তবে তেমন কথা ভাবতে ভালো লাগলেও জানতাম, আসলে জীবন সম্বন্ধে কী একটা নিদারুণ ভীতিই তাকে ক্রমশ আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। এমন মানুষ নিজের কণ্ঠস্বরেও আতঙ্কিত হয়। এরাই নিজেদের নিশ্চিহ্ন করে ফেলে।
তবারক ভুইঞা বলছিল : যেদিন ঘাট থেকে ফ্ল্যাট সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় সেদিন রাতেই মোক্তার মোছলেহউদ্দিনের মেয়ে সকিনা খাতুন একটি বিচিত্র কান্নার আওয়াজ শুনতে পায়। তখন হয়তো গভীর রাত, কী কারণে ঘুমটা হাল্কা হয়ে উঠেছিল। আওয়াজটি শুনতে পেলে সে সম্পূর্ণভাবে জেগে ওঠে। কিন্তু শীঘ্র আওয়াজটি সহসা থেমে যায়। তারপর সে-ও আবার নিন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
সকিনা খাতুন মেয়েদের মাইনর স্কুলে মাস্টারনীগিরি করে। পরদিন সকালে সে স্কুলে যাবার জন্যে তৈরি হচ্ছে এমন সময়ে আবার আওয়াজটি শুনতে পায় : কোথায় একটি নারী কাঁদছে। কে কাঁদে, কোথায়ই-বা কাঁদে? তবে স্কুলের তাড়াতাড়িতে সে বিষয়ে তখন বিশেষ ভাবা হয়ে ওঠে নি, সারা দিন কথাটি মনেও পড়ে নি। সন্ধ্যার পর আবার আওয়াজটি শুনতে পায়। এবার বেশ স্পষ্টভাবেই শুনতে পায়। নিঃসন্দেহে কণ্ঠটি কোনো নারীর, আওয়াজটা যেন নদীর দিক থেকে আসছে।
তারপর থেকে সময়ে-অসময়ে সে কান্নাটি শুনতে পায়-যে কান্না কখনো আচমকা ঝড়ের মতো কখনো ধীরে-ধীরে বিলম্বিত বিলাপের মতো শুরু হয়। কী কারণে কান্নাকাটির কথা প্রথমে অন্যদের কাছ থেকে গোপন করে রাখে, যেন ব্যাপারটি বুঝতে পারে না বলে সে-বিষয়ে চুপ থাকা বুদ্ধিসঙ্গত মনে করে। কান্নাটি যেন কেমন। তাছাড়া যখন-তখন শুনতে পেলেও যখন তা শুনতে পায় না তখন ভাবে, সত্যিই সে কি কিছু শুনতে পায়? গোপন রেখে এ-ও তার মনে হয়, বালিকাবয়সে যেমন ছড়ার কথার গোপন করে রাখত তেমনি কিছু করছে। ছড়ার কথা কখনো কাউকে বলে নি। তার ঠোঁটের নিঃশব্দ সঞ্চালন লক্ষ্য করে কেউ যদি জিজ্ঞাসা করত সে কী বলছে, সে নির্বিকারভাবে উত্তর দিত, কিছু না সে-সময়ে থেকে-থেকে নিঃশব্দে ঠোঁট সঞ্চালন করে সে একটি ছড়া আবৃত্তি করত। ছড়াটি এখনো তার মনে পড়ে : ক-এ কলাগাছ আর কচুরিপাতা কলমিশাক খাই, কঞ্চি আনো কলমকাঠি ক লিখিরে ভাই। ছড়াটি আবৃত্ত করার কোনো অর্থ ছিল না, কেবল তা এমনি একটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল যে কখন শব্দগুলি অন্তরের কোন্ নিভৃত কক্ষ থেকে উঠে এসে তার ঠোঁটে নিঃশব্দ তরঙ্গের সৃষ্টি করত নিজেই বলতে পারত না। কোনো-কোনদিন তার মায়ের মুখে-চোখে আশঙ্কা দেখা দিত। মা জিজ্ঞাসা করত, কী বিড়বিড় করছিস? মায়ের মুখে-চোখে আশঙ্কা অনুমান করে তার দৃষ্টি এড়িয়ে সে-দিন রাগতভাবে বলত, কোথায় বিড়বিড় করছি? মধ্যে-মধ্যে