তখন মুহাম্মদ মুস্তফা নাবালক। তবে সাবালক হওয়ার পরেও কোনো ঔৎসুক্য দেখায় নি।
মুহাম্মদ মুস্তফার মনোভাব থেকে-থেকে অনেকদিন আমাকে কেমন বিচলিত করেছিল। সে কোনো-প্রকার জিঘাংসা বোধ করে নি বলে নয়, অতি সহজে বিনাবাক্যে তার জন্মদাতার দুর্বৃত্ত চরিত্রের কথা মেনে নিয়েছিল বলে এবং কে যে তার খুনী সে বিষয়ে কোনো কৌতূহল প্রকাশ করে নি বলে অন্তরে কী-একটা বিহ্বলতা, কী একটা ব্যথা অনুভব করতাম। মনে হত তার আচরণ রক্তসম্বন্ধশূন্য মানুষের মতো যেন। বাপ অতিশয় দুর্বৃত্ত লোক-সে-কথা ছেলে হয়েও অনাত্মীয় মানুষের মতো স্বীকার করে নিয়েছে, অনাত্মীয় মানুষের মতো অপরাধীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবার জন্যে কোনো বিশেষ আগ্রহ বোধ করে নি, এমনকি তাদের মতোই যেন বিশ্বাস করে কেউ যদি।
খেদমতুল্লার দুস্কৃতির বদলা নেবার জন্যে তাকে খুন করে থাকে তবে খুনীর দোষটা তেমন গুরুতর নয়। তবে আমি আমার কিছু বিহ্বল কিছু বিচলিত মনকে প্রবোধ দেই এই বলে যে, মুহাম্মদ মুস্তফার চরিত্রটা তেমনই : ছোট-বড় সাধারণ-অসাধারণ সব কথা সে সহজে বিনাবাক্যে গ্রহণ করে নেয়।
খেদমতুল্লার মৃত্যুর কিছুদিন পরে চাঁদবরণঘাটের বাসাবাড়িটা পানির দরে বিক্রি করে মাতা-পুত্র গ্রামের বাড়িতে প্রত্যাবর্তন করে। কিছুদিন মনে-প্রাণে নিঝুম হয়ে থাকার পরে মুহাম্মদ মুস্তফা একটি বিষয়ে দৃঢ়সংকল্প হয়; সে পড়াশুনা বন্ধ করবে না, যেমন করে হোক স্কুল শেষ করবে, তারপর সম্ভব হলে কলেজে এবং আরো পরে বিশ্ববিদ্যালয় যাবে। শীঘ্র সংকল্পটি সে কার্যে পরিণত করতে উদ্যত হয়। তারপর ধীরে-ধীরে, পায়ে-পায়ে সে এগিয়ে যায়, কোথাও যে যাচ্ছে সে-কথা না ভেবে, একে একে সব প্রতিবন্ধক যে পেরিয়ে যাচ্ছে সে বিষয়ে সচেতন না হয়ে। প্রথমে তেমন আর্থিক সঙ্কট দেখা দেয় নি। তবে শীঘ তা বিষম সমস্যায় পরিণত হয়। এত শঠতা অসৎ কলাকৌশল সত্ত্বেও খেদমতুল্লা কেবল সামান্য কিছু জমিজমাই রেখে গিয়েছিল। সে-জমিজমাও ধরে রাখা সম্ভব হয় নি, রাখার চেষ্টাও সে করে নি; অসৎ মানুষ যদি সদুপায়ে কিছু সংগ্রহ করে থাকে তাও কলঙ্কময় এবং না-জায়েজ মনে হয়। কঠোর পরিশ্রম এবং একনিষ্ঠতার দ্বারা সর্বপ্রতিবন্ধক সকল প্রকারের বাধাবিপত্তি অতিক্রম করতে সক্ষম হয় মুহাম্মদ মুস্তফা।
ধীরে-ধীরে মুহাম্মদ মুস্তফার মধ্যে কেমন পরিবর্তন এসে যায়। সে মাত্রাতিরিক্তভাবে নিরীহ নম্রভদ্র হয়ে পড়ে। তবে সে-নিরীহতা নম্রতা ভদ্রতা এমনই যে সে-সব তাকে যেন কেমন নিশ্চিহ্ন করে ফেলে; মানুষের পরিবর্তে সে একটি ছায়ায় পরিণত হয়। সে যে অসামাজিক হয়ে ওঠে বা অন্যদের কাছ থেকে লুকিয়ে বা আলাদা হয়ে থাকে তা নয়, বরঞ্চ বেশ নিয়মিতভাবে সামাজিক বা মাজহাবি জামাতে-বৈঠকে হাজির হতে থাকে। তবে এ-সামাজিকতার আসল উদ্দেশ্য যেন তার