-ধীরে আশেপাশে এমন প্রভাব-প্রতিপত্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হয় যে সকলে তাকে মাতব্বর হিসেবে গণ্য করতে শুরু করে; লোকেরা নানা ব্যাপারে উপদেশ-পরামর্শ চাইতে তার কাছে আসত, তার অনুমতি বিনা বিয়ে শাদি বা কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করত না। দুঃস্থ মানুষেরাও তার সাহায্যপ্রত্যাশী হয়ে পড়ে, সে-ও তাদের দুঃখে দুঃখিত হয়ে কখনো-কখনো মুক্তহস্তে তাদের ধান-চাল-পয়সা দিত, ধার-কর্জ হলে তা পরিশোধ করার জন্যে পীড়াপীড়ি করত না। তবে নিরবচ্ছিন্ন সুখভোগ হয়তো কখনো সম্ভব নয়, কারণ আলো যেমন পতঙ্গ আকর্ষণ করে তেমনি মানুষের সৌভাগ্য হিংসুকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাই একদিন খেদমতুল্লা নামক একটি লোকের ছায়া এসে পড়ে কালু মিঞার সুখ স্বচ্ছন্দপরিপূর্ণ জীবনের প্রাঙ্গণে। সহসা সবাই জানতে পায় যে এক খণ্ড পৈতৃক জমি ছাড়া অন্যান্য জোতজমির ওপর কালু মিঞার কোনো স্বত্বাধিকার নেই, দলিলপত্র জাল করে একটি সঙ্গতিপন্না কিন্তু মূর্খ নির্বোধ বিধবা এবং তার নাবালক সন্তান-সন্ততিদের ঠকিয়ে সে-সব সে নাকি আত্মসাৎ করেছে। বিধবা নারীটিকে পরামর্শ দিয়ে হক দাবিদাওয়া সম্বন্ধে তাকে সচেতন করে কালু মিঞার হাত থেকে অন্যায়ভাবে কবলিত সে-সব সম্পত্তি ছিনিয়ে নিতে উদ্যত হয় খেদমতুল্লা। প্রতিদানে সে কী আশা করেছিল কে জানে, তবে তার অন্তরে অর্থলোভের চেয়ে ঈর্ষাই ছিল বেশি; পরের সুখে তার অন্তরে অর্থলোভের চেয়ে সর্বনাশী আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠত। গ্রামবাসীরা বুঝে উঠতে পারে নি কার পক্ষ নেবে-কালু মিঞার, না খেদমতুল্লার। কালু মিঞার প্রতি আনুগত্য দেখালেও এবং সময়ে-অসময়ে তার সুখের অংশীদার হলেও তারাও কি তার উন্নতিতে গোপনে-গোপনে ঈর্ষাবোধ করে নি? সকলের অন্তরেই ঈর্ষা থাকে। প্রতিবেশীর ক্ষেতে ভালো ফসল হয়েছে দেখে কার না ইচ্ছা হয় গরুটা ছেড়ে বা আইলটা কেটে সে-ফসল নষ্ট করে? ঈর্ষান্বিত হয়ে কেউ পরের ক্ষতি করে কেউ করে না, কিন্তু পরের ক্ষতিতে সবাই খুশি হয়। তাই কী হবে তা দেখবার জন্যে তারা রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে শুরু করে।
তবে সে-দফা কালু মিঞা রক্ষা পায়, কারণ যার মনে প্রচণ্ড ঈর্ষা দেখা দিয়েছিল এবং যে তার বিষম ক্ষতি করতে উদ্যত হয়েছিল, সে-ই নিষ্ঠুরভাবে প্রাণ হারায়। হয়তো অদৃশ্য বিচারের খড়গ সদা খাড়া, সদা প্রস্তুত, কখন এবং কেন কার মাথায় নেবে আসে তা সব সময়ে বোঝা সম্ভব নয়। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে কালু মিঞা বলেছিল, খোদার দুনিয়ায় সুবিচারের অভাব নেই, হিংসাত্মক হয়ে যে নির্দোষ মানুষের ধ্বংস করতে চায় সে-ই ধ্বংস হয়। তবে লোকেরা অবিলম্বে একটি কথা শুনতে পায়। সেটি এই যে, খেদমতুল্লার মৃত্যুতে কালু মিঞার নাকি হাত ছিল। হয়তো ছিল, হয়তো ছিল না : বিচারের খড়গ কখন কার হাতে গিয়ে ওঠে কে জানে। গ্রামবাসীরা সব সময়ে সে-সব কথা জানতে চায় না। অতএব সে যে নির্দোষ তা জানাবার জন্যে কালুমিঞা যে-কথাটি প্রচার করেছিল সে-কথা বিশ্বাস করে নি, অবিশ্বাসও করে নি, শুধু শুনে গিয়েছিল। নিঃসন্দেহে কথাটি আজগুবি, তবু তারা যা স্বচক্ষে দেখে নি তার সত্যাসত্য নিয়ে কী করে মতামত প্রকাশ করে? তাছাড়া খেদমতুল্লা আর বেঁচে নেই, ওদিকে কালু মিঞার জীবন জোতজমি প্রভাবপ্রতিপত্তি সবাই অক্ষত অক্ষুণ্ণ। মানুষের আত্মরক্ষার প্রয়োজনও তারা বোঝে না? শত উপায়ে মানুষকে আত্মরক্ষা করতে হয়, কখনো সত্য বলে কখনো মিথ্যা বলে। এবং কখনো সত্য অবিশ্বাস্য মনে হয় আবার কখনো জলজ্যান্ত মিথ্যা বিচারকের ঘরেও অখণ্ডনীয় সত্য বলে গৃহীত হয়। কথাটি না বলে কালু মিঞার উপায়ই-বা কী ছিল। যে-স্থানে খেদমতুল্লার মৃত্যু ঘটে তার নিকটে মীরণ শেখ নামক কালু মিঞার একজন বিশ্বস্ত লোককে কি দেখা যায় নি।