সহসা মুখে লজ্জার ঝাঁজও ধরত, মুদ্রাদোষটির সত্যি কোনো অর্থ নেই। তবু ছড়ার কথা কোনোদিন কাউকে বলে নি, জারুনার মা নামক মেয়েলোকটির নামও তোলে নি যদিও মেয়েলোকটির কথা ছড়ার মতোই সে-সময়ে অহরহ মনে জাগত, তার মুখটিও মানসচোখে ভেসে উঠত, বিশেষ করে তার ফোকলা দাঁত এবং আকর্ণ দিলখোলা হাসিটি। সেই সম্পূর্ণ অশিক্ষিতা মেয়েলোকটির কাছে ছড়াটা শিখেছিল। মেয়েলোকটি বলত, মনের কথা কখনো ফাঁস করতে নেই। সকিনা খাতুনও মনের কথা গোপন করত, করে একটি গভীর তৃপ্তি অনুভব করত এই ভেবে যে সে নিজস্ব একটি গোপন জগৎ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে যে-জগতে কারো প্রবেশের অধিকার নেই। জারুনার মার কাছে একটি নয়, অনেক ছড়া শিখেছিল, যার একটি বলতে গেলে ছুঁচে বিঁধেই তার অন্তরে স্থান নিয়েছিল। সে-দিন জারুনার মা জাদুকরের হাত-সাফাইর ভঙ্গিতে ধাঁ করে তার দুটি কানের তুলতুলে নরম প্রান্ত ছেঁদা করে দিয়েছিল। ব্যাপারটা বোঝার পর পিঁড়িতে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে থেকে আস্তে হাত তুলে কান স্পর্শ করে দেখে সেখানে না ঝুমকো না কোনো দুল, কেবল দুটি ক্ষুদ্র কাঠির মতো কী যেন সদ্য ফুটানো ছিদ্র দুটি দখল করে রয়েছে। পরে সেখানে ঘায়ের মতো হয়, একটু ব্যথা ব্যথা করে, এবং কান ছেদার উপলক্ষে তার বাপ সরু আংটির মতো একজোড়া যে সোনার অলঙ্কার তাকে এনে দিয়েছিল তা বেশ কিছুদিন পরতে পারে নি। কেন পরতে পারে নি সে-কথাও তার মাকে বলে নি।
৫. কান ছেঁদা করবার সময়ে
কান ছেঁদা করবার সময়ে হয়তো তার মন ভুলাবার জন্যে জারুনার মা সুর করে নূতন একটা ছড়া কেটেছিল : পোপাড়া কাঁপাল জোড়া লাগে না, কালো জামাই ভালো লাগে না। অনেক সন্তান-সন্ততির গর্ভধারিণী জারুনার মার স্বামীকে সকিনা খাতুন কখনো দেখ নি। সে ভাবে, স্বামীটি বিদ্ঘুটে কালো হবে। তার ভবিষ্যৎ স্বামীর কথাও একবার ভাবে এবং ক্ষুদ্র যে অলঙ্কারটি সে পেয়েছিল তারই রঙে কল্পনার স্বামীর রঙও সোনাবরণ রূপ ধারণ করে। তবে কল্পনার স্বামীর কথাও কাউকে বলে নি; তা গোপন রেখে সে পুলকিত বোধ করে। তারপর বকরিদের সময় দশম কি দ্বাদশ সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে জারুনার মার মৃত্যু ঘটে। প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে অব্যর্থভাবে কয়েকদিনের জন্যে সে অদৃশ্য হয়ে যেত। কোনোবার লিকলিকে হাড়সম্বল নবজাত একটি শিশু কোলে নিয়ে, কোনোবার মৃতপ্রসূত শিশুকে কবর দিয়ে শূন্যকোলে প্রত্যাবর্তন করত, মুখটা কিছু ফ্যাকাসে, কিছু শীর্ণ, ঠোঁটটা নীরস, ফাটা-ফাটা। সেবার সে আর ফিরে আসে নি। আগে প্রসব ঘরের কথা ভাবলেই সকিনা খাতুন কেবল জারুনার মার হাসিমুখটি দেখতে