বিষয়ে সমাজের কৌতূহল এড়ানোই; সে যেন বুঝতে পারে কারো দৃষ্টি আকর্ষণ না করার, এমনকি গা ঢাকা দিয়ে থাকার সর্বোৎকৃষ্ট উপায় সমাজের সঙ্গে মিলেমিশে থাকা। এ-সময়ে মজলিস-মাহফিলে উপস্থিত হলে তার উপস্থিতির বিষয়ে কদাচিৎ মানুষেরা সজ্ঞান হত এবং কখনো তার কণ্ঠস্বর শোনা গেলেও সে যা বলত তা মানুষেরা পরমুহূর্তেই ভুলে যেত কারণ কথা বলেও সে কখনো বিশেষ কিছু বলত না : যেন ক্বচিৎকখনো সে মুখ খুলত কেবল তার হাজিরা ঘোষণা করার জন্যে। হাসিও তেমন দেখা যেত না তার মুখে। যদি-বা কখনো ক্ষীণভাবে হাসত সে-হাসির মধ্যে কখনো কোনো তারতম্য ধরা পড়ত না, একই হাসির সাহায্যে সে প্রভূত মনোভাব ব্যক্ত করত : কৃতজ্ঞতা, আনন্দ, লজ্জা, বিস্ময়, সম্মতি-অসম্মতি। দুর্লভ ঈষৎ হাসিটির ব্যাখ্যার ভার পড়ত দর্শকের ওপর। তবে তা ব্যাখ্যা করে দেখার আগ্রহ কেউ তেমন বোধ করত কিনা সন্দেহ। বস্তুত, মুহাম্মদ মুস্তফা এমনভাবে নিজেকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে সক্ষম হয় যে চোখের সামনে সে বসে থাকলেও অনেক সময়ে কেই সহসা বলে উঠত, কোথায় গেল মুহাম্মদ মুস্তফা?
কখনো-কখনো আমার মনে হত, এ-সবের মধ্যে কোথায় যেন একটি গূঢ় অর্থ। মুহাম্মদ মুস্তফা অনেক কথাই বিনাবাক্যে মেনে নিয়েছে, যে-সব ছেলের পক্ষে অতিশয় দুর্বিষহ। তার বাপ খেদমতুল্লা দুর্বৃত্ত লোক ছিল; তার দুষ্কৃতির শাস্তিও অনিবার্য, সে শাস্তি মানুষই দিক আর খোদাই দিক; এবং যারা তাকে শাস্তি দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পোষণ করাও অন্যায়, কারণ অভিযোগের অধিকার কারো যদি থেকে থাকে তা তাদেরই ছিল। তবু দুর্বৃত্ত বাপের প্রতিও ছেলের কি কোনো দায়িত্ব নেই? হয়তো সে-দায়িত্বের কথা বুঝিয়ে বলা শক্ত; পিতা-পুত্রের মধ্যে দায়িত্বের ব্যাপারে তাদের রক্তসম্বন্ধের মতোই রহস্যময় যা সাধারণ বুদ্ধির বহির্গত। কেবল সে-দায়িত্ব সম্বন্ধে বিস্মৃত হওয়া কোনো ছেলের পক্ষে সম্ভব নয়। সে-দায়িত্বের কথা ভুলে ছেলে যদি তার জীবন গড়ার চেষ্টা করে এবং গড়ে তুলতে সক্ষমও হয়, তার জীবন কি চোরাবালির ওপরই গড়া হবে না, তার সঙ্গে কি একটি অবাস্তবতা একটি অসত্যতা চিরদনিই জড়িত থাকবে না? যে-দায়িত্ব প্রতি মুহূর্তে রক্তের স্রোতে অশান্তির ঘূর্ণাবর্ত সৃষ্টি করে, সর্বদা কী-একটা অস্বস্তিকর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, তা অস্বীকার করা যায় না। হয়তো কী-করে এই কথা বুঝে সে স্থির করে, নিজের সততা সচ্চরিত্রতার সাহায্যে বাপের কলঙ্ক দুর্নাম মুছে ফেলবে, নিজের নিরীহ সজ্জনতার দ্বারা তার দুর্বৃত্ত চরিত্রের স্মৃতি নিশ্চিহ্ন করে দেবে : সন্তানের সুচরিত্র পিতার দুশ্চরিত্র সম্পূর্ণভাবে ঢেকে ফেলবে একদিন। হয়তো এই জন্যেই তার চরিত্রে এমন একটি পরিবর্তন দেখা দিয়েছিল।