পেত। যে-প্রসবঘরে আজরাইল দেখা দিয়েছিল তার জান নেবার জন্যে, সে-প্রসবঘরেও সুপরিচিত হাসিটি দেখতে পায়-আকর্ষণ হাসি, যে-হাসির বেগে কখনো-কখনো বুক থেকে শাড়ির আঁচল সরে গেলে পালান-সদৃশ মস্ত দুটি স্তন প্রকাশ পেত; কবরে নয়, মাটির ওপরে সূর্যালোকের নিচে ঘাসফুলের মতো বিস্তৃত হয়ে সে হাসি খেলা করছিল যেন। তারপর কখন তার হাঁটার ভঙ্গিতে ঈষৎ মাজা-ভাঙ্গা ভাব আত্মপ্রকাশ করে, হাড়গোড় না বাড়লেও দ্বিতীয়া চাঁদের মতো অতি সঙ্গোপনে যৌবনও এসে দেখা দেয়, অবশেষে একদিন দেখতে পায় নানাবিধ রোগব্যাধিতে তার মা বার বার শয্যাশায়িনী হতে শুরু করেছে বলে সংসারের কাজ-কর্মে গভীরভাবে লিপ্ত হয়ে পড়েছে সে : ঘাটে খেয়ানৌকা এসে ভিড়লে যাত্রী যেমন সহসা জীবন্ত হয়ে উঠে আপন পথে চলতে শুরু করে তেমনি সহসা এবং সহজেই সে সাংসারিক জীবনে লিপ্ত হয়ে পড়ে। কেবল একটা কাঠের পুতুল বেশ কিছুদিন সঙ্গ ছাড়তে চায় নি। ততদিনে পুতুলটির রঙ উঠে এমন দশা যে চোখ-মুখ বলে আর কিছু নেই, বিবর্ণ দেহটি অক্ষতও নয়। একদিন সেটিও হারিয়ে যায় ছড়াগুলির মতো, তার মনের গোপন কুঠুরির মতো, এবং তার অভাব বোধ করে না বলে সেটির সন্ধানও করে না। সন্ধান করার সময়-বা কোথায়? দিনগুলি ঘূর্ণাবর্তের মতো হয়ে উঠেছে, যে-ঘূর্ণাবর্ত প্রতিদিন সূর্যোদয়ের সাথে-সাথে দেখা দিয়ে অনেক রাত পর্যন্ত ঘিরে থাকে এবং যা ভেদ করে পশ্চাতে বা সম্মুখে তাকানো সম্ভব হলেও তাকাবার সাধ আর হয় না। হয়তো তাকালে কিছু দেখতেও পাবে না, যেমন কুয়াশার দিনে নদীর মধ্যখানে পৌঁছুলে পেছনের তীর সম্মুখের তীর উভয়ই আর চোখে পড়ে না। তখন থেকে মায়ের কাছে লুকাবার মতো। তেমন কিছু দেখতে পায় নি। লুকাবার কিছু নেই, লুকাবার সময়ও নেই। তার কাজ কি কখনো শেষ হয়? সারা দিন স্কুলে পড়ানো, মায়ের সেবা-শুশ্রূষা করা, ঘরদোর সাফ করা, সন্ধ্যার আগে বাপের জন্যে ভেতরের বারান্দার প্রান্তে বদনা ভরে অজুর পানি রাখা, সকলের অলক্ষে ঘরের কোণে আবচা অন্ধকারে নামাজটাও পড়ে নেওয়া, পরে উঠানের শেষে তিনদিক-খোলা গোয়ালঘরে মধুবিবি নাম গাইটিকে দানা-পানি দেওয়া, সময় করে ছোট ভাইবোনদের পড়াটা দেখিয়ে দেওয়া, সকলের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করা, আরো পরে বাসন-পাতিল ঘষে-মেজে সাফ করা-অনেক তার কাজ যা সে নিত্য নিঃশব্দে একটির পর একটি করে যায়। অনেক রাত করে সে যখন শুতে যায় তখন বিছানায় আশ্রয় নেবা মাত্র ঘুমটা ঝট করে এসে যায়। প্রথমে সহসা সমস্ত দেহে যে গভীর অবসাদ বোধ করে সে-অবসাদের সঙ্গে মিশে ভেতরটা কেমন ফাঁকা-ফাঁকা হয়ে ওঠে, দৈনন্দিন সাংসারিক কথা বা স্কুলের চুটিচাটি কথা হাল্কা মেঘের মতো তার মনের সীমানায় কয়েক মুহূর্ত উড়ে বেড়ায় কোথাও ছায়া না ফেলে, তারপর সে-সব কথা কখন স্বপ্নের প্রান্তে গিয়ে পৌঁছায়, আবার স্বপ্ন গভীর নিদ্রায় অন্তর্হিত হলে নিদ্রার নিরাকার বিস্মৃতির মধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। কেবল ক্বচিৎ কখনো ঘুম আসতে ঈষৎ দেরি হলে অদৃশ্য নিশাচর পাখির মতো রাতের অন্ধকার থেকে উড়ে এসে অন্যান্য কথা মনে নিঃশব্দে ডানা ঝাপটায় : জীবন-মৃত্যুর কথা, বেহেস্ত-দোজখের কথা, সূর্য-চন্দ্র নক্ষত্রের রহস্যের কথা, মানুষের কথা সে-সব সে ভাবেই কেবল, কোনো উত্তর সন্ধান করে না : উন্মুক্ত মাঠের শেষে দিগন্তের দিকে গ্রাম্যবধু যেমন অস্কুট কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে থাকে তেমনি তার মনও আস্তে-আস্তে চোখ মেলে সে-সব রহস্যময় কথাগুলির বিষয়ে ভাবে মনে একটু ভয় বা বিহ্বলতা বোধ না করে, যেন যে-দুর্বোধ্য দিগন্তের দিকে তাকায় সেখানে যদি ভয়ের বা বিহ্বলতার কিছু থেকে থাকে তা তাকে স্পর্শ করবে না। সে-সব বিষয়ে কোনো কারণে জরায়ুস্থিত জীবের মতোই সে নিরাপদ বোধ করে। সে কখনো কোনো অভাব বোধ করে না, কিছু কামনাও করে না। তার ঈষৎ কৌতূহলও যখন শেষ হয় তখন সে রাতের আওয়াজ শোনে : কোথাও ইঁদুরের সাবধানী সঞ্চারণ, রাতপাখির ডাক, কাঠের ক্ষীণ আকস্মিক আর্তনাদ। সে-সব আওয়াজ শুনতে-শুনতে কোনো-কোনোদিন তার মনে প্রশ্ন জাগে, মৃত্যুর পরে যে-জীবন সে-জীবনের না জানি কী রকম আওয়াজ। গভীর রাতে ঘুমন্ত মানুষেরা অতর্কিতভাবে আর্তনাদ করে ওঠে তীক্ষ্ম, নিঃসঙ্গ কণ্ঠে, কী-একটা অজানা বিস্ময়ে। সে-জীবনের আওয়াজ কী সে-রকম? কখনো হাওয়া যেমন বেচইন হয়ে গোঙ্গাতে শুরু করে। তেমনই কি তার আওয়াজ? কখনো হৃৎপিণ্ডের আওয়াজ বুকের পিঞ্জর থেকে বেরিয়ে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে, সর্বত্র তারপর ধকধক করে প্রচণ্ড আওয়াজে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়। অজানা জগতের আওয়াজটি কি তেমনি কিছু? তবে সকিনার এ-কৌতূহলও স্থায়ী হয় না; এ-জীবনই তাকে তেমন কৌতূহলী করে না, সে-অজানা জীবন কেন তাকে কৌতূহলী করবে? তাছাড়া রাত শীঘ্র সুগভীর নদীর মতো অতল হয়ে ওঠে যাতে সে দ্রুতগতিতে নিমজ্জিত হতে থাকে, যাতে তার ক্ষীণখর্ব দেহটি সহসা ভারী হয়ে তলিয়ে যায়। এমনিভাবে সে নিদ্রাভিভূত হয়ে পড়ে, বুকের দিকে মাথা গুঁজে হাঁটু দুটি তুলে সে-বুকের দিকে টেনে একত্র করা দুটি হাত উরুর মধ্যে স্থাপন করে, মুখটা ঈষৎ খুলে। কোনো-কোনোদিন দেহটি অবশ হয়ে পড়ার আগে অর্ধঘুমন্ত অবস্থায় কানে আঙ্গুল দিয়ে সে-আঙ্গুলটি বিষমভাবে কিছুক্ষণ নাড়ে; রাতের বেলায় কানের খলি কখনো-কখনো সুড়সুড় করে। হয়তো মনে যে-সব অবান্তর কথা জাগে, তাদেরই তাড়ায়।